দীর্ঘ দুই দশকের ব্যবধানে রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠিত এই দলটি আজ ৪৮ বছরে পদার্পণ করল। এবার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে এবং দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর এই প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপিত হচ্ছে, যা দলের ভেতরে ও বাইরে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছে।

চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এর মাধ্যমে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পর দলটি পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে আসে। এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী কেবল দলীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং দীর্ঘ বিরোধী রাজনীতির পর ক্ষমতায় এসে নিজেদের রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নের সক্ষমতা প্রদর্শনের একটি বড় সুযোগ। একদিকে নেতাকর্মীদের বিজয়ের আনন্দ এবং অন্যদিকে রাষ্ট্র পরিচালনার কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়েই উদযাপিত হচ্ছে এই দিনটি।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপি পাঁচ দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচির কথা ঘোষণা করেছে। ১ সেপ্টেম্বর সকাল ৬টায় নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারাদেশের দলীয় কার্যালয়ে পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে কর্মসূচি শুরু হবে। সকাল ৯টায় বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং প্রয়াত চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাবেন।

আগামী ৫ সেপ্টেম্বর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে ‘বিএনপি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য’ শীর্ষক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন তারেক রহমান। এছাড়া সারাদেশের জেলা ও মহানগর ইউনিটগুলো সুবিধাজনক সময়ে আলোচনা সভা ও র‍্যালিসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবে। রাজনৈতিক কর্মসূচির পাশাপাশি বৃক্ষরোপণ ও মৎস্য অবমুক্তকরণের মতো সামাজিক উদ্যোগও রাখা হয়েছে।

দলের নেতাদের মতে, বিএনপির ৪৮ বছরের পথচলা ছিল সংগ্রাম, সংকট ও ত্যাগে পরিপূর্ণ। শহীদ জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দলটি দীর্ঘ সময় সরকার পরিচালনা করেছে এবং দীর্ঘ সময় বিরোধী দল হিসেবে রাজপথে লড়াই করেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতার বাইরে থাকাকালীন বিএনপির লক্ষ্য ছিল সরকারবিরোধী আন্দোলন এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবি জানানো। তবে এখন দৃশ্যপট বদলেছে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণ, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, প্রশাসনে শৃঙ্খলা আনা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করাই এখন সরকারের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে রাজপথের কৌশলের পাশাপাশি প্রশাসনিক দক্ষতা ও অর্থনৈতিক নীতি বাস্তবায়নের সমন্বয়ে দলকে পুনর্গঠন করাও একটি বড় পরীক্ষা।

বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের পর এখন তারেক রহমানের নেতৃত্বে দল ও সরকার পরিচালিত হচ্ছে। নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বে বিএনপি কীভাবে নিজেদের রাজনৈতিক দর্শন ও রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি বাস্তবায়ন করে, তা এখন দেশের রাজনীতির অন্যতম প্রধান আলোচনার বিষয়। এই কারণে এবারের কর্মসূচিতে রাজনৈতিক সমাবেশের চেয়ে আলোচনা সভা ও সামাজিক কাজের প্রাধান্য বেশি দেখা যাচ্ছে।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে মুক্তকণ্ঠকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘প্রায় দুই দশক পর বিএনপি জনগণের ভোটে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী তাই আমাদের জন্য আনন্দের পাশাপাশি আত্মমূল্যায়নেরও সময়। শহীদ জিয়াউর রহমানের আদর্শ ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি যে গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করেছে, সেই ধারাই আমরা এগিয়ে নিতে চাই। জনগণের প্রত্যাশা পূরণ এবং একটি গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলাই এখন আমাদের প্রধান অঙ্গীকার।’

বিএনপির ৪৮ বছরের সবচেয়ে বড় অর্জন সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘মানুষের আস্থা অর্জনই বিএনপির সবচেয়ে বড় অর্জন। বিএনপি যখনই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে, মানুষের মৌলিক সংকটগুলোকে গুরুত্ব দিয়েছে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, খাদ্যনিরাপত্তা, নারীর ক্ষমতায়ন ও সামাজিক উন্নয়নে কাজ করেছে।’

দলের প্রধান লক্ষ্য সম্পর্কে যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম আজাদ বলেন, ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ও বহুদলীয় গণতন্ত্র বিএনপির মূল আদর্শ। শহীদ জিয়া প্রণীত ১৯ দফা কর্মসূচি দলের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মূল ভিত্তি। জিয়াউর রহমানের আদর্শের ভিত্তিতে বাংলাদেশি পরিচয়কে প্রতিটি নাগরিকের মর্যাদার ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা, সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করাই বিএনপির প্রধান লক্ষ্য।’

দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থেকে কঠিন আন্দোলন মোকাবিলা করা দলটি এখন রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকে জনগণের প্রত্যাশা পূরণের পরীক্ষায়। এই দায়িত্ব তারা কতটা কার্যকরভাবে পালন করতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করবে আগামী দিনের রাজনীতিতে দলটির অবস্থান।