ইসলামের আগমনের পর জ্ঞানার্জনকে ব্যক্তিগত কর্তব্য ঘোষণা করা হলেও প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার আদি রূপ ছিল মসজিদ কেন্দ্রিক। ছোটদের স্বাভাবিক চঞ্চলতা ও মসজিদের পবিত্রতা রক্ষার স্বার্থে দ্রুতই শিশুদের জন্য পৃথক পাঠশালার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এভাবেই মসজিদকে প্রাপ্তবয়স্কদের উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষণার কেন্দ্রে পরিণত করা হয়, অন্যদিকে নগরজুড়ে গড়ে ওঠে ‘কুত্তাব’ বা ‘মকতব’ নামক স্বতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক পাঠশালা।

ইসলামি বিজয়ের ফলে আরব উপদ্বীপের বাইরে নওমুসলিম ও স্থানীয় শিশুদের মধ্যে আরবি ভাষা ও কুরআনের পরিচয় ঘটানোর লক্ষ্যে মকতবের বিস্তার ত্বরান্বিত হয়। ‘কিতাবাত’ বা লেখালিখি থেকে উদ্ভূত এই শব্দটির আভিধানিক অর্থ থেকেই এর কার্যকারিতা স্পষ্ট। ড. আহমদ শালবি ইসলামি ইতিহাসের প্রাথমিক যুগের মকতবগুলোকে প্রধানত দুটি ধারায় বিভক্ত করেছেন। এক. সাধারণ শিশু পাঠশালা—যেখানে ছোটদের পড়তে শেখা, লিখতে শেখা, সুন্দর হস্তলিপি (খত), বানানরীতি ও প্রাথমিক পাটিগণিত শেখানো হতো। দুই. কুরআন পাঠ, হিফজ এবং ইসলামের মৌলিক অনুশাসন শেখানোর পাঠশালা। (আহমদ শালবি, তারিখুত তারবিয়াতিল ইসলামিয়্যাহ , কায়রো: দারুল মাআরিফ, ১৯৫৪, পৃষ্ঠা: ৩৪)

বসরা, কুফা, ফুসতাত, কায়রোয়ান, দামেস্ক ও আলেপ্পোর মতো প্রতিটি প্রধান প্রধান শহরে শত শত মকতব গড়ে ওঠে। হিজরি দ্বিতীয় শতকের পর থেকে মকতব ব্যবস্থার মধ্যে দুটি লক্ষণীয় পরিবর্তন দেখা যায়: সংখ্যাগত ব্যাপকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তার। প্রতিটি গ্রাম ও মহল্লায় একাধিক মকতব প্রতিষ্ঠিত হয়। পর্যটক ইবনে হাওকাল সিসিলির পালের্মো নগরী ভ্রমণ করে দেখতে পান যে কেবল সেই একটি শহরেই তিন শতাধিক মকতবের শিক্ষক পাঠদান করছেন। (মুহাম্মদ ইবনে হাওকাল, সুরাতুল আরদ , ১/১২১, বৈরুত: দারু সাদির, ১৯৩৮) মকতবগুলো কেবল এক কক্ষের সাধারণ মক্তব থেকে রূপান্তরিত হয়ে বহুশিক্ষকবিশিষ্ট বিশাল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের রূপ লাভ করে। ঐতিহাসিক ইয়াকুত আল-হামাবি বর্ণনা করেন, মধ্য এশিয়ার প্রখ্যাত শিক্ষক আবু আল-কাসিম আল-বালখির মকতবে প্রায় তিন হাজার শিশু একসঙ্গে পড়ত; পুরো পাঠশালার তদারকি করতে এবং সব ছাত্রের কাছে পৌঁছাতে স্বয়ং শিক্ষককে একটি গাধার পিঠে চড়ে পাঠশালা পরিদর্শন করতে হতো। (আল-হামাবি, মুজামুল উদাবা , ৫/২১০৭, বৈরুত: দারুল গারবিল ইসলামি, ১৯৯৩)

আব্বাসীয় যুগে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও সরকারি দপ্তরের ব্যাপক বিস্তৃতির কারণে দক্ষ জনবলের চাহিদা মেটাতে খলিফাগণ এবং রাজপরিবারের সদস্যরা বিপুল পরিমাণ স্থাবর সম্পত্তি এসব কুত্তাবের নামে ‘ওয়াকফ’ করে দেন, যার মাধ্যমে শিক্ষকদের নিয়মিত বেতন ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হতো। তৎকালীন নারী শিক্ষার বিষয়েও মকতবের বিশেষ ভূমিকা ছিল। ঐতিহাসিক ফতোয়া ও শিক্ষাবিষয়ক পুস্তিকাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে মেয়েরাও শৈশবে কুত্তাবে পড়ালেখা করত। তবে শৃঙ্খলা ও নৈতিক সুরক্ষার স্বার্থে ছেলেদের থেকে মেয়েদের জন্য পৃথক আসন বা স্বতন্ত্র ক্লাসের ব্যবস্থা করা হতো। (আবুল হাসান আল-কাবেসি, আর-রিসালাতুল মুফাসসিলাহ লি-আহওয়ালিল মুতাআল্লিমিন ওয়া আহকামিল মুয়াল্লিমিন , পৃষ্ঠা: ৭৬, কায়রো: দারুল মাআরিফ, ১৯৮৬)

