বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৩ সালে দেশে প্রথম জাতীয় বেতন স্কেল ঘোষণা করা হয়েছিল। তখন সরকারি চাকরিতে সর্বনিম্ন গ্রেডে চাকরি শুরু করা একজনের মূল বেতন ছিল ১৩০ টাকা। আর সর্বোচ্চ গ্রেডে মূল বেতন ছিল ২ হাজার টাকা।
৫৩ বছর পর সেই বেতনকাঠামোয় বড় পরিবর্তন এসেছে। এবার ২০২৬ সালের নতুন জাতীয় বেতনকাঠামোয় সরকারি চাকরিজীবীদের সর্বনিম্ন, অর্থাৎ ২০তম গ্রেডে চাকরির শুরুতে মূল বেতন হবে ২০ হাজার টাকা। আর সর্বোচ্চ, অর্থাৎ প্রথম গ্রেডের মূল বেতন হবে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। এবারই সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন লাখ টাকা ছাড়াল।
অর্থাৎ ১৯৭৩ সালের ১৩০ টাকা থেকে ২০২৬ সালে সর্বনিম্ন প্রারম্ভিক মূল বেতন ২০ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। পাঁচ দশকের বেশি সময়ে এই বেতন বেড়েছে প্রায় ১৫৪ গুণ। আর সর্বোচ্চ মূল বেতন ২ হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা, অর্থাৎ বেড়েছে ৭৮ গুণ।
নতুন বেতনকাঠামোয় গ্রেডভেদে মূল বেতন বাড়বে ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত। গত সোমবার সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতনকাঠামো ২০২৬ অনুমোদন করা হয়েছে। মূল বেতন, ভাতাসহ মোট চার ধাপে এই বেতনকাঠামো বাস্তবায়িত হবে। এটি গত জুলাই থেকে কার্যকর হবে।
১৯৭৩ সালে ঘোষিত প্রথম জাতীয় বেতন স্কেলের নাম ছিল ‘ন্যাশনাল স্কেলস অব পে-১৯৭৩ ’। তখন চাকরিতে ১০টি গ্রেড বা ধাপ ছিল। তবে ওপরের প্রথম চারটি গ্রেডের বেতন বাস্তবায়ন করা হয়নি।
তখন সর্বোচ্চ ধাপে শুরুর মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছিল ২ হাজার টাকা। আর সর্বনিম্ন ধাপে চাকরি শুরু করা একজনের মূল বেতন ছিল ১৩০ টাকা।
এর চার বছর পর ১৯৭৭ সালে নতুন জাতীয় বেতন স্কেল করা হয়। তখন ২১টি গ্রেডে বেতন নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছিল। সর্বনিম্ন শুরুর মূল বেতন নির্ধারণ করা হয় ২২৫ টাকা। ইনক্রিমেন্ট পেয়ে তা ৩১৫ টাকা পর্যন্ত যাওয়ার সুযোগ ছিল। সর্বোচ্চ গ্রেডের মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩ হাজার টাকা।
১৯৮৫ সালের জাতীয় বেতন স্কেলে সর্বনিম্ন মূল বেতন শুরুতে নির্ধারণ করা হয় ৫০০ টাকা। ইনক্রিমেন্ট পেয়ে তা ৮৬০ টাকা পর্যন্ত যাওয়ার সুযোগ ছিল। ওই সময় ২০টি গ্রেডে বেতন নির্ধারণ করা হয়েছিল। সর্বোচ্চ গ্রেডে মূল বেতন দ্বিগুণ হয়ে নির্ধারিত হয় ৬ হাজার টাকা।
এর ছয় বছর পর ১৯৯১ সালে আসে নতুন বেতন স্কেল। ‘জাতীয় বেতন স্কেল, ১৯৯১ (সরকারি-বেসরকারি) ’-তে ২০টি গ্রেড ছিল। সর্বনিম্ন গ্রেডে চাকরির শুরুতে মূল বেতন নির্ধারণ করা হয় ৯০০ টাকা। ইনক্রিমেন্ট যোগ হয়ে তা ১ হাজার ৫৩০ টাকা পর্যন্ত যাওয়ার সুযোগ ছিল। সর্বোচ্চ গ্রেডের মূল বেতন ছিল ১০ হাজার টাকা। এই বেতন ছিল নির্ধারিত, অর্থাৎ এর বেশি হওয়ার সুযোগ ছিল না।
১৯৯৭ সালের বেতনকাঠামো কার্যকর হয় ওই বছরের জুলাই থেকে। তখন সর্বনিম্ন গ্রেডে চাকরির শুরুতে মূল বেতন করা হয় ১ হাজার ৫০০ টাকা। ইনক্রিমেন্ট পেয়ে তা ২ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত যাওয়ার সুযোগ ছিল। সর্বোচ্চ গ্রেডের মূল বেতন নির্ধারণ করা হয় ১৫ হাজার টাকা।
২০০৫ সালে আসে ষষ্ঠ বেতনকাঠামো। এতে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৬০ শতাংশ বাড়িয়ে ২ হাজার ৪০০ টাকা করা হয়। ওই স্কেলেই প্রথমবারের মতো সর্বোচ্চ মূল বেতন ২০ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যায়। প্রথম গ্রেডের বেতন ৫৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ বেড়ে হয় ২৩ হাজার টাকা।
ছয় বছর পর, ২০০৯ সালের জাতীয় বেতন স্কেলে সর্বনিম্ন মূল বেতন শুরুতে ৪ হাজার ১০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। সর্বোচ্চ গ্রেডে মূল বেতন ঠিক করা হয় ৪০ হাজার টাকা। এটিও ছিল নির্ধারিত বেতন।
এরপর ২০১৫ সালের বেতনকাঠামোয় বেতন প্রায় দ্বিগুণ হয়। ২০তম গ্রেডে চাকরির শুরুতে মূল বেতন নির্ধারণ করা হয় ৮ হাজার ২৫০ টাকা। তবে ইনক্রিমেন্ট পেয়ে তা ২০ হাজার ১০ টাকা পর্যন্ত যাওয়ার সুযোগ ছিল। গ্রেড-১-এর একজন কর্মকর্তার মূল বেতন নির্ধারণ করা হয় ৭৮ হাজার টাকা।
২০১৫ সালের বেতনকাঠামোর প্রায় এক দশক পর এবার নতুন জাতীয় বেতনকাঠামো ২০২৬ অনুমোদন করা হয়েছে। নতুন কাঠামোয় সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডে চাকরির শুরুতে মূল বেতন হবে ২০ হাজার টাকা। সর্বোচ্চ প্রথম গ্রেডে মূল বেতন হবে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।
অর্থাৎ ১৯৭৩ সালে ১৩০ টাকা দিয়ে যে বেতনযাত্রা শুরু হয়েছিল, ৫৩ বছর পর তা সর্বনিম্ন ২০ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। আর সর্বোচ্চ মূল বেতন ২ হাজার থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকায়।
সরকারি চাকরিজীবীরা মূল বেতনের নির্দিষ্ট হারে বাড়িভাড়া পান। গ্রেড ও এলাকাভেদে এই ভাতায় কিছুটা ভিন্নতা আছে। বাড়িভাড়ার বাইরে সবার জন্য রয়েছে ১ হাজার ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা। এর সঙ্গে সন্তানের জন্য শিক্ষাসহায়ক ভাতা, উৎসব ভাতা, বৈশাখী ভাতা এবং সরকারি দায়িত্ব ও যাতায়াতের জন্য টিএ বা ডিএসহ অন্যান্য আর্থিক সুবিধা রয়েছে।
নতুন বেতনকাঠামোয় সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য মুঠোফোনের ভাতাও যুক্ত করা হয়েছে। বেতন গ্রেড অনুযায়ী এসব ভাতা নির্ধারিত হবে। ফলে সব মিলিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে।