খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষভাগে চার বছরের রক্তক্ষয়ী ‘হারবুল ফিজার’ থামার পর মক্কার সমাজ এক গভীর আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি হয়। কেন্দ্রীয় সরকার, লিখিত আইন বা স্থায়ী বিচারব্যবস্থা ছাড়া তখনকার মক্কা চলত গোত্রপ্রধানদের অনানুষ্ঠানিক পরিষদ ‘আল-মালা’ আর গোত্রীয় পক্ষপাতিত্বের (আসাবিয়্যাহ) ভরসায়।

ফলে কোনো দুর্বল বা বহিরাগত মানুষ প্রভাবশালী কারও হাতে ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রতিকারের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পথ ছিল না। এই শূন্যতা পূরণেই ৫৯০ খ্রিষ্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে মক্কার কয়েকটি গোত্র মিলে গড়ে তোলে ‘হিলফুল ফুজুল’—ন্যায় ও সদাচারের এক ঐতিহাসিক অঙ্গীকার।

বিশ বছর বয়সী তরুণ মুহাম্মদ (সা.) নিজেও এই সভায় উপস্থিত ছিলেন। পরবর্তী জীবনে তিনি বহুবার এই চুক্তির প্রশংসা করেছেন।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের কেন্দ্র হিসেবে মক্কায় নানা অঞ্চলের বণিকদের সমাগম ঘটত, কিন্তু গোত্রীয় প্রতাপের সামনে বহিরাগতদের পণ্যমূল্য আত্মসাতের ঘটনা অস্বাভাবিক ছিল না।

ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, ইয়েমেনের জুবাইদ গোত্রের এক বণিক মক্কায় পণ্য বিক্রি করেন কোরাইশের বনু সাহম গোত্রের নেতা আস ইবনে ওয়ায়েল আস-সাহমির কাছে (যাঁর সন্তান আমর ইবনুল আস পরবর্তী সময়ে মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি হিসেবে খ্যাত হন)।

বণিকের আবেদন কাবা প্রাঙ্গণের নেতাদের গভীরভাবে নাড়া দেয়। সবার আগে সাড়া দেন বনু হাশিমের প্রধান, নবীজির চাচা জোবাইর ইবনে আবদুল মুত্তালিব, যিনি ঘোষণা দেন—এই অবিচার অমীমাংসিত রেখে দেওয়া চলবে না।

কিন্তু পণ্য হাতে পাওয়ার পর আস ইবনে ওয়ায়েল মূল্য পরিশোধ করতে অস্বীকার করেন। (ইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ১/১২৮, দারু সাদির, বৈরুত, ১৯৬৮)

ভুক্তভোগী বণিক একে একে প্রভাবশালী গোত্রগুলোর কাছে সুবিচার চেয়েও ব্যর্থ হন। আস ইবনে ওয়ায়েলের গোত্রীয় প্রতিপত্তির ভয়ে কেউ তার পক্ষে দাঁড়াতে রাজি হয়নি।

নিয়মতান্ত্রিক সব পথ বন্ধ হয়ে গেলে বণিক এক নাটকীয় ও প্রকাশ্য পদক্ষেপ নেন। কাবার একেবারে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন পাহাড় আবু কোবাইসের চূড়ায় উঠে প্রতিবাদ করেন। আবু কোবাইস পাহাড়ের ভৌগোলিক স্থানাঙ্ক: ২১° ২৫′ ১৮″ উত্তর অক্ষাংশ ও ৩৯° ৪৯′ ৫৪″ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ।

ঠিক যে সময় কোরাইশ নেতারা প্রাতঃকালীন আসরে কাবা প্রাঙ্গণে সমবেত ছিলেন, তখন তিনি উচ্চৈঃস্বরে নিজের ওপর হওয়া অবিচারের বর্ণনা দিয়ে কবিতা আবৃত্তি করেন, “ ইয়া আ-লা ফিহ্‌রিন, লি মাজলূমিন বি বাতনি মাক্কাতা নাঈ…(হে ফিহরের বংশধর, মক্কার বুকে স্বজনহীন এক মজলুমের ফরিয়াদে সাড়া দাও)।

তিনি বলেন, হারাম সীমানার ভেতরেই তাঁর সম্বল কেড়ে নেওয়া হয়েছে, অথচ তিনি ইহরাম পরিহিত, ক্লান্ত ও পরিবার থেকে বহুদূরে। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ১/১৩৩, দারুল কিতাবিল আরাবি, বৈরুত, ১৯৯০)

বণিকের আবেদন কাবা প্রাঙ্গণের নেতাদের গভীরভাবে নাড়া দেয়। সবার আগে সাড়া দেন বনু হাশিমের প্রধান, নবীজির চাচা জোবাইর ইবনে আবদুল মুত্তালিব, যিনি ঘোষণা দেন—এই অবিচার অমীমাংসিত রেখে দেওয়া চলবে না। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩/১১৬, দারু ইহয়ায়িত তুরাসিল আরাবি, বৈরুত, ১৯৮৮)

