নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হামের উপসর্গ নিয়ে রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় চিকিৎসার খরচ জোগাড় করতে অভিভাবকরা হিমশিম খাচ্ছেন। উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে সন্তানদের চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছেন অনেক পরিবার। এতে স্থানীয় মানুষের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী এলাকার রোগীদের চাপে হাসপাতালটির অবকাঠামো ও ওষুধ সরবরাহ ব্যবস্থাও চরম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
চর বাগ্গা গ্রামের গৃহিণী কামরুন নাহার (২৮) চার সন্তানের চিকিৎসার জন্য একজনের কাছ থেকে ১ হাজারে প্রতি মাসে ১০০ টাকা সুদে ৮ হাজার টাকা ধার নিয়েছিলেন। কিন্তু সেই টাকা শেষ হওয়ার পর এখনো সন্তানদের সুস্থ হওয়ার লক্ষণ দেখা যায়নি। তার ছেলে মো. আসাদ (৬) এবং মেয়ে ফাতেমা আক্তার (৮), বিবি জান্নাত (৩) ও ইলিয়াস (১)-এর সবাই হামের উপসর্গে আক্রান্ত। গত শনিবার তিন সন্তানকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হলেও তাদের খাওয়াদাওয়া বন্ধ রয়েছে। কামরুন জানান, তাঁর স্বামী শামছুল হক ইটভাটায় কাজ করতেন, তবে বর্তমানে ভাটায় ইট পোড়ানো বন্ধ থাকায় আয়রোজগার নেই। তাছাড়া স্বামী প্রায় সময় বুকে ব্যথায় ভোগেন বলে ঠিকমতো কাজে যেতে পারেন না। টানাটানির সংসারে চার সন্তানই একে একে হামে আক্রান্ত হওয়ায় তিনি চোখেমুখে অন্ধকার দেখছেন। হাসপাতাল থেকে পর্যাপ্ত ওষুধ না পাওয়ায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাইরে থেকে কিনে আনতে হচ্ছে।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিসংখ্যানবিদ মো. মহিউদ্দিন জানান, পার্শ্ববর্তী হাতিয়া উপজেলার দুটি বড় ইউনিয়নের আক্রান্ত রোগীরাও চিকিৎসা নিতে এই কমপ্লেক্সে আসছেন। চলতি বছর এখানে হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১ হাজার ৪৪৯ জন ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ১ হাজার ৩৯০ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ১৬ জন ভর্তি হলেও গতকাল সোমবার সকালে ওই ওয়ার্ডে ৫৬ জন রোগী ছিলেন। তৃতীয় তলার একটি বড় ওয়ার্ড শুধু হামের রোগীদের জন্য বরাদ্দ করা হলেও বারান্দার মেঝেতেও গাদাগাদি করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
নোয়াখালী মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ও শিশুবিষয়ক চিকিৎসক মো. সোহেল সারওয়ার জানান, সরকারি হাসপাতালের সুযোগ-সুবিধার বাইরে হামের উপসর্গের একজন রোগীর পেছনে শুধু ওষুধ বাবদ সাত থেকে আট হাজার টাকা খরচ হতে পারে। রোগীর সঙ্গে থাকা ব্যক্তির খরচসহ সব মিলিয়ে ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়, যা চরাঞ্চলের মানুষের জন্য অনেক বেশি।
রোগীদের স্বজনরা হাসপাতালের ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি দেখিয়েছেন। আবদুর রহিম নামের এক অভিভাবক বলেন, পর্যাপ্তসংখ্যক নার্স ও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক চিকিৎসক থাকলেও হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া রোগীদের যেভাবে মেঝেতে নোংরা পরিবেশে রাখা হয়েছে, তাতে সুস্থ হওয়ার পরিবর্তে আরও অসুস্থ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। হামের উপসর্গের পাশাপাশি শিশুদের বেশির ভাগই ডায়রিয়াসহ আরও নানা জটিলতায় আক্রান্ত। কিন্তু সে হিসেবে পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতার অভাব রয়েছে।
চিকিৎসক আবদুল্লা হিল রাকিব জানান, এখানে গ্রাম এলাকা, তাই সচেতনতার অভাবে একজন থেকে অন্যজনের মাঝে হাম ছড়িয়ে পড়ছে। একই পরিবারের একাধিক শিশু কিংবা বয়স্ক ব্যক্তি হামে আক্রান্ত হচ্ছেন। হাসপাতালে ভর্তি থাকা ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ রোগীই হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি আছে। তাঁরা নিজেদের সাধ্যমতো চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। এ কারণে চিকিৎসার সফলতার হার ভালো। এখন পর্যন্ত আল্লাহর রহমতে কোনো শিশু সুস্থ না হয়ে বাড়ি ফেরেনি এবং কোনো মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেনি।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান জানান, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ৫০ শয্যার হলেও প্রতিদিন গড়ে ১১০ থেকে ১২০ জন রোগী ভর্তি থাকে। কিন্তু ওষুধ বরাদ্দ পাওয়া যায় ৫০ জনের। এই পরিস্থিতিতে বাড়তি রোগীকে ওই ৫০ জনের ওষুধ ভাগ করে দিতে হয়। এতে অনেকেই অভিযোগ করেন, চাহিদা অনুযায়ী ওষুধ পান না। তবে হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সরা নিজেদের সর্বোচ্চটা দিয়ে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। যার দরুন হামে আক্রান্ত রোগীদের বেশির ভাগই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে।