প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে জেলে আছেন পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। সম্প্রতি তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি হলে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট ইমরানের যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ বাস্তবায়িত না হওয়ায় অসন্তোষ জানিয়ে বিভিন্ন দেশের ২১ জন সাবেক আন্তর্জাতিক অধিনায়ক একযোগে চিঠি লিখেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফকে।
এবার ইমরানের প্রতি পাকিস্তান সরকারের আচরণ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন বাংলাদেশ দলের সাবেক ক্রিকেটার, বিসিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের সাবেক প্রধান নির্বাহী সৈয়দ আশরাফুল হক। গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি ইমরানের প্রতি আচরণকে ‘বর্বরতা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বিবৃতিতে আশরাফুল হক বলেন, ‘ইমরান খান বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় একজন ব্যক্তি। পাকিস্তানে রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার পেছনে তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল দেশটির দুর্নীতি দূর করা। দেশ পরিচালনার জন্য তাঁর কাছে জনগণের স্পষ্ট জনরায় ছিল। তাঁকে অমানবিক পরিস্থিতিতে কারাগারে রাখা বিশ্ব কিংবা কোনো সভ্য জাতির জন্য কাম্য হতে পারে না। মানবাধিকারের দিক থেকে এটি সম্পূর্ণ অবৈধ এবং তা একেবারেই অসাংবিধানিক। ইমরান খানের সঙ্গে যে আচরণ করা হচ্ছে, তা বর্বরতার শামিল।’
ইমরানের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে আমি ইমরান খানকে চিনি, যখন তিনি লাহোর অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে খেলতে ঢাকায় এসেছিলেন। তিনি অত্যন্ত মেধাবী একজন তরুণ ছিলেন। সে সময় তিনি বেশ জোরে বোলিং করতেন, আমার মনে আছে তিনি আমাদের বিপক্ষে একটি সেঞ্চুরি করেছিলেন। সেই ম্যাচেই আমাদের বন্ধুত্ব হয় এবং তার পর থেকে আমরা সব সময় যোগাযোগ রক্ষা করেছি।’
‘আমাদের (বাংলাদেশের) স্বাধীনতার পর, ইংল্যান্ডে পড়াশোনা করার সময় আমাদের দেখা হতো। আমি অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির কিবল কলেজে তাঁর কাছে যেতাম, যেখানে মাঝেমধ্যে তিনি হকিও খেলতেন। পাকিস্তান দল যখন টেস্ট সিরিজের জন্য ভারতে যেত, তখন আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যেতাম। বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তেও আমাদের সাক্ষাৎ হয়েছে এবং তিনি রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার পরও আমাদের বন্ধুত্ব অব্যাহত ছিল’, যোগ করেন আশরাফুল হক।
খেলোয়াড়ি জীবন থেকে অবসরের পর রাজনীতিতে যোগ দেন ইমরান খান। তাঁর সঙ্গে সে সময়ও রাজনৈতিক বিষয়ে কথা হওয়ার স্মৃতি উল্লেখ করেন জাতীয় দলের সাবেক এই ক্রিকেটার, ‘আল্লাহভীরু মানুষ হওয়ায় তিনি আমাকে বলতেন, “অ্যাশ, আমার কপালে যদি এভাবেই মৃত্যু লেখা থাকে, তবে আমার সেভাবেই মৃত্যু হবে। তুমি আমাকে বাঁচাতে পারবে না, কেউ আমাকে বাঁচাতে পারবে না। এটা আল্লাহর ইচ্ছা। তাই আমার নামে যদি কোনো গুলি নির্দিষ্ট করা থাকে, তবে তা আমার গায়ে বিঁধবেই। সুতরাং এটা নিয়ে চিন্তা করে জীবনের নীতি-আদর্শ ভুলে যাব কেন?”’
বাংলাদেশ প্রসঙ্গে ইমরানের অবস্থানের কথা উল্লেখ করে বিবৃতিতে আশরাফুল বলেন, ‘তিনি পাকিস্তানের প্রথম রাজনৈতিক নেতা যিনি ১৯৭১ সালে (বাংলাদেশের বিপক্ষে যুদ্ধে) তাঁদের সব অপকর্মের জন্য ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন। আমি বহু উপলক্ষে তাঁর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও দেখা করেছি এবং নব্বইয়ের দশকে ঢাকায় বুড়িগঙ্গা নদীতে সবাইকে নিয়ে নৌকাভ্রমণের স্মৃতি আজও আনন্দের সঙ্গে স্মরণ করি। ইমরান সাধারণ পারিবারিক জীবন যাপন করতে পারতেন, কিন্তু নীতি ও আদর্শের খাতিরে তিনি তা ত্যাগ করেছেন।’
এর আগে বাংলাদেশ দলের সাবেক অধিনায়ক খালেদ মাসুদ গত রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইমরান খানকে নিয়ে লিখেছেন, ‘সাবেক ক্রিকেটার ও অধিনায়ক হিসেবে ইমরান খান সব সময়ই এক অনন্য অনুপ্রেরণা। তাঁর সাহস, নেতৃত্ব এবং অর্জন সীমানা ছাড়িয়ে ক্রিকেট প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেছে। একজন বিশ্বমানের ক্রিকেট কিংবদন্তি, যিনি এই খেলায় এত অবদান রেখেছেন, তিনি সর্বোচ্চ মানের চিকিৎসাসেবা, মর্যাদা ও সমর্থন পাওয়ার দাবিদার। কোটি কোটি মানুষকে অনুপ্রাণিত করা এই কিংবদন্তির পাশে পুরো ক্রিকেট–বিশ্বের দাঁড়ানো উচিত। ইমরান খানের মানসিক শক্তি, সুস্বাস্থ্য এবং তাঁর প্রাপ্য সঠিক পরিচর্যা কামনা করছি।’