জোবাইরের আহ্বানে মক্কার প্রবীণ ও সম্পদশালী ব্যক্তিত্ব আবদুল্লাহ ইবনে জুদআন আত-তায়মির বাসভবনে একটি একটি জরুরি রাজনৈতিক ও সামাজিক সম্মেলন ডাকা হয়।

ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী এই সম্মেলনে যোগ দেয় বনু হাশিম, বনু আল-মুত্তালিব, বনু আসাদ ইবনে আবদুল উজ্জা, বনু জুহরাহ আর বনু তাইম—এই পাঁচটি গোত্র। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ১/১৩৪, দারুল কিতাবিল আরাবি, বৈরুত, ১৯৯০)

বনু হাশিমের পক্ষ থেকে ছিলেন জোবাইর ইবনে আবদুল মুত্তালিব, আবু তালিব, হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিব এবং তরুণ মুহাম্মদ (সা.); বনু তাইমের পক্ষে আবদুল্লাহ ইবনে জুদআন নিজে, বনু জুহরাহ (নবীজির মাতুল বংশ) থেকে মাখরামা ইবনে নাওফাল এবং বনু আসাদ ইবনে আবদুল উজ্জার পক্ষে খুওয়াইলিদ ইবনে আসাদ (হজরত খাদিজার পিতা), নওফল ইবনে খুওয়াইলিদ ও তরুণ হাকিম ইবনে হিজাম।

আমি আবদুল্লাহ ইবনে জুদআনের ঘরে এমন একটি ন্যায়বিচারের চুক্তির সাক্ষী ছিলাম, যা আরবের মূল্যবান লাল উটের বিনিময়েও আমি ভাঙতে রাজি হতাম না। আর ইসলাম আসার পরও যদি এমন কোনো চুক্তির ডাক আসে, তবে আমি নিশ্চয় তাতে সাড়া দেব।

বিপরীতে তৎকালীন মক্কার সবচেয়ে প্রভাবশালী ও ধনী গোষ্ঠী হারব ইবনে উমাইয়ার নেতৃত্বাধীন বনু উমাইয়া, বনু মাখজুম, আর অভিযুক্তের নিজের গোত্র বনু সাহম এই সম্মেলন বর্জন করে। (ইবনে হাবিব, মুহাম্মদ, কিতাবুল মুনাম্মাক ফি আখবারি কুরাইশ, পৃষ্ঠা ৪৪–৫০, মাকতাবাতুল খানজি, কায়রো, ১৯৮৫)

এভাবে হিলফুল ফুজুল কার্যত পরিণত হয় ক্ষমতাধর কয়েকটি গোত্রের বিপরীতে দুর্বলের পক্ষে দাঁড়ানো একটি বিকল্প জোটে।

এই চুক্তি শুধু একটি মৌখিক প্রতিশ্রুতি ছিল তা নয়; তৎকালীন রীতি অনুযায়ী একে ধর্মীয়-সামাজিক আচারে রূপ দেওয়া হয়। জমজমের পানিতে সুগন্ধি মিশিয়ে উপস্থিত নেতারা তাতে হাত ডুবিয়ে অঙ্গীকার করেন, পরে কাবা প্রাঙ্গণে গিয়ে হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করে শপথ সম্পন্ন করেন।

সনদের মূল কথা ছিল, মক্কার হারাম সীমানার ভেতরে স্থানীয় বা বহিরাগত যে কারও ওপর অবিচার হলে সব পক্ষ মিলে একজোট হয়ে অত্যাচারীর মুখোমুখি হবে, যতক্ষণ না মজলুমের অধিকার ও সম্পদ পুরোপুরি ফিরিয়ে দেওয়া হয়। (আস-সুহাইলি, আর-রাওদুল উনুফ, ১/১৫৫, দারু ইহয়ায়িত তুরাসিল আরাবি, বৈরুত, ২০০০)

শপথ শেষেই নেতারা সরাসরি আস ইবনে ওয়ায়েলের বাড়িতে যান, আর যৌথ চাপের মুখে তিনি বণিকের সম্পূর্ণ পাওনা মিটিয়ে দিতে বাধ্য হন।

‘ফুজুল’ নামকরণের পেছনে দুটি ব্যাখ্যা প্রচলিত।

একটি মতে, অতীতে মক্কার আদি জুরহুম গোত্রের তিনজন ‘ফাজল’ নামধারী ব্যক্তি (আল-ফাজল ইবনে ফাজালাহ, আল-ফাজল ইবনে ওদাআহ এবং আল-ফুজাইল ইবনে আল-হারিস) অনুরূপ একটি ন্যায়বিচার চুক্তি করেছিলেন, আর সেই সাদৃশ্যেই নতুন চুক্তিকে ‘ফুজুল’ (ফাজল–এর বহুবচন) ডাকা হয়। (আল-জুবায়ের ইবনে বাক্কার, জামহারাতু নাসাবি কুরাইশ, পৃষ্ঠা ১৯, মাকতাবাতুল খানজি, কায়রো, ১৯৯৭)

