এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায় অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে নৈতিক অবক্ষয় ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। অনুষ্ঠানের পরদিন সকালে স্কুলের পিয়ন কাজল দেখেন গোটা প্রাঙ্গণ প্রস্রাব, বমি ও মলের গন্ধে ভরে গেছে। গত দুই দশকের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বর্তমান শিক্ষার্থীদের আচরণ ও সমাজের মানসিকতার পরিবর্তন তুলে ধরেছেন।
পিয়ন কাজল জানান, রাতের বেলায় সব বাদ্যযন্ত্র তালাবদ্ধ ঘরে রেখে তিনি ঘুমিয়েছিলেন। কিন্তু সকালে এসে দেখেন স্কুলের বিভিন্ন স্থানে প্রস্রাব ও বমি পড়ে আছে। এমনকি একটি নোংরা প্যান্টে মলও পাওয়া যায়। এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায় অনুষ্ঠান ছিল আজকের দিন। সকাল থেকেই তাকে গোটা স্কুল পরিষ্কার করতে হয়েছে। শরীরে চিনির মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় অল্প পরিশ্রমেই ক্লান্ত হয়ে পড়েন তিনি। এই সময় তার মনে আসে গত ২০ বছরের স্মৃতি। ২৪ বছর বয়সে যখন তিনি এই স্কুলে পিয়ন হিসেবে যোগ দেন, তখন শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা তাকে সম্মানের সাথে কথা বলত। ছাত্ররা তাকে ‘কাকা’ বা ‘ভাই’ বলে ডাকত এবং কোনো কষ্ট দেওয়ার চেষ্টা করত না।
তিনি বলেন, প্রতি বছর অনেক শিক্ষার্থী ভালো ফলাফল নিয়ে স্কুল ছাড়েন। পিন্টু দাস এখন মন্ত্রণালয়ের সচিব হলেও পিয়ন কাজলের সাথে দেখা হলে তাকে বড় ভাইয়ের মতো সম্মান জানান। ঈদের ছুটিতে বেড়াতে আসলে কোলাকুলি করেন এবং আন্তরিকভাবে খোঁখবর নেন। কাজল মনে করেন, পিন্টু দাসকে তিনি এখনো ছাত্রাবস্থার সেই সহপাঠী হিসেবেই দেখেন। তবে বর্তমান শিক্ষার্থীদের আচরণের সাথে এই ব্যাচের শিক্ষার্থীদের আচরণ মেলাতে পারছেন না। আগের ব্যাচের শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা, জ্ঞান, মেধা ও নৈতিকতা বর্তমান শিক্ষার্থীদের মধ্যে খুব কমই দেখা যায়।
বিদায় অনুষ্ঠানের রাতে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের রাত ১০টা পর্যন্ত স্কুলে থাকতে ও সাউন্ডবক্সের ভলিউম মাঝারি রাখতে অনুমতি দিয়েছিলেন। শিক্ষার্থীরা শুরুতে সব শর্তে সম্মতি জানালেও পরে তা অমান্য করা হয়। টিচার চলে যাওয়ার পর উচ্চ ভলিউমে সাউন্ডবক্স বাজানো শুরু হয়। বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পাশের বাড়ির বাসিন্দারা শব্দে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েন। রাত আটটার দিকে অভিযোগ পেয়ে বিদ্যালয়ের মোহাম্মদ স্যার বিষয়টি নিষেধ করতে আসেন। তবে শিক্ষার্থীরা তাদের বড় ভাইদের বিদায় অনুষ্ঠান জাঁকজমকপূর্ণ করার জন্য মঞ্চ সাজানো ও অনুশীলনের নাম করে রাতে থাকা জোর দেন।
এই সময় সেখানে উপস্থিত হন ফরিদ নামের এক স্থানীয় ব্যক্তি। সুজন নামের এক শিক্ষার্থী তাকে ‘বড় ভাই’ বলে ডেকে মোহাম্মদ স্যারের নিষেধের কথা জানান। ফরিদ ওই স্কুলেরই ছাত্র ছিলেন, ২০০৩ সালে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হননি। বর্তমানে এলাকায় তাকে নেতা হিসেবে চেনা যায়। তিনি কোনো চাকরি বা ব্যবসা না করে সরকারি দপ্তরে ঘুরে বেড়ান এবং সরকারি কর্তাদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখেন। এলাকাবাসী জানেন, তিনি সরকারি কিছু সেবা টাকার বিনিময়ে সুবিধাবাদীদের দেওয়ার সাথে জড়িত। ইদানীং তিনি থানার ওসি ও রাজনৈতিক দলের উপজেলা পর্যায়ের নেতাদের সাথে চলতে দেখা যায়। এলাকার মানুষ জানেন যে, ফরিদ এই এলাকায় মাদকের সরবরাহকারী। তার এই ওপেন সিক্রেট ব্যবসার কথা সবারই জানা। কিন্তু কেউ তার প্রতিবাদ করতে সাহস পায় না।
কাজল মনে করেন, গত ২০ বছরে এলাকার অভিভাবকদের মধ্যে পড়ালেখা শেষে চাকরি করার চেয়ে নেতার খাতায় নাম লেখানোর মানসিকতা গড়ে উঠেছে। অভিভাবকরা চান তাদের সন্তানরা নেতার মতো ভাব নিয়ে বড় হোক। শিক্ষার্থীরা ফরিদকে আদর্শ হিসেবে মানছে এবং তাকে ফোন করে নেশার জিনিস কিনে আনছে। অনেকের ক্ষেত্রে এটি নেশার জগতে প্রথম দিন হওয়ায় শারীরিক সমস্যাও হচ্ছে। কাজল বিশ্বাস করেন, অভিভাবকদের এই মানসিকতার অবক্ষয়ে দেশে দাস ও সন্ত্রাস তৈরি হবে। যারা পড়ালেখা করে চাকরি করবে, তারাও এদের দলে মিশে সুদ ও ঘুষ নিয়ে জীবনযাপন করবে।
মোহাম্মদ স্যারের নির্দেশে কাজল রাত ১০টায় সবকিছু তালাবদ্ধ করে চলে যান। তবে শিক্ষার্থীরা পরে বাজার থেকে আবার সাউন্ডবক্স ও নেশার জিনিস নিয়ে আসে। তারা একটি রোমাঞ্চকর রাত কাটানোর চেষ্টা করে এবং কাজলের কাজ আরও বাড়িয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত কাজল মোহাম্মদ স্যারকে সালাম দিয়ে নিজের কাজে মনোযোগ দেন।
(লেখক: মো. আইয়ুব আলী, এরিয়া ম্যানেজার, ব্র্যাক সমন্বিত উন্নয়ন কর্মসূচি। মূল নিবন্ধটি নাগরিক সংবাদে প্রকাশিত হয়েছিল।)