প্রায় এক দশক পর অনুষ্ঠেয় বিএনপির সপ্তম জাতীয় কাউন্সিলকে ঘিরে দলের অভ্যন্তরে নেতৃত্ব পরিবর্তনের জল্পনা তুঙ্গে। বিশেষ করে মহাসচিব পদে কে বসছেন, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। গতকাল ১ সেপ্টেম্বর দলটির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনের মধ্যেও এই আলোচনা ছিল চূড়ান্ত।

খালেদা জিয়ার প্রয়াণের পর এটি ছিল বিএনপির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। প্রায় দুই দশক পর রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে দলটি এদিন আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে। তবে পাঁচ দিনের কর্মসূচির চেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে সপ্তম জাতীয় কাউন্সিলকে ঘিরে। সর্বশেষ ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল হয়েছিল। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি তিন বছরে কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তা সম্ভব হয়নি। ক্ষমতায় ফেরার পর কাউন্সিলের বিষয়টি আবার সামনে আসে। বিদায়ী মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একাধিকবার বলেছিলেন, খুব শিগগির কাউন্সিল হবে। ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীও বলেছেন, খুব তাড়াতাড়িই জাতীয় কাউন্সিল হবে, তবে দিন-তারিখ এখনো নির্দিষ্ট হয়নি।

কাউন্সিলের আগে তৃণমূল সংগঠন গুছিয়ে নিতে চায় বিএনপি। যেসব জেলায় আংশিক কমিটি রয়েছে, সেগুলো পূর্ণাঙ্গ করা হবে; মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিতে আহ্বায়ক কমিটি দেওয়া হবে; আর যেসব জেলায় আহ্বায়ক কমিটি রয়েছে, সেখানে কাউন্সিল করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। দলীয় সূত্র বলছে, চলতি বছরেই কাউন্সিল করার চিন্তা রয়েছে শীর্ষ নেতৃত্বের, তবে জেলা কমিটি পুনর্গঠন এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনের কারণে সময়সূচি এখনো অনিশ্চিত।

কাউন্সিলে গঠনতন্ত্র সংশোধনের প্রস্তাব উঠবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে বহুল আলোচিত 'সাত ধারা' নিয়ে আবারও আলোচনা হতে পারে। ২০১৬ সালের কাউন্সিলে এই ধারা বাদ দেওয়া হয়েছিল। পরে বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে বিতর্ক তৈরি হয়। ২০১৮ সালে খালেদা জিয়ার দুর্নীতি মামলার রায়ের আগে আওয়ামী লীগ এই পরিবর্তনের সমালোচনা করে। তখন মির্জা ফখরুল বলেছিলেন, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক মামলার কারণে ধারাটি বাদ দেওয়া হয়েছে। ধারাটি বহাল থাকলে দলে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো লোক খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ত বলেও যুক্তি দিয়েছিলেন তিনি।

কাউন্সিলের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় নতুন মহাসচিব নির্ধারণ। মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হওয়ার পর পদ ছেড়েছেন। এরপর রুহুল কবির রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করা হয়। এর আগেই তাঁকে স্থায়ী কমিটির সদস্য করা হয়েছিল। ফলে কাউন্সিলে রিজভীকেই পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব করা হবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা বেশি। তবে মহাসচিব পদে আরও কয়েকটি নাম আলোচনায় রয়েছে—স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন এবং যুগ্ম মহাসচিব ও পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। কাউন্সিলে তাঁদের মধ্য থেকে কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হবে, নাকি অন্য কেউ সামনে আসবেন, তা নিয়ে আগ্রহ রয়েছে।

কাউন্সিলের আগে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিবের শূন্য পদ পূরণ হতে পারে। এ পদে যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল ও শহীদ উদ্দীন চৌধুরীর পাশাপাশি ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রাকিবুল ইসলাম বকুলের নামও আলোচনায় রয়েছে। তবে এ বিষয়ে শীর্ষ নেতৃত্ব এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ইঙ্গিত দেয়নি।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি শেষে বিএনপির সামনে এখন দুটি বড় সাংগঠনিক কাজ—স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের নির্বাচনের প্রস্তুতি এবং সপ্তম জাতীয় কাউন্সিল আয়োজন। দলের শীর্ষ নেতাদের মতে, দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতার পর ক্ষমতায় এসে বিএনপির সামনে নতুন সাংগঠনিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। সরকার পরিচালনার পাশাপাশি দলকে সক্রিয় ও শক্তিশালী রাখতে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত পুনর্গঠন জরুরি। লন্ডনে থাকার সময় থেকেই তারেক রহমান দল পুনর্গঠনে জোর দিয়ে আসছিলেন। জাতীয় কাউন্সিল সামনে রেখে সেই প্রক্রিয়া আরও গতি পেতে পারে।

প্রায় এক দশক পর হতে যাওয়া এই কাউন্সিলেই নতুন মহাসচিবসহ দলের পরবর্তী সাংগঠনিক নেতৃত্বের কাঠামো নির্ধারিত হতে পারে। তাই কাউন্সিলের তারিখ ঘোষণার পাশাপাশি নেতৃত্বে কারা আসছেন, সেদিকেই এখন তাকিয়ে আছেন দলটির নেতা-কর্মীরা।