কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলায় আকবরনগর ও মিরারচর গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে বাজারের নামকরণ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ আজ রোববার বিকেলে পুনরায় সহিংসতায় রূপ নেয়। দুই পক্ষের সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন এবং উভয় পক্ষের অন্তত ১২টি ঘর আগুনে পুড়ে গেছে।

এই সংঘর্ষের প্রভাবে ভৈরব-ময়মনসিংহ পথে প্রায় তিন ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে। চট্টগ্রাম থেকে জামালপুরগামী আন্তনগর বিজয় এক্সপ্রেস ভৈরব স্টেশনে প্রায় ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিট আটকে ছিল। অন্যদিকে, কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকাগামী আন্তনগর কিশোরগঞ্জ এক্সপ্রেস কুলিয়ারচর স্টেশনে আটকা পড়ায় হাজারো যাত্রী চরম দুর্ভোগের সম্মুখীন হন।

ভৈরব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহাবুবুর রহমান জানান, "সংঘর্ষ থামাতে পর্যাপ্তসংখ্যক পুলিশ পাঠানো হয়। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।"

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ভৈরব-ময়মনসিংহ আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে অবস্থিত আকবরনগর ও মিরারচর গ্রাম দুটিতে ১৯৯১ সাল থেকে একটি বাজার গড়ে ওঠে, যা দীর্ঘকাল ‘আকবরনগর-মিরারচর বাজার’ নামে পরিচিত ছিল। তবে ২০২৩ সালের জুলাইয়ে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের একটি সাইনