প্রতিভা মানুষের জীবনে একটি সম্ভাবনা মাত্র; তা পরিপূর্ণতা পায় দক্ষতায় রূপান্তরিত হলে। জন্মগত মেধাকে পরিচর্যা, শিক্ষা, অনুশীলন ও নিষ্ঠার মাধ্যমে ফলপ্রসূ করতে হয়। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ বা রাষ্ট্র—প্রতিটি স্তরের অগ্রগতি মানুষের কর্মদক্ষতার ওপর নির্ভরশীল। কোরআন-সুন্নাহর নির্দেশনায় কর্মজীবনের এমন একটি পূর্ণাঙ্গ দর্শন রয়েছে, যা মানুষকে কর্মদক্ষ হয়ে উঠতে উদ্বুদ্ধ করে। সেই নির্দেশনাগুলোই তুলে ধরা হলো—
দক্ষতার সূচনা হয় দায়িত্ববোধ থেকে। কোনো দায়িত্বকে আমানত হিসেবে গ্রহণ করলে তাতে আন্তরিকতা বাড়ে। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন, তোমরা যেন আমানত তার প্রাপকদের নিকট পৌঁছে দাও।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৫৮) চাকরি, ব্যবসা, শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রশাসন—যেকোনো বৈধ পেশায় মানুষের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সময়মতো যথার্থভাবে সম্পাদন করা এবং নিজের অবস্থানের অপব্যবহার না করাই আমানত রক্ষার অংশ।
শুধু সৎ হলেই সব কাজের উপযুক্ত হওয়া যায় না, আবার অসাধারণ পারদর্শিতা থাকলেও বিশ্বাসযোগ্যতা না থাকলে সেই যোগ্যতা বিপদের কারণ হতে পারে। ইসলাম এই দুই গুণকে একসূত্রে বেঁধে দিয়েছে। মুসা (আ.) সম্পর্কে এক নারী বলেছিলেন, ‘আপনি যাকে কর্মে নিয়োগ দেবেন, তাঁর মধ্যে সর্বোত্তম সেই, যে শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত।’ (সুরা কাসাস, আয়াত: ২৬) বিশ্বস্ততার দাবি প্রতারণামুক্ত আচরণেও প্রতিফলিত হতে হয়। প্রতারণা বা দায়িত্বে ফাঁকি দিয়ে অর্জিত সাফল্য ইসলামের দৃষ্টিতে মর্যাদাপূর্ণ নয়। নবীজি (সা.) বলেন, ‘যে আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০১) অর্থাৎ কাজের জন্য যেমন যোগ্যতা প্রয়োজন, তেমনি অপরিহার্য বিশ্বস্ততা ও সততা; এই তিনটি মিলেই গড়ে ওঠে প্রকৃত কর্মদক্ষতা।
অজ্ঞতা দক্ষতার সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকগুলোর একটি। যে ব্যক্তি নিজের কাজ সম্পর্কে অজ্ঞ, সে আন্তরিক হলেও বারবার ভুল করে। তাই ইসলাম জ্ঞানকে মর্যাদার শিখরে স্থাপন করেছে। আল্লাহ তাঁর নবীকেও দোয়া শিখিয়েছেন, ‘বলুন, হে আমার প্রতিপালক! আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করুন।’ (সুরা ত্বহা, আয়াত: ১১৪) জ্ঞান কোনো নির্দিষ্ট বয়স বা প্রতিষ্ঠানের গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়। যিনি শেখার দরজা বন্ধ করে দেন, তার উন্নতির পথও সংকুচিত হয়ে আসে। কর্মদক্ষতা ধরে রাখতে হলে অবিরাম শেখার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।
অক্ষমতা সব সময় মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকে না, কিন্তু অলসতা অনেক সময় সদিচ্ছার দুর্বলতা ও অনিয়ন্ত্রিত অভ্যাস থেকে জন্ম নেয়। সময়কে সুশৃঙ্খলভাবে ব্যবহারের অভ্যাস কর্মক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। অনেক প্রতিভা দক্ষতায় পরিণত হয় না কেবল সময়ের অপচয় আর অবহেলার কারণে। যে কাজ আজ করা সম্ভব, অকারণে তা আগামীকালের জন্য রেখে দেওয়া সচেতন মানুষের কাজ নয়। ইসলাম অলসতাকে এমন একটি দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে হয়। রাসুল (সা.) দোয়া করতেন, ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজু বিকা মিনাল-আজযি ওয়াল-কাসালি।’ অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে অক্ষমতা ও অলসতা থেকে আশ্রয় চাই।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৮২৩)
হঠাৎ সাফল্যের পেছনে অধিকাংশ সময় থাকে দীর্ঘ প্রস্তুতি। ইসলাম প্রস্তুতিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা তাদের মোকাবিলায় তোমাদের সাধ্যানুযায়ী শক্তি প্রস্তুত রাখো।’ (সুরা আনফাল, আয়াত: ৬০) আয়াতটি যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে অবতীর্ণ হলেও এর মধ্যে প্রস্তুতির একটি সুস্পষ্ট নীতি রয়েছে। কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের মুখোমুখি হওয়ার আগে সামর্থ্য অনুযায়ী প্রয়োজনীয় উপকরণ ও সক্ষমতা গড়ে তোলা সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি।
নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করাও প্রজ্ঞার পরিচয়। সবাই সবকিছু জানে না। এ জন্য ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরামর্শের নির্দেশ দিয়েছে। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আর আপনি (গুরুত্বপূর্ণ) কাজে তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ করুন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৫৯) পরামর্শ গ্রহণ মানে নিজের সিদ্ধান্তের ক্ষমতা বিসর্জন দেওয়া নয়, বরং একটি বিষয়কে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ সৃষ্টি করা।
ইসলাম দুর্বল ও অক্ষম অবস্থার ওপর সন্তুষ্ট না থেকে সামর্থ্য বৃদ্ধির প্রেরণা দেয়। হাদিসে নবীজি (সা.) বলেন, ‘শক্তিশালী মুমিন আল্লাহর কাছে দুর্বল মুমিনের চেয়ে অধিক উত্তম ও প্রিয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৬৪) অন্য হাদিসে এসেছে, ‘শক্তিশালী মুমিনের উদাহরণ খেজুরগাছের মতো আর দুর্বল মুমিনের উদাহরণ কোমল শস্যের চারার মতো।’ (দাইলামি, আল-ফিরদাউস, ৪/১৩২, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৪০৬ হিজরি) বর্ণনাটিতে খেজুরগাছের উপমার মাধ্যমে মুমিনের দৃঢ়তা ও প্রতিকূলতা মোকাবিলায় সক্ষমতার দিকটি তুলে ধরা হয়েছে।
আল্লাহর ওপর নির্ভরতা কর্মবিমুখতার অজুহাত নয়। চেষ্টা ছাড়া ফলাফলের অপেক্ষা করা তাওয়াক্কুল নয়। সাধ্যানুযায়ী প্রচেষ্টা চালিয়ে ফলাফল আল্লাহর হাতে সমর্পণ করাই মুমিনের তাওয়াক্কুল। যথার্থ পরিকল্পনা ও পরিশ্রমের উপস্থিতি সত্ত্বেও ফলাফলের ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ থাকে না। ইসলামের কর্ম দর্শন মানুষকে একদিকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে শেখায়, অন্যদিকে ফলাফল নিয়ে অহংকার কিংবা হতাশায় ডুবে যেতে নিষেধ করে। কোরআনে এসেছে, ‘অতঃপর, যখন তুমি (কোনো কাজের) দৃঢ়সংকল্প করবে, তখন আল্লাহর ওপর ভরসা করো।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৫৯) এখানে আগে রয়েছে সংকল্প, তারপর তাওয়াক্কুল।
এই নির্দেশনাগুলো মেনে চললে কর্মজীবনে সাফল্য তো আসবেই, পাশাপাশি তা রূপ নেবে অর্থবহ ইবাদতে।
নাহিদা সুলতানা: আলেমা ও প্রাবন্ধিক
[email protected]