অন্য ব্যাখ্যায়, আরবি ‘ফাজল’ শব্দের অর্থ অতিরিক্ত সদাচার—গোত্রীয় সংকীর্ণ স্বার্থের বাইরে গিয়ে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো বোঝাতেই এই নাম।

ঘটনাটি ঘটে হারবুল ফিজারের অবসানের কিছুকাল পরে, আনুমানিক ৩৩ হিজরি পূর্ব সনে, যখন নবীজির বয়স ছিল পূর্ণ বিশ চান্দ্রবছর। এই সময়কালকে গ্রেগরিয়ান বছরে ৫৯০ খ্রিষ্টাব্দের (মে-জুন) কাছাকাছি বলা যায়।

নবুয়তপ্রাপ্তির বহু বছর পরও মহানবী (সা.) এই চুক্তির কথা গর্বের সঙ্গে স্মরণ করতেন। তিনি বলেছেন, “আমি আবদুল্লাহ ইবনে জুদআনের ঘরে এমন একটি ন্যায়বিচারের চুক্তির সাক্ষী ছিলাম, যা আরবের মূল্যবান লাল উটের বিনিময়েও আমি ভাঙতে রাজি হতাম না। আর ইসলাম আসার পরও যদি এমন কোনো চুক্তির ডাক আসে, তবে আমি নিশ্চয় তাতে সাড়া দেব।” (বাইহাকি, আস-সুনানুল কুবরা , হাদিস: ১২৫৬৪)

আরেকটি বিখ্যাত হাদিসে তিনি বলেছেন, জাহেলি যুগে ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত যেসব চুক্তি হয়েছিল, ইসলাম তা দুর্বল করেনি, বরং আরও সুদৃঢ় করেছে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫২৫)

উমাইয়া শাসনামলে মদিনার প্রশাসক হোসাইন ইবনে আলীর মদিনার ‘জু-খুশুব’ উপত্যকার একটি বাগান জোরপূর্বক দখলের চেষ্টা করেন। হোসাইন (রা.) তখন প্রয়োজনে হিলফুল ফুজুলের ডাক দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন।

এই হাদিস দুটি থেকে ফিকহবিদেরা একটি নীতি বের করেন যে গোত্র, ধর্ম বা সীমানার ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের ন্যায্য অধিকার ও মজলুমের সুরক্ষার জন্য যেকোনো সর্বজনীন উদ্যোগে শামিল হওয়া ইসলামি শিক্ষার সঙ্গে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ। (আল-সুহাইলি, আর-রাওদুল উনুফ ফি শারহিস সিরাতিন নাবাবিয়্যাহ , ১/১৫৫, দারু ইহয়ায়িত তুরাসিল আরাবি, বৈরুত, ২০০০)

পরবর্তী প্রজন্মেও এই চুক্তি ছিল ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানোর একটি জীবন্ত নজির। উমাইয়া খলিফা মুয়াবিয়ার শাসনামলে মদিনার প্রশাসক ছিলেন ওয়ালিদ ইবনে উতবা। তিনি নবীজির দৌহিত্র হোসাইন ইবনে আলীর মদিনার ‘জু-খুশুব’ উপত্যকার একটি বাগান জোরপূর্বক দখলের চেষ্টা করেন। হোসাইন (রা.) তখন প্রয়োজনে হিলফুল ফুজুলের ডাক দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন।

তিনি প্রশাসককে লক্ষ্য করে বলেন, “আল্লাহর শপথ, হয় তুমি আমার সম্পূর্ণ অধিকার ও পাওনা ফিরিয়ে দেবে, নতুবা আমি আমার তরবারি উন্মুক্ত করব এবং মদিনার মসজিদে দাঁড়িয়ে ‘হিলফুল ফুজুল’-এর আহ্বান জানাব।”

এই ঘোষণা শুনে আবদুল্লাহ ইবনে জোবাইর ও আবদুর রহমান ইবনে আউফের মতো প্রভাবশালী প্রবীণ সাহাবিরা প্রকাশ্যে হোসাইনের পক্ষ নেওয়ার অঙ্গীকার করেন। একইভাবে বনু জুহরাহ গোত্রের মিসওয়ার ইবনে মাখরামা (রা.) এবং বনু তাইমের নেতৃস্থানীয়রা এগিয়ে আসেন।

সম্মিলিত এই চাপের মুখে প্রশাসক নতি স্বীকার করে সম্পত্তি ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হন। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ১/১৩৫, দারুল কিতাবিল আরাবি, বৈরুত, ১৯৯০)

প্রায় ষাট বছর পরও এই পুরোনো চুক্তির নৈতিক ওজন যে অটুট ছিল, এই ঘটনা তারই প্রমাণ।