বাগেরহাট সদর ও রামপাল উপজেলার সীমান্তে লক্ষ্মীখালী খালের ওপর নির্মাণাধীন স্থায়ী ব্রিজের কাজ নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রান্ত হলেও শেষ হয়নি। পাইলিং শুরুর পর গত বছরের ৩ নভেম্বর থেকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির কাজ বন্ধ থাকায় এলাকার কয়েক হাজার মানুষ জরাজীর্ণ কাঠের পোল ব্যবহার করছেন। বর্ষায় পিচ্ছিল ও ভাঙাচোরা এই পোল পার হতে গিয়ে শিশু, নারী, বৃদ্ধ, শিক্ষার্থী ও রোগীদের প্রতিদিন কষ্ট পোহাতে হচ্ছে। অন্যদিকে, কাজ বন্ধ থাকা অবস্থাতেই ঠিকাদার প্রায় ৫০ লাখ টাকা বিল উত্তোলন করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

লক্ষ্মীখালী ব্রিজটি দুই উপজেলার ১০টি গ্রামের মানুষের সরাসরি যোগাযোগের কেন্দ্রবিন্দু। হাটবাজার, চিকিৎসা, শিক্ষা ও কৃষিপণ্য পরিবহনে এই পথ অপরিহার্য। ব্রিজটি না থাকায় বিকল্প পথে প্রায় ১৫ কিলোমিটার ঘুরে যাতায়াত করতে হচ্ছে, যা সময় ও ভাড়া ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। স্থানীয়রা জানান, খালের ওপর থাকা পুরোনো কাঠের পোলটি দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষতিগ্রস্ত। কোথাও কাঠ ভেঙে গেছে, আবার কোথাও অংশ দেবে গেছে। বর্ষায় সংযোগ সড়ক পিচ্ছিল হওয়ায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বেড়েছে।

এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে স্থায়ী ব্রিজ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও কাজ শুরুর কিছুদিন পরেই তা থেমে যায়। এক বছর ধরে কাজ বন্ধ থাকায় নির্মাণ এলাকাটি পরিত্যক্ত জায়গায় পরিণত হয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে নির্মাণ সামগ্রী, মেশিন, পাইপ, বালু ও শ্রমিকদের অস্থায়ী আবাসন। বছরের পর বছর সরঞ্জাম পড়ে থাকলেও ব্রিজ নির্মাণে কোনো অগ্রগতি হয়নি। স্থানীয়দের দাবি, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি প্রকল্পের অগ্রগতি, বিল পরিশোধ ও সরকারি অর্থের সঠিক হিসাবের স্বচ্ছ তদন্ত চায়। তবে বিল উত্তোলনের অভিযোগে বিপরীতে কোনো নথি পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় বাসিন্দা নারায়ণ মজুমদার বলেন, "ব্রিজটি দীর্ঘদিন ধরে অবহেলায় পড়ে আছে। লোড টেস্টের সময় পাইলগুলো দেবে যাওয়ার পর থেকে ঠিকাদারকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা মানববন্ধন করেছি, এলজিইডির প্রকৌশলীদের বিষয়টি জানিয়েছি, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। আমরা দ্রুত কাজ শেষ করার দাবি জানাচ্ছি।"

প্রণব মন্ডল নামের অপর এক বাসিন্দা জানান, "জরাজীর্ণ কাঠের পোলটি মাঝেমধ্যেই ভেঙে যায় এবং তা আবার মেরামত করে চলতে হয়। মোটরসাইকেল ও ভ্যান চলার সময় বড় সমস্যা হয়। ছোট ছেলেমেয়েরা স্কুলে যাওয়ার সময় ভয় পায়, অনেক সময় হাত ধরে পার করে দিতে হয়।"

পূর্ব সায়রা এলাকার বাসিন্দা মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, "এখানে আগে একটি ঢালাই ব্রিজ ছিল। সেটি ভেঙে নতুন ব্রিজের কাজ শুরু করা হয়। কিন্তু এখন যোগাযোগ ব্যবস্থা আগের চেয়েও খারাপ হয়েছে। কাঠের পোলের মাঝখানের অংশ ভেঙে এক বাচ্চা পড়ে গিয়েছিল, সৌভাগ্যবশত এক মহিলা ধরে ফেলায় বড় দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পায়।" তিনি আরও জানান, দুই উপজেলার বাজার, চিকিৎসা ও কৃষিপণ্য বারাকপুরে নিয়ে বিক্রির জন্য এটাই সরাসরি পথ। বিকল্প পথে ১৫ কিলোমিটার ঘুরে যেতে অতিরিক্ত সময় ও ভাড়া গুনতে হচ্ছে।

খান টুকু নামের এক স্থানীয় বলেন, "কাঠের পোল দিয়ে যাতায়াত করা খুব কষ্টকর। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে শিশু ও বৃদ্ধরা। যেকোনো সময় ফাঁকে পা ঢুকে বা খালের স্রোতে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।"

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা যায়, লক্ষ্মীখালী খালে স্থায়ী ব্রিজ নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান শেষে ২০২৪ সালের শেষ দিকে নিশীথ বসু নামে এক ঠিকাদারকে কাজের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ৩ কোটি ৮৪ লাখ ৪ হাজার ২১ টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পের কাজ চুক্তি অনুযায়ী চলতি বছরের ১২ এপ্রিলের মধ্যে শেষ করার কথা ছিল। তবে পাইলিং কাজ শুরু হওয়ার পর গত বছরের ৩ নভেম্বর থেকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আর কোনো দৃশ্যমান কাজ করেনি। একপর্যায়ে লোড টেস্টের পর কয়েকটি পাইল দেবে গেলে কাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

কাজ বন্ধ থাকা ও বিল উত্তোলনের অভিযোগের বিষয়ে ঠিকাদার আল আমিন বলেন, "বৃষ্টির কারণে আপাতত কাজ বন্ধ আছে। যাতায়াতের রাস্তা ভালো না থাকায় মালামাল নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে খুব দ্রুতই কাজটি সম্পন্ন করা হবে।"

বিষয়টি নিশ্চিত করে বাগেরহাট এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মনজুর রশিদ জানান, "লক্ষ্মীখালী ব্রিজ নির্মাণের জন্য নিশীথ বসুকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তা করেনি।" তিনি বলেন, "ঠিকাদারের কার্যাদেশ বাতিলের জন্য প্রকল্প পরিচালকের দপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন করা হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং নতুন করে দ্রুত কাজ শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।"