আন্দালুসের পণ্ডিত ইবনে আবদুন শিক্ষাদানকে মনস্তাত্ত্বিক দক্ষতার এক শিল্প হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছেন, “শিক্ষাদান হলো এমন এক পেশা যার জন্য গভীর জ্ঞান, বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং সীমাহীন কোমলতার প্রয়োজন। এটি ঠিক একটি বুনো তরুণ অশ্বশাবককে বশ মানানোর প্রশিক্ষণের মতো; যা পরিচালনা করতে হয় চরম প্রজ্ঞা, ভালোবাসা ও অনুকম্পার মাধ্যমে, যাতে সে ধীরে ধীরে শিক্ষাকে আপন করে নিতে পারে।” (মুহাম্মদ ইবনে আহমদ ইবনে আবদুন, রিসালাহ ফিল কাজা ওয়াল হিসবাহ , প্যারিস: ইনভেঁতের দ্য লেকোল দ্য লঁগ ওরিয়ঁতাল, ১৯৩৪, পৃষ্ঠা: ৪৩) সে যুগের আলেমগণ শিক্ষকের জন্য কিছু অনন্য নৈতিক ও পেশাগত শর্ত নির্ধারণ করেছিলেন: একনিষ্ঠ নিয়ত, চরিত্রের উজ্জ্বলতা, অপরিপক্কতার পরিহার এবং বয়সোচিত পাঠদান। প্রখ্যাত সুফি আল-শিবলি যেমন বলতেন, সময়ের আগেই যে নিজেকে বড় শিক্ষক হিসেবে জাহির করে, সে মূলত নিজের অপমানকেই ডেকে আনে।

শিক্ষার সফলতার জন্য ইসলামি সমাজ পরিবার ও বিদ্যালয়ের মধ্যকার গভীর সংযোগের ওপর জোর দিয়েছে। ইমাম বুরহানুদ্দিন আল-জারনুজি লিখেছেন, “শিক্ষা প্রক্রিয়ার পূর্ণতার জন্য তিনটি পক্ষের সম্মিলিত আন্তরিক প্রচেষ্টা অনিবার্য—শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং পিতা।” (আল-জারনুজি, তালিমুল মুতাআল্লিম তারিকাত তাআল্লুম , পৃষ্ঠা: ৩২, দামেস্ক: দারু ইবনি কাসির, ১৯৮৬) পরিবার যদি নৈতিক সহযোগিতা না দেয়, তবে শিক্ষকের একমুখী প্রচেষ্টা সফল হতে পারে না। শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও শেখানো হতো শিক্ষকের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, নম্র আচরণ, সময়ের পাবন্দি এবং অতিরিক্ত কূটতর্ক পরিহার করে একাগ্রচিত্তে পাঠ গ্রহণের শিষ্টাচার।

সাধারণত ছয় বছর বয়স থেকে শিশুরা মকতবে যাত্রা শুরু করত। একটি সাধারণ মকতব ছিল মূলত এক বা দুটি প্রশস্ত কক্ষবিশিষ্ট সরল পরিবেশ, যেখানে শিক্ষক এবং তাঁর প্রধান সহকারী বা ‘নকিব’ পুরো পাঠচক্র পরিচালনা করতেন। দৈনন্দিন রুটিন অনুযায়ী ভোরবেলা ফজর নামাজের পরপরই পাঠশালা শুরু হতো। দিনের শুরুতে শিশুরা কুরআনের নির্ধারিত একটি অংশ মুখস্থ করত। এরপর দুপুর পর্যন্ত চলত কাঠের বা পাথরের ফলকে (লওহ) সেই পাঠ লিখে নেওয়া এবং শিক্ষকের সামনে তা নির্ভুলভাবে পড়ে শোনানো। জোহরের পর কিছুটা বিরতি নিয়ে আসর পর্যন্ত চলত আরবি ব্যাকরণ, হস্তলিপি ও গণিতের চর্চা। বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত ছিল সাপ্তাহিক ছুটি। পাঁচ থেকে ছয় বছরের এই পাঠশালা জীবনে একটি শিশু সাধারণত সম্পূর্ণ কুরআন পাঠ ও মুখস্থ শেষ করত, নির্ভুল হস্তলিপিতে দক্ষ হতো এবং আরবি ভাষা ও প্রাথমিক গণিতে বুৎপত্তি অর্জন করত। পাঠ শেষ হলে আয়োজন করা হতো ‘খাতমাহ’ উৎসবের, যার মাধ্যমে শিশুটির প্রাথমিক শিক্ষার সমাপ্তি উদযাপিত হতো।

এই ব্যবস্থার ফলাফল ছিল অবিশ্বাস্যরকম মজবুত। প্রাথমিক বয়সেই কুরআন ও ভাষার ওপর অভূতপূর্ব দখলের কারণে শিক্ষার্থীরা পরবর্তী সময়ে বিশ্বমানের পণ্ডিত হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারত। ঐতিহাসিক কামালুদ্দিন ইবনুল আদিম উল্লেখ করেছেন, তিনি সাত বছর বয়সে মকতবে ভর্তি হয়ে মাত্র নয় বছর বয়সে কুরআন সমাপ্ত করেন এবং দশ বছর বয়সেই কুরআনের দশটি ভিন্ন পঠনরীতিতে (কিরাআত আশারাহ) পূর্ণ দখল অর্জন করেন। (ইবনুল আদিম, বুগয়াতুত তলাব ফি তারিখি হালাব , ১/৪২, বৈরুত: দারুল ফিকর, ১৯৮৮) মকতব ছিল মূলত ইসলামি সভ্যতার সেই আদি ভিত, যা প্রতিটি শিশুকে শৈশবেই নৈতিকতা, ভাষা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের এক চমৎকার আবহে গড়ে তুলত। শিশুদের প্রাথমিক মনস্তত্ত্ব, পারিবারিক দায়িত্ব এবং শিক্ষকের নৈতিক প্রভাবের যে সুষম মেলবন্ধন এই মকতবগুলোতে চর্চিত হতো, তা আজকের আধুনিক প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার জন্যও এক অমূল্য দিকনির্দেশনা।