নীলফামারীর সৈয়দপুরে পরিত্যক্ত কাপড়ের টুকরোকে কাজে লাগিয়ে শত কোটি টাকার একটি গতিশীল পোশাকশিল্প গড়ে উঠেছে। চট্টগ্রাম, ঢাকা, সাভার ও গাজীপুরের বড় কারখানাগুলোর কাটিং টেবিল থেকে ঝরে পড়া ‘ঝুট’ বা অবশিষ্ট কাপড় সংগ্রহ করে এখানে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা গুণগতমানসম্পন্ন পোশাক তৈরি করছেন। শীতকালে সাধারণ মানুষের সাশ্রয়ী ও টেকসই পোশাকের চাহিদা মেটাতে এই শিল্পটি অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
শহরের রেলবাজার, মুন্সীপাড়া, নয়াটোলা, হাতিখানা এবং বোতলাগাড়ী ইউনিয়নের ঘরে ঘরে সেলাই মেশিনের খটখট শব্দে মুখরিত হয়েছে প্রতিটি অলিগলি। স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী, সৈয়দপুরে বর্তমানে ৫০০টির বেশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি পোশাক কারখানা সক্রিয় রয়েছে, যার অধিকাংশই প্লাজা সুপার মার্কেটে অবস্থিত। এসএমই ফাউন্ডেশনের সহায়তায় বাড়িতে বাড়িতে গড়ে ওঠা দুই শতাধিক ক্ষুদ্র কারখানায় প্রায় ৫০০ পরিবার তাদের উপার্জনের পাশাপাশি ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
রিজওয়ান গার্মেন্টসের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ মাসুদ হোসেন ও অভিজ্ঞ কারিগর নওশাদ আলী ও মোহাম্মদ রুবেল জানান, এখানকার উৎপাদিত পোশাকের চাহিদা আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ছড়িয়ে পড়েছে। নওশাদ আলী বলেন, ‘আমাদের এখানকার মালের কদর এখন দেশ পেরিয়ে ভিনদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। এখান থেকে বিপুল পরিমাণ পোশাক ভারত, নেপাল ও ভুটানে যায়। সেসব দেশের পাইকারি ব্যবসায়ীরা সরাসরি সৈয়দপুরে এসে ট্রাকে করে মাল নিয়ে যান।’ অন্যদিকে, মোহাম্মদ রুবেল বলেন, ‘শীতকাল এলে আমাদের দম ফেলার সময় থাকে না। ঢাকা, খুলনা, যশোর, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ দেশের প্রায় প্রতিটি জেলা থেকেই পাইকারেরা আসেন। দামে অত্যন্ত সাশ্রয়ী হওয়ায় মূলত নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের শীতের কাপড়ের বিশাল চাহিদা মেটাতে এই পোশাকগুলো সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখছে।’
ঢাকা বা নারায়ণগঞ্জের বড় কারখানার চেইন সিস্টেমের বিপরীতে সৈয়দপুরের কারিগররা এককভাবে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। রাজু গার্মেন্টসের কারিগর সোহেল হাফিজ জানান, বস্তায় করে ঢাকার গার্মেন্টস থেকে আসা ঝুট কাপড়ে বিভিন্ন রঙ ও সাইজের টুকরা মিশ্রিত থাকে। সোহেল হাফিজ বলেন, ‘আমাদের কাজটা বাইরে থেকে যতটা সহজ মনে হয়, আসলে ততটা নয়। বস্তায় করে যখন ঢাকার গার্মেন্টস থেকে ঝুট কাপড় আসে, তখন তার মধ্যে বিভিন্ন রঙের ও সাইজের ছোট-বড় টুকরা মিক্স করা থাকে। সেখান থেকে রং মিলিয়ে, কাপড়ের ধরন বুঝে জোড়া মেলাতেই আমাদের প্রতিদিন তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় পার হয়ে যায়।’ একজন দিনমজুর কারিগর সারা দিনে সর্বোচ্চ ৩০টি পোশাকের কাটিং ও সেলাই করে মাত্র ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা উপার্জন করেন।
