ইসলামের ইতিহাসে সাহাবিদের আত্মত্যাগের অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। তাদের মধ্যে অন্যতম উজ্জ্বল নাম খোবাইব ইবনে আদি (রা.)। বদর যুদ্ধে অংশ নিয়ে তিনি কুরাইশের কয়েকজন নেতাকে হত্যা করেছিলেন, ফলে কুরাইশরা তাঁর প্রতিশোধ নিতে মরিয়া হয়ে ওঠে।
হিজরির চতুর্থ বছরে আদল ও কারা গোত্রের কিছু লোক ইসলাম সম্পর্কে জানার আগ্রহ প্রকাশ করে এবং নবীজির কাছে শিক্ষক প্রেরণের অনুরোধ জানায়। নবীজি (সা.) তাদের অনুরোধে কয়েকজন সাহাবিকে পাঠান, যাদের মধ্যে খোবাইব (রা.)-ও ছিলেন। কিন্তু এটি ছিল একটি গভীর ষড়যন্ত্র। রাজি নামক স্থানে পৌঁছানোর পর বিশ্বাসঘাতকেরা হঠাৎ সাহাবিদের ওপর হামলা চালায়। কয়েকজন সাহাবি সেখানেই শাহাদত বরণ করেন, আর খোবাইব (রা.)-সহ কয়েকজনকে জীবিত বন্দী করা হয়। পরে তাদের মক্কার বাজারে বিক্রি করা হয়, যাতে বদরের নিহতদের স্বজনেরা প্রতিশোধ নিতে পারে।
বন্দী অবস্থায় খোবাইব (রা.)-কে পাহারা দেওয়া নারী একদিন দেখতে পান তাঁর হাতে তাজা আঙুরের থোকা। অথচ তখন মক্কায় আঙুরের মৌসুম ছিল না। এটি ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি মুজিজা। এতে তিনি বুঝতে পারেন, আল্লাহ তাঁর এই নেক বান্দাকে বিশেষ অনুগ্রহে রিজিক দান করছেন। বন্দী জীবনেও খোবাইব (রা.) ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল ছিলেন এবং তাঁর চরিত্র, ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর ভরসা দেখে পাহারাদাররাও মুগ্ধ হয়েছিলেন।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দিন উপস্থিত হলে খোবাইব (রা.) দুই রাকাত নামাজ আদায়ের অনুমতি চান। অনুমতি পেয়ে তিনি একাগ্রতার সঙ্গে নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে তিনি বলেন, ‘তোমরা যদি মনে না করতে যে আমি মৃত্যুভয়ে নামাজ দীর্ঘ করছি, তাহলে আমি আরও দীর্ঘ করতাম।’ এরপর কুরাইশ নেতারা তাঁকে মানসিকভাবে দুর্বল করার চেষ্টা করে বলে, ‘তুমি কী চাও, তোমার পরিবর্তে মুহাম্মদ আমাদের হাতে থাকবে আর তুমি নিরাপদে তোমার পরিবারের কাছে ফিরে যাবে?’ খোবাইব (রা.) দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দেন, ‘আল্লাহর শপথ, আমি এটাও চাই না যে আমি আমার পরিবারের মাঝে নিরাপদে থাকি আর রাসুলের পায়ে একটি কাঁটাও ফুটুক।’
শাহাদতের পূর্বমুহূর্তে তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করেন, নিজের সালাম যেন নবীজির কাছে পৌঁছে যায়। আল্লাহ-তাআলা তাঁর সালাম নবীজির কাছে পৌঁছে দেন। এরপর তিনি ধৈর্য ও আত্মসম্মানের সঙ্গে শাহাদত বরণ করেন। শত্রুরা তাঁর দেহকে হত্যা করতে পেরেছিল, কিন্তু তাঁর ইমানকে বিন্দুমাত্র নত করতে পারেনি।
খোবাইব ইবনে আদির (রা.) এই ঘটনা সব যুগের মুসলমানের জন্য অসংখ্য শিক্ষার উৎস। শিক্ষণীয় বিষয়গুলো হলো—
১. ইমানের দৃঢ়তা: সত্যিকারের মুমিন বিপদের সময়ও বিশ্বাস হারান না। মৃত্যুর মুখেও তিনি আল্লাহর ওপর আস্থা রেখেছিলেন।
২. নবীপ্রেম ইমানের অপরিহার্য অংশ: নবীজির প্রতি তাঁর ভালোবাসা শেখায়, নবীপ্রেম শুধু আবেগ নয়, এটি আনুগত্য ও আত্মত্যাগের নাম।
৩. ইবাদতের গুরুত্ব: জীবনের শেষ মুহূর্তেও তিনি নামাজকে প্রাধান্য দিয়েছেন। এটি প্রমাণ করে, মুমিনের জীবনে ইবাদতের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি।
৪. বিপদে ধৈর্য: বন্দিত্ব, অপমান কিংবা মৃত্যুর হুমকি কোনো কিছুই তাঁর ধৈর্যচ্যুতি ঘটাতে পারেনি। ধৈর্য মুমিনের উত্তম গুণ।
৫. দাওয়াতের পথে আত্মত্যাগ: ইসলামের দাওয়াত কখনো ত্যাগ ও কোরবানির মাধ্যমেও প্রতিষ্ঠিত হয়। খোবাইব (রা.) সেই শিক্ষাই দিয়ে গেছেন।
৬. পরকালকে প্রাধান্য দেওয়া: দুনিয়ার সাময়িক জীবন রক্ষার জন্য তিনি ইমান বিসর্জন দেননি। বরং চিরস্থায়ী সফলতার জন্য শাহাদাতকে বেছে নিয়েছিলেন।
(তথ্যসূত্র: সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪০৮৬)
ফয়জুল্লাহ রিয়াদ: মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, ঢাকা