থাইল্যান্ডের একটি বন্দরে নোঙর করেছে মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’। গত বুধবার রণতরিটি বন্দরে ভিড়লে এর অবস্থা দেখে হতবাক হন পর্যবেক্ষকেরা। প্রায় ১ হাজার ১০০ ফুট দীর্ঘ বিশালাকার এই যুদ্ধজাহাজের সামনের অংশ থেকে পেছনের অংশ পর্যন্ত পুরো বাইরের কাঠামোতে মরিচা ধরেছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমনটা হওয়ার ছিল। মার্কিন নৌবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গত নভেম্বরে সান ডিয়েগোর ঘাঁটি ছাড়ে জাহাজটি। এরপর টানা ২৮৬ দিন এটি সাগরেই কাটিয়েছে। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের বিরুদ্ধে কয়েক মাস যুদ্ধ ও নৌ অবরোধে অংশ নেয় রণতরিটি।

মার্কিন নৌবাহিনীর সাবেক ক্যাপ্টেন কার্ল শুস্টার আব্রাহাম লিংকনের মতো নিমিৎজ-ক্লাস রণতরিতে তিন দফায় দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বলেন, কোনো জাহাজ যদি সাগরে টানা ৬০ দিন বা তার বেশি সময় সক্রিয় থাকে, তবে তার জলরেখায় (ওয়াটারলাইন) মরিচা ধরা মোটেই অস্বাভাবিক নয়।

সিএনএনকে শুস্টার বলেন, বিশেষ করে যুদ্ধের মতো পরিস্থিতিতে সাগরে ভাসমান অবস্থায় মরিচা পরিষ্কার করা সম্ভব নয়। এটি করতে হলে ক্রুদের জলরেখা পর্যন্ত নামাতে হয়। এরপর ঘষে ঘষে মরিচা তুলতে হয়। তারপর দুই পরত মরিচারোধক উপাদান এবং শেষে দুই পরত নৌবাহিনীর বিশেষ ধূসর রং লাগাতে হয়।

শুস্টার বলেন, ‘আমি যা দেখছি, তাতে পুরো মরিচা দূর করতে অন্তত ৩০ দিনের সংস্কারকাজের প্রয়োজন হবে।’ তবে থাইল্যান্ডে যাত্রাবিরতির সময় কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশের কাজ সেরে নেওয়া হতে পারে বলে তিনি জানান।

টানা এই কঠিন অভিযানের পর ক্রুদের প্রয়োজনীয় বিশ্রাম দিতে গতকাল বুধবার জাহাজটি ব্যাংককের দক্ষিণে থাইল্যান্ড উপসাগরের লায়েম চাবাং বন্দরে ভিড়েছে। সেখানে জাহাজটির কয়েক দিন অবস্থানের কথা রয়েছে।

শুস্টার আরও বলেন, সাত দিনের এই বন্দরযাত্রায় তারা শুধু জরুরি কাজগুলোই করবে। জাহাজের সামনের অংশ বা ধনুকের মতো বাঁকানো অংশের মরিচা আগে তোলা হবে। কারণ, জাহাজ চলার সময় এবং উত্তাল সাগরের নোনা পানির সংস্পর্শে এলে এই অংশগুলোই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

নৌবাহিনীর সাবেক এই কর্মকর্তা বলেন, জাহাজের ওপরের দিকের কিছু মরিচা চলার পথেই পরিষ্কার করা যায়। কিন্তু জলরেখার অংশের মেরামতের জন্য জাহাজটিকে অবশ্যই স্থির রাখতে হবে এবং সেখানে ঢেউ থাকা চলবে না।

তবে এই সমস্যা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। শুস্টার বলেন, মরিচা অনেকটা সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়ে। তাই শুরুতেই এর সমাধান করা ভালো। নয়তো পরে আরও বড় সমস্যায় পড়তে হয়।

শুস্টার বলেন, মরিচা যেকোনো ইস্পাতের কাঠামোকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয়। তাই ডেক, হাঁটার পথ বা সুরক্ষাদড়ির মতো গুরুত্বপূর্ণ অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আগেই এটি সরিয়ে ফেলা জরুরি।

এদিকে লিংকনের এই দীর্ঘ অভিযানে কেবল মরিচা ধরাই একমাত্র সমস্যা নয়। রসদ সংকট এবং ক্রুদের মনোবল ভেঙে পড়ার খবরও এসেছে। এমনকি অন্তত এক নাবিকের সাগরে ছিটকে পড়ার ঘটনাও ঘটেছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এসব উদ্বেগ উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর মতে, লিংকনের এই অভিযানের সময়কাল ‘ততটা দীর্ঘ ছিল না’।

জাহাজটি থাইল্যান্ডে পৌঁছানোর পর এর অবস্থা নিয়ে ট্রাম্প এখনো কোনো মন্তব্য করেননি। তবে অতীতে তিনি যুদ্ধজাহাজ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য নৌবাহিনীকে বারবার তাগিদ দিয়েছেন। তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন রণতরিগুলো আরও বেশি সময় ধরে সাগরে দায়িত্ব পালন করছে। গত বছর তৎকালীন নৌবাহিনী সচিব জন ফেলান জানান, ট্রাম্প গভীর রাতে ফোন করেও জাহাজের মরিচা সমস্যা নিয়ে কথা বলতেন।

এদিকে নৌবাহিনীর নাবিকেরা মরিচা পরিষ্কারের কাজ একদম পছন্দ করেন না বলে জানান সাবেক নৌবাহিনী কর্মকর্তা শুস্টার। তিনি বলেন, ‘নৌবাহিনীতে নাবিকদের সবচেয়ে অপছন্দের দুটি কাজের একটি হলো মরিচা ঘষে পরিষ্কার করা। অন্যটি হলো জাহাজের পাইপ বা নর্দমা পরিষ্কারের কাজ। জাহাজের কনিষ্ঠ কর্মকর্তা থাকার সময় আমি দুটি কাজকেই প্রচণ্ড অপছন্দ করতাম।’