ঋতুভেদে এখানকার উৎপাদন তালিকা বদলে যায়। শীতে ভারী জ্যাকেট, হুডি ও ব্লেজার, ঈদে ডেনিম ও গ্যাবাডিন প্যান্ট ও ট্রেন্ডি শার্ট, আর গরমে টু-কোয়ার্টার, থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট, হাফ প্যান্ট ও হালকা ট্রাউজার তৈরি হয়। সিটি গার্মেন্টসের মালিক জানান, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধির কারণে আগে ১০০ শতাংশ ঝুট কাপড় ব্যবহার করলেও বর্তমানে উৎপাদনের ৬০ শতাংশ রোল কাপড় এবং ৪০ শতাংশ ঝুট কাপড় ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘২০০০ সালের দিকে যে ঝুট কাপড় আমরা ৫ থেকে ৭ টাকা কেজি কিনতাম, ঢাকার গার্মেন্টসের মালিকেরা এখন সেটির দাম বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন। তা ছাড়া দালালের হাত ঘুরে কাঁচামাল আসায় আমাদের খরচ আরও বেড়ে যায়।’ প্রতিকূলতা সত্ত্বেও পাইকারি বাজারে পূর্ণ প্যান্ট ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা এবং উন্নত মানের জ্যাকেট ২০০ টাকায় বিক্রি হয়, যা খুচরা বাজারে ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকায় পাওয়া যায়।
শিল্পের এই প্রসারে ঋণ ও গ্যাস সংযোগের অভাব প্রধান বাধা হিসেবে দাঁড়িয়েছে। এসএমই ফাউন্ডেশনের সহায়তায় গড়ে ওঠা কারখানাগুলোসহ স্থানীয় মহাজন ও কারিগররা ব্যাংক ঋণ ও সরকারি সহজ শর্তের সুবিধা থেকে বঞ্চিত। মো. জাওয়াদ নামের আরেক কারখানার মালিক বলেন, ‘আমাদের মতো ছোট কারখানার জন্য সরকারি কোনো সহজ শর্তের ঋণ বা ব্যাংকের লোন পাওয়া আকাশকুসুম কল্পনা। কোনো জরুরি সংকট বা ব্যবসায়িক মন্দা দেখা দিলে আমরা নিরুপায় হয়ে মহাজনের কাছ থেকে দাদন বা অগ্রিম টাকা নিই। পরে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কাজ করে সেই টাকা শোধ করতে হয়।’ গ্যাস সংযোগের অভাবে এখানে এখনও কোনো আধুনিক ওয়াশিং প্ল্যান্ট বা ডাইং কারখানা গড়ে ওঠেনি। কারিগরদের মতে, ওয়াশিং ও উন্নত ফিনিশিং সুবিধা থাকলে আন্তর্জাতিক মানের পোশাক তৈরি করে বহুগুণ বেশি মূল্যে রপ্তানি সম্ভব হতো।
সৈয়দপুরের এই পোশাকশিল্পের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহ্য। পাকিস্তান আমল থেকেই এখানকার দরজি ও কারিগররা এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। নওশাদ ও রুবেলের পরিবার চার পুরুষ ধরে এই শিল্প টিকিয়ে রেখেছে। নাজমুল হক দেশভাগের পর থেকে এই পেশা শুরু করেন, পরবর্তীতে তাঁর পুত্র মোহাম্মদ চান এবং বর্তমানে দুই ভাই ঐতিহ্যটি এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। মোহাম্মদ রুবেল বলেন, ‘এখানে আমাদের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই। এই বাণিজ্যিক কর্মব্যস্ততার সমান্তরালে অনিন্দ্যসুন্দর রূপ হলো এর অতুলনীয় সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। কারখানার ভেতরে কে বাঙালি আর কে অবাঙালি, সেই পরিচয় মুছে যায় সেলাই মেশিনের ছন্দে।’