পৃথিবীতে অনেক মহান শিক্ষক আছেন, ছিলেন এবং থাকবেন, যাঁরা আমার বাবার চেয়েও হয়তো মহান। তথাপি আমি মনে করি, আমার বাবা মহান শিক্ষক, শ্রেষ্ঠতম!

আমার বাবা মো. আবদুল কাদের বিশ্বাস। পেশায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। পাশাপাশি ছিল পৈতৃকসূত্রে প্রাপ্ত যৎসামান্য জমিতে কৃষিকাজ। চাষাবাদ আর চাকরির সামান্য বেতনের টাকায় সংসার নামক জীবনযুদ্ধে তিনি ছিলেন একজন সাহসী সৈনিক, সঙ্গে ছিল সন্তানদের আদর্শ মানুষরূপে গড়ে তোলার প্রাণান্তকর চেষ্টা। শুধু নিজের সন্তান নয়, প্রতিটি ছাত্রকেই সোনালি স্বপ্নের জাল বুনতে শেখাতেন এই নিরহংকার মানুষটি।

.

বাংলাদেশের এক প্রত্যন্ত পল্লিগ্রাম ঝিনাইদহের শৈলকুপায় জন্ম নেওয়া হাজারো মানুষের মধ্যে আমার পিতা একজন। যেখানে শহরের বিজলি বাতি ছিল না; ছিল না ইটের রাস্তা, কোনো ভালো স্কুল। তবু তিনি স্বপ্ন দেখতেন সন্তানদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করার।

ছোট সন্তান হিসেবে আমার বাবার সঙ্গে বিশেষ সখ্য ছিল। কুষ্টিয়ায় আমার বাসায় যখন থাকতেন, নানা ব্যস্ততার মধ্যেও যখনই সময় হতো, আমি আর বাবা মিলে নানা রকম গল্প করতাম। পেতাম নানা রকম উপদেশ আর শুনতাম তাঁর জীবনযুদ্ধের কাহিনি। ছোটবেলা থেকে শিক্ষার প্রতি দারুণ অনুরাগী মানুষটি এসএসসি পাস করার আগেই শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত হন। তাঁর হাত দিয়েই তৈরি হয়েছে দু-দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ। নিজের হাতে টাকা তুলে ইট, বালু, খোয়া, রড, টিন কিনে নির্মাণ করেছেন দুটি স্কুলঘর। প্রতিটি খরচের হিসাব লিখে রেখে উত্তলিত টাকার বিপরীতে খরচকৃত অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দিয়েছেন তিনি। চাকরিরত স্কুলসমূহের সেই সময়কার রেজিস্ট্রেশনের জন্য তিনি বহুবার ধরনা দিয়েছেন শিক্ষা বোর্ডে।

.

মনে পড়ে আমার...

আমি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় বাবার সঙ্গে স্কুলে যাওয়ার পথে সারাক্ষণ আমাকে ইংরেজি, অঙ্ক শেখাতে শেখাতে তিনি নিয়ে যেতেন। তিন কিলোমিটার দূরের স্কুলের পথে বৈশ্বিক নানা আলোচনায় ঋদ্ধ হয়ে উঠত আমাদের কথোপকথন।

মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষক, এটার প্রমাণ দিয়েছেন তিনি বহুবার। চাকরিজীবনের শেষে তাঁর যৎসামান্য পেনশনের টাকা দিয়ে আপন-পর সবাইকে শিক্ষার জন্য সাহায্য করেছেন। তাঁর বহু ছাত্র দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত—বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক থেকে চিকিৎসক, প্রকৌশলী।

.

আজ আমার বাবা নেই। ২০১৪ সালে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।

আমার এই লেখা কোনো সাহিত্যচর্চা নয়, কোনো জীবনকথা নয়; শুধু পিতাহীন শোকার্ত এক সন্তানের পিতার প্রতি ভালোবাসার, কৃতজ্ঞতার মূর্ত প্রতীক।

*লেখক: মো. সাইফুজ্জামান, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, ওয়েস্টজোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি, বাংলাদেশ।

.
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: ns.prothomalo.com