আগামী ১৫ দিনের মধ্যে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হবে বলে জাতীয় সংসদে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেছেন, আগস্টে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিয়ে যে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে, সেপ্টেম্বরে তা যাতে আর না হয় এ জন্য সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।

দেশের চলমান বিদ্যুতের সংকট-সম্পর্কিত বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম বুলবুলের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে আজ বুধবার জাতীয় সংসদে এ কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী। বেলা সাড়ে তিনটায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের অধিবেশন শুরু হয়।

বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি, নিছক কথামালার আড়ালে প্রকৃত সত্যকে লুকাতে চাই না। বর্তমানে সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের মানুষ বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সরবরাহের কারণে কষ্টে আছে।’ এ পরিস্থিতির জন্য সরকারের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিনের ভুল নীতির অনিবার্য পরিণতি হিসেবে বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংকটও নতুন করে চাপ সৃষ্টি করেছে। তাঁর ভাষ্য, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্য সংকট সামনে আসে, যার প্রভাব জ্বালানি সরবরাহের ওপর পড়েছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের গ্যাসভিত্তিক পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে আমাদের উৎপাদনসক্ষমতা হচ্ছে ১২ হাজার মেগাওয়াট। এই ১২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যদি উৎপাদন করতে হয়, তাহলে আমাদের ১ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রতিদিন সরবরাহ করতে হবে। অথচ দেশে উৎপাদন এবং আমদানিকৃত এলএনজির মাধ্যমে আমরা মাত্র ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করতে পারি।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘তাহলে আমি যদি ১২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে চাই, শুধু গ্যাস থেকে, তাহলে আমার সব শিল্প খাত ধসে যাবে। বাসাবাড়িতে গ্যাস–সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে হবে। এটিও কোনো কাজের কথা নয়। সে কারণে আমাদের শিল্প খাত, বিদ্যুৎ খাত এবং গৃহস্থালি খাত—সব জায়গায় একটি ভারসাম্য আনতে হচ্ছে।’

বর্তমান বিদ্যুৎ–সংকটের পেছনে কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বন্ধ থাকার বিষয়টিও উল্লেখ করেন অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি জানান, পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৬১৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি ইউনিট কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ রয়েছে। একই ক্ষমতার মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের আরেকটি ইউনিট রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ রয়েছে।

ভারতের আদানি গ্রুপ থেকে চুক্তি অনুযায়ী বিদ্যুৎ না পাওয়ার বিষয়টিও সংসদে তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, চুক্তি অনুযায়ী ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে দিনে প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যায় প্রায় ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। এ ছাড়া আমদানিকৃত এলএনজি সরবরাহে ব্যবহৃত দুটি ভাসমান টার্মিনাল বা এফএসআরইউতে ত্রুটি দেখা দেওয়ায় জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছিল বলে জানান তিনি।

গত ২১ জুলাই এফএসআরইউতে ত্রুটি দেখা দেয় এবং তা মেরামতে প্রায় ২২ দিন সময় লাগে। এর প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। তবে এ সংকটের প্রায় ৮৮ শতাংশ সমাধান করা সম্ভব হয়েছে বলে দাবি করেন প্রতিমন্ত্রী।

পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্রুত পায়রা ও মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের বন্ধ ইউনিটগুলো চালু করার ওপর জোর দেন তিনি। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশাবাদী প্রতিমন্ত্রী।

আগামী গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ–সংকট মোকাবিলায় রুফটপ (ছাদ) সোলারসহ দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকার যে রুফটপ সোলার নীতি নিয়েছে, তার ফলে আগামী গ্রীষ্মে মানুষকে চলতি সময়ের মতো দুর্ভোগ পোহাতে হবে না বলে তাঁরা আশাবাদী। এ সময় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত নিয়ে সংসদ সদস্যদের উদ্বেগকে স্বাভাবিক বলে মন্তব্য করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, জনগণের প্রতিনিধিদের প্রকৃত তথ্য জানানো এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত নিয়ে থাকা ভুল–বোঝাবুঝি দূর করার চেষ্টা করা হবে।