বিরোধীদল দমনে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) পুনরায় ‘হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। একই সঙ্গে অস্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে দলটি।
বুধবার (০২ সেপ্টেম্বর) রাত ১০টা ২২ মিনিটে নিজেদের ফেসবুক পেজে দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্য সচিব আখতার হোসেন এক যৌথ বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়েছেন।
এতে বলা হয়, দীর্ঘ ৭ মাস দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) কমিশনারবিহীন ও কার্যত অকার্যকর রেখে দেওয়ার পর সম্প্রতি যে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ অস্বচ্ছ, দলীয় স্বার্থপ্রসূত এবং অগ্রহণযোগ্য বলে তীব্র প্রতিবাদ ও ক্ষোভ প্রকাশ করছে এনসিপি।
বিবৃতিতে নাহিদ ইসলাম ও আখতার হোসেন বলেন, ‘আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতানুযায়ী, আপিল বিভাগের একজন সাবেক বিচারপতিকে কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ প্রদান সংবিধানের ৯৯ অনুচ্ছেদের প্রত্যক্ষ লঙ্ঘন। একই সঙ্গে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক প্রণীত দুদক অধ্যাদেশ বাতিল করে দুদককে আবারও ফ্যাসিবাদী আমলের মতো সরকারি দলের আজ্ঞাবহ কমিশনে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে; যা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনা ও জুলাই সনদে বর্ণিত স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার নীতিকে সম্পূর্ণ বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পুনরায় একপেশে ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সম্পন্ন করা একটি পদক্ষেপ।’
নেতৃদ্বয় বলেন, ‘গত ৭ মাসে ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও তাদের পরিবারের বিরুদ্ধে প্রভাব খাটিয়ে সরকারি কাজ হাসিল এবং জনগণের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অথচ এসব নগ্ন দুর্নীতি ও স্বার্থের সংঘাতের খবরের বিরুদ্ধে দুদক সম্পূর্ণ নীরব ভূমিকা পালন করছে। দুর্নীতির প্রতি কমিশনের এ অন্ধত্ব প্রমাণ করে যে, এটি শুরুতেই অসাংবিধানিকতার প্রশ্ন ও স্বচ্ছতাহীনতার কালিমা নিয়ে গঠিত হয়েছে। ফলে এ বিতর্কিত কমিশনের কোনো ধরনের নৈতিক ও আইনি বৈধতা থাকতে পারে না।’
তারা বলেন, ‘যখনই বিরোধী দলসমূহ জনগণের মৌলিক অধিকার আদায় ও গণরায় অনুযায়ী রাষ্ট্র সংস্কারের দাবিতে রাজপথে নামছে, ঠিক তখনই নিজেদের অপকর্ম ঢাকতে এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমাতে দুদককে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার পুরোনো অপকৌশল শুরু হয়েছে। এটি মূলত পরাজিত ফ্যাসিবাদের আমলের সেই পুরোনো ও নিপীড়নমূলক কায়দারই এক বিপজ্জনক পুনরাবৃত্তি মাত্র। ফ্যাসিবাদী আমলে যেই আইনের অধীনে সরকারের আজ্ঞাবহ কমিশন হিসেবে দুদক গঠিত ও পরিচালিত হতো, সেই একই আইনে বর্তমান কমিশনও গঠিত। ইতিহাস সাক্ষী, এ একই দুর্নীতি দমন কমিশনকে ব্যবহার করে গণতন্ত্রের আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলে অন্তরীণ করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। সেই একই মিথ্যা মামলায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও ফ্যাসিবাদের ক্যাঙারু কোর্টে সাজা দেওয়া হয়েছিল। যেই মামলা পরবর্তীতে উচ্চ আদালতে বাতিল হয়ে যায়।’
এনসিপির আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব বলেন, “অতীতেও কমিশনকে যেভাবে সরকারের প্রতিপক্ষ দমনের অস্ত্র বানানো হয়েছিল, আজও সেই একই অশুভ কর্মকাণ্ড লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নবগঠিত কমিশনকে ব্যবহার করে বিরোধীদল দমনের ‘ড্রেস রিহার্সেল’ আবারও সামনে এসেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধানের খবর আজ বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। অনুসন্ধানের শুরুতেই দুদকের মুখপাত্র প্রেস ব্রিফিংয়ে সংবাদমাধ্যমের সামনে দাবি করেন, প্রাথমিক তদন্তে ‘দুর্নীতির সত্যতা’ পাওয়া গেছে। অথচ এর পরপরই সাংবাদিকদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে বার্তা দিয়ে ওই কর্মকর্তাই আবার ‘প্রাথমিক সত্যতা’ শব্দটি ব্যবহার না করার অনুরোধ জানান।”
বিবৃতিতে তারা বলেন, ‘সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশ্যে অসত্য তথ্য দেওয়ার পর গোপনে হোয়াটসঅ্যাপে তা সংশোধনের এ অপচেষ্টার মাধ্যমে দুদক তার ন্যূনতম বিশ্বাসযোগ্যতা ও নিরপেক্ষতা হারিয়েছে। যেই কমিশন তদন্ত শুরুর আগেই মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ায়, সেই কমিশনের অধীনে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে আনীত কোনো অভিযোগের স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত অসম্ভব। এনসিপি নেতৃবৃন্দ মনে করেন, বর্তমান অসাংবিধানিক কমিশন বাতিল করে জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ায় কমিশন পুনর্গঠিত হলেই কেবল নিরপেক্ষ তদন্ত সম্ভব। অন্যথায়, এসব লোক দেখানো অনুসন্ধান যে পরাজিত ফ্যাসিবাদের কায়দায় বিরোধীদল দমনেরই নতুন চক্রান্ত, তা দেশবাসীর কাছে অতি পরিষ্কার। তাই অনতিবিলম্বে সরকারকে এ ফ্যাসিবাদী পথ থেকে ফিরে আসার আহ্বান জানানো হচ্ছে।’
তারা বলেন, ‘এনসিপি স্পষ্ট ভাষায় বলতে চায়, অসাংবিধানিক ও বিতর্কিত প্রক্রিয়ায় গঠিত এ নিয়োগ অনতিবিলম্বে বাতিল করতে হবে। জুলাই সনদে উল্লিখিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী একটি নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও যোগ্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন করতে হবে। দুদককে ‘বিরোধী দল দমন কমিশন’-এ পরিণত করার অপচেষ্টা বন্ধ করে সরকারের ভেতরে থাকা দুর্নীতিবাজ ও লুটেরাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।”
চরম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে তারা আরও বলেন, ‘দুদকের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক ইনস্টিটিউশনকে আবারও সরকারি দলের অবৈধ কর্মকাণ্ড এবং ক্ষমতার রক্ষাকবচ বানানোর চক্রান্ত জনগণ মেনে নেবে না। অনতিবিলম্বে এ অসাংবিধানিক নিয়োগ বাতিল করে স্বাধীন প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা না হলে, এনসিপি দেশের আপামর জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথে তীব্র প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলবে।’