দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট গভীর হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষ ও শিল্পখাতের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার কারণে কাতার ও রাশিয়া থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি ব্যাহত হয়েছে। ইউরোপীয় দেশগুলো স্পট মার্কেট থেকে আগ্রাসীভাবে এলএনজি কিনছে, ফলে বাংলাদেশের মতো দেশগুলো প্রয়োজনমতো গ্যাস কিনতে পারছে না। সরকার পরীক্ষিত নয় এমন কিছু সরবরাহকারীর সঙ্গে চুক্তি করলেও তারা সময়মতো গ্যাস পৌঁছাতে পারছে না। এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি খাতে দ্রুত ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপরই নির্ভর করছে দেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতা।

শিল্পখাতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ অত্যন্ত জরুরি। এক ডলার ব্যয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ করলে তা অর্থনীতিতে ৩০ ডলারের সমপরিমাণ মূল্য যোগ করে। সংকট মোকাবিলায় অব্যবহৃত তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা কাজে লাগানো একটি কার্যকর পথ। বর্তমানে এসব কেন্দ্রের প্রায় ৬০ শতাংশ সক্ষমতা অব্যবহৃত থাকলেও সরকার চুক্তি অনুযায়ী ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দিয়ে আসছে। এই অব্যবহৃত সক্ষমতা কাজে লাগালে তাৎক্ষণিকভাবে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব। তেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়ে গ্যাসভিত্তিক কিছু কেন্দ্র বন্ধ রাখলে সেই গ্যাস শিল্পকারখানায় সরবরাহ করা যাবে। উদাহরণস্বরূপ, দেড় হাজার মেগাওয়াটের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করলে প্রতিদিন প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সাশ্রয় হয়ে তা শিল্পে ব্যবহার করা সম্ভব।

তেলভিত্তিক কেন্দ্র চালু করলে সরকারি খরচ বাড়বে—এমন অভিযোগ থাকলেও নীতিগত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। বর্তমানে এলএনজির ওপর করভার হার মাত্র ২ শতাংশ, অন্যদিকে ফার্নেস তেলের ওপর তা ৩০ শতাংশের বেশি। ফার্নেস তেলের ওপর এই করভার কমিয়ে আনলে আমদানি খরচ ও বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ উভয়ই কমানো যাবে। আবহাওয়া অনুযায়ী আগামী নভেম্বর থেকে তাপমাত্রা কমবে এবং বিদ্যুতের চাহিদাও স্বাভাবিক হবে। তাই সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করে জনসাধারণের স্বস্তি ও শিল্পখাত রক্ষা করা জরুরি।

মধ্যমেয়াদে দেশীয় কয়লা উত্তোলন অপরিহার্য। দেশে বর্তমানে ৭ টিসিএফ (লাখ কোটি ঘনফুট) গ্যাস মজুত রয়েছে, যা প্রায় সাত বছর চলবে। কিন্তু উপলব্ধ কয়লা দিয়ে অনেক দীর্ঘ সময় ধরে শক্তি উৎপাদন সম্ভব। জ্বালানি সংকটে পুরো দেশ থমকে গেছে এমন পরিস্থিতিতে মাটির নিচে সম্পদ রেখে দেওয়া যুক্তিসঙ্গত নয়। দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তার ভিত্তি হওয়া উচিত দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান। সমুদ্রসহ দেশের অন্যান্য সম্ভাবনাময় এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধানে বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন।

দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ছোট আকারের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বা স্মল মডিউলার রিঅ্যাক্টর (এসএমআর) নিয়ে এখন থেকেই কাজ শুরু করা দরকার। এসএমআর ১০০, ২০০ বা ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। বড় কেন্দ্রগুলো ১ হাজার ৫০০ বা ২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করলেও তা বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছাতে দীর্ঘ সঞ্চালনব্যবস্থার প্রয়োজন হয়। এসএমআরের ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন অঞ্চলে ছোট কেন্দ্র স্থাপনের সুযোগ থাকবে। সিলেট বা চট্টগ্রামের মতো এলাকায় ছোট ক্ষমতার কেন্দ্র স্থাপন করলে ওই অঞ্চলের বিদ্যুতের চাহিদার একটি বড় অংশ স্থানীয়ভাবেই পূরণ করা সম্ভব হতে পারে। এসএমআর প্রযুক্তি এখনো বাণিজ্যিকভাবে পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত না হলেও আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে সহজলভ্য হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সৌরবিদ্যুতের ওপর জোর দেওয়া যেতে পারে, তবে শিল্পের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের উৎস হিসেবে এটি কার্যকর নয়। সৌরবিদ্যুতকে প্রচলিত জ্বালানির সরাসরি বিকল্প না দেখে সহায়ক উৎস হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। "সব মিলিয়ে আমার শেষ কথা হলো, জ্বালানি খাতে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন বাস্তবতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া।" বলেন বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কে এম রেজাউল হাসনাত।