হরমুজ প্রণালি ঘিরে চলমান সংকটের কারণে কাতার এনার্জি এলএনজি সরবরাহে অনিবার্য পরিস্থিতি (ফোর্স ম্যাজিওর) ঘোষণা করেছে। এই ঘোষণার মেয়াদ প্রতি মাসে বাড়ানো হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতের মতো দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ইউরো নিউজের খবরে বলা হয়েছে, কাতার এনার্জি ইতালির জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এডিসনকে জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে নভেম্বরের শুরুর মধ্যে নির্ধারিত আরও পাঁচটি এলএনজি চালান তারা সরবরাহ করতে পারবে না। এর আগে এপ্রিল থেকে এ পর্যন্ত এডিসনের সঙ্গে চুক্তির আওতায় মোট ২৯টি চালান বাতিল হয়েছে। এসব চালানে প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনমিটার প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির কথা ছিল। এডিসন জানিয়েছে, এর মধ্যে ২১টি চালানের বিকল্প ব্যবস্থা তারা করেছে। এসব চালানে প্রায় ২০০ কোটি ঘনমিটার গ্যাস ছিল। ফলে গ্রাহকদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

মার্চে প্রথমবারের মতো হরমুজ প্রণালি কেন্দ্র করে কাতার এনার্জি অনিবার্য পরিস্থিতি ঘোষণা করে। এরপর পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে থাকলে প্রতি মাসে মেয়াদ বাড়ানো হয়। কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসির বিশেষজ্ঞ অ্যান-সোফি করবো বলেন, "রাজনৈতিক সমাধান না হলে এ পরিস্থিতি আরও কিছুদিন চলতে পারে।" তিনি আরও বলেন, "স্বাভাবিকভাবে এলএনজি রপ্তানি কবে শুরু হবে, সে বিষয়ে কাতার এনার্জি নিশ্চয়তা দিয়ে কিছু বলতে পারেনি। সে কারণে মাসে মাসে এমন অনিবার্য পরিস্থিতির মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে।" এ বিষয়ে ইউরো নিউজের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি কাতার এনার্জি।

সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক বাজারে কাতারের এলএনজির সরবরাহ প্রায় থেমে গেছে। আইসিআইএসের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম ৬ মাসে কাতার মাত্র ১৮টি এলএনজি চালান রপ্তানি করেছে। আগের বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৫০৯। এতে কাতারের গ্যাস বিক্রি থেকে আয় কমেছে প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার বা ২ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের মতো।

অন্য রপ্তানিকারকেরা অবশ্য ঘাটতির একাংশ পূরণ করছে। কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসির বিশেষজ্ঞ অ্যান-সোফি করবোর মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে এলএনজি সরবরাহ বেড়েছে। গত এক বছরে যেসব নতুন স্থাপনা থেকে উৎপাদন শুরু হয়েছে, সেগুলোও তাতে ভূমিকা রাখছে। নাইজেরিয়া ও মালয়েশিয়াতে এলএনজি উৎপাদন বেড়েছে। এভাবে উৎপাদন বৃদ্ধির পরও কাতার থেকে না পাওয়া এলএনজির ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ হচ্ছে না। এশিয়ার কিছু বাজারে গ্যাসের ব্যবহার কমেছে অথবা তারা অন্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকেছে। ইউরোপও স্পট মার্কেট থেকে উচ্চ দামে এলএনজি কেনার প্রতিযোগিতায় না গিয়ে মজুত করা গ্যাস বেশি ব্যবহার করছে।

অ্যান-সোফি করবো বলেন, "যে চালানগুলো পাওয়া যাচ্ছে, যাঁরা বেশি দাম দিতে পারেন, সেগুলো তাঁরাই পাচ্ছেন। এলএনজির দাম বেশি হওয়া সত্ত্বেও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু ক্রেতা বাজারে সক্রিয়।" তাঁর মতে, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এলএনজি সরবরাহ দীর্ঘ সময় ব্যাহত হতে পারে। এ সময় অন্য দেশগুলোয় এলএনজি উৎপাদন বাড়লেও ২০২৬ সালে বৈশ্বিক এলএনজি বাণিজ্যের পরিমাণ কমে যেতে পারে।

এ সংকটে সব আমদানিকারক দেশ একইভাবে আক্রান্ত হচ্ছে, তা নয়। এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের এলএনজি আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে। চীনের আমদানিও কমেছে। অ্যান-সোফি করবোর মতে, যেসব দেশে এলএনজির ওপর বেশি নির্ভরশীল এবং যাদের এলএনজি আমদানির বড় অংশ কাতার বা সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আসে, তারাই বেশি বিপাকে পড়বে। পর্যাপ্ত বিকল্প চালান নিশ্চিত করতে না পারলে ঝুঁকি আরও বেশি। বিশেষ করে স্বল্পমেয়াদি চুক্তির ওপর নির্ভরশীল ক্রেতারা বেশি চাপে আছে। তিনি মনে করেন, সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে আছে পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও ভারত। জাপান তুলনামূলকভাবে নিরাপদ। কেননা, এলএনজি আমদানিতে তারা কাতারের ওপর অতটা নির্ভরশীল নয়। তারা দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন উৎস থেকে সরবরাহ নিশ্চিত করেছে। এসব চুক্তির অর্থমূল্য যুক্তরাষ্ট্রের তেল ও গ্যাসের দামের সঙ্গে যুক্ত।

যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নাইজেরিয়ায় নতুন এলএনজি রপ্তানি অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে। এসব অবকাঠামো চালু হলে ধীরে ধীরে কাতারের বাইরে থেকে এলএনজির সরবরাহ বাড়তে পারে। তবে বৈশ্বিক এলএনজি বাজারে সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য আগের মতো স্বস্তিদায়ক অবস্থায় ফিরতে ২০২৮ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

হরমুজ প্রণালি খুললেই কি সমাধান? ইরান যুদ্ধের আগে বৈশ্বিক এলএনজি বাণিজ্যের পাঁচ ভাগের প্রায় এক ভাগ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন হতো। কিছু তেলবাহী জাহাজ এখনো এই জলপথ ব্যবহার করছে। তবে এলএনজি পরিবহনে জাহাজের সংখ্যা তুলনামূলক কম। এগুলো বিশেষায়িত। ফলে দ্রুত বিকল্প জাহাজ পাওয়া কঠিন। কাতারের গ্যাস রপ্তানির বিকল্প পথও তেমন একটা নেই বললেই চলে। ক্ষতিগ্রস্ত না হওয়া কাতার এনার্জির ১২টি এলএনজি উৎপাদন ইউনিট থেকে উৎপাদন পুনরায় শুরু করতে প্রায় দুই মাস সময় লাগতে পারে। কাতার এনার্জি জানিয়েছে, রাস লাফান এলাকায় যে হামলা হয়েছে, তাতে ক্ষতিগ্রস্ত আরও দুটি উৎপাদন ইউনিট মেরামত করতে তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার পর সীমিত পরিসরে আবার এলএনজি পরিবহন শুরু হয়েছিল। তবে তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। নতুন করে হামলার কারণে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি আবার বেড়ে যায়।