ময়মনসিংহের ১৭ বছর বয়সী কিশোর শাহেদ শরীফ আহমেদ মায়ের মৃত্যুপরবর্তী সরকারি পাওনা টাকা তুলতে বাবাকে ঘুষ দিতে দেখে ক্ষুব্ধ হয়ে তৈরি করেছেন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘ঘুষ.সাইট’। গত ২১ আগস্ট চালু হওয়া সাইটটিতে প্রথম নয় দিনে জমা পড়েছে ৯ হাজার ৬৬৫টি অভিযোগ, যেখানে ঘুষ হিসেবে চাওয়া অর্থের পরিমাণ দেখানো হচ্ছে ৩২১ থেকে ৩৩২ কোটি টাকা। তবে উদ্যোক্তারা দাবি করছেন না যে সব অভিযোগই সত্য।
শাহেদের মা আমিনা খাতুন ময়মনসিংহ সদরের আজমতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। ২০২২ সালের ১৬ ডিসেম্বর অসুস্থতায় তার মৃত্যু হয়। চাকরির মেয়াদ ছিল ১৩ বছর। পরিবারের ভাষ্য, প্রভিডেন্ট ফান্ডে জমা ছিল প্রায় ৭ লাখ টাকা। সেই টাকা তুলতে ট্রেজারি অফিসে ১০ হাজার, জেলা শিক্ষা অফিসে ২০ হাজার এবং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে ৮ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে। মোট ৩৮ হাজার টাকা। বাবা শরীফুল ইসলাম শামীম সৌদি আরবের একটি ব্যাংকে চাকরি করতেন। স্ত্রীর মৃত্যুর পর এই ঘুষ দিতে বাধ্য হন তিনি। এখন বাকি ১০ লাখ টাকা পেতেও আবার ঘুষ দাবি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ। পরিবারের দাবি, কল্যাণ তহবিলের ২ লাখ এবং চাকরিরত অবস্থায় মৃত্যুর কারণে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে আরও ৮ লাখ টাকা পাওয়ার কথা। সেই ১০ লাখ টাকা পেতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কার্যালয়ের ব্যক্তিরা ১ লাখ টাকা দাবি করছেন এবং বলছেন, টাকা না দিলে ফাইল এগোবে না।
শাহেদ নিজেও পাসপোর্ট করতে গিয়ে ঘুষ দাবির সম্মুখীন হন। ও-লেভেল পরীক্ষায় অংশ নিতে পাসপোর্টের প্রয়োজন হলে ফাইল আটকে রাখা হয়। ১ হাজার ৫০০ টাকা দেওয়ার পর তিন ঘণ্টার মধ্যে কাজ এগিয়ে যায়। এরপর একটি ভারতীয় ওয়েবসাইট দেখে তিনি এমন প্ল্যাটফর্ম তৈরির ধারণা পান। নিজের কোডিং দক্ষতা দিয়ে দুই ঘণ্টায় সাইটের প্রাথমিক কাঠামো তৈরি করেন। পরে বন্ধু সাইফ কবিরের সহায়তায় ডোমেইন কেনা হয়। শাহেদ কারিগরি দিক সামলান, সাইফ দেখেন প্রচার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। অভিযোগ যাচাইয়ে চার সদস্যের মডারেশন দল রয়েছে। অভিযোগগুলো পর্যালোচনা ও স্ক্রিনিংয়ের পর ড্যাশবোর্ডে প্রকাশ করা হয়। আইনি ঝুঁকি কমাতে অভিযোগকারীর নাম-পরিচয় বা নির্দিষ্ট অভিযুক্তের পরিচয় প্রকাশ করা হয় না।
শাহেদ বলেন, ভবিষ্যতে আইনজীবী দল গঠন ও সরকারি সহযোগিতা পেলে তথ্য যাচাই ও প্রকাশের প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী হবে। তার ভাষ্য, উদ্দেশ্য কাউকে লক্ষ্যবস্তু করা নয়, বরং অনিয়মের সামগ্রিক চিত্র তৈরি করা। কোন দপ্তরে বেশি অভিযোগ, কোন সেবায় বেশি ঘুষ, কত অর্থ চাওয়া হচ্ছে—এসব বিশ্লেষণ করলে দুর্নীতির ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা শনাক্ত করা যাবে। তার প্রত্যাশা, একদিন সরকারি সেবা পেতে কাউকে আলাদা টাকা দিতে হবে না, তখন সাইটে অভিযোগের সংখ্যা শূন্যের দিকে নামবে।
সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনিকা পারভীন বলেন, ঘুষ দাবির বিষয়ে কেউ তাকে জানাননি। এমন ঘটনা ঘটলে তিনি ব্যবস্থা নেবেন এবং মৃত শিক্ষকের বকেয়া পাওনা দ্রুত পরিশোধের আশ্বাস দেন। অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মো. মজিবুর রহমান বলেন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে এলে তিনি সহযোগিতা করেন এবং দ্রুত স্বাক্ষর করেন।
ময়মনসিংহ মঞ্চের সমন্বয়কারী ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ১৭ বছর বয়সে শাহেদ তিক্ত অভিজ্ঞতাকে জনমুখী প্রযুক্তি উদ্যোগে পরিণত করেছে। তবে সাফল্য মাপা যাবে না শুধু অভিযোগের সংখ্যা বা টাকার অঙ্ক দিয়ে। অভিযোগ কতটা নির্ভরযোগ্য, তার ভিত্তিতে তদন্ত হয় কি না এবং নীতিনির্ধারকেরা ব্যবহার করেন কি না—সেটিই কার্যকারিতা নির্ধারণ করবে। সনাক ময়মনসিংহের সহসভাপতি শরীফুজ্জামান টিটু বলেন, ঘুষ শুধু আর্থিক ক্ষতি করে না, সরকারি সেবার প্রবাহও ব্যাহত করে। প্রযুক্তির মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ ইতিবাচক, সরকার চাইলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, তরুণদের উদ্যোগ পুলিশের নজরে এসেছে। কোনো অনিয়ম বা ঘুষের তথ্য পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হলে পুলিশ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। দুদকের সহকারী পরিচালক রাজু মো. সারওয়ার হোসেন বলেন, ভুক্তভোগী দুদকে অভিযোগ করতে পারেন। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনুমতি নিয়ে অনুসন্ধান শুরু হবে, আকস্মিক অভিযানও হতে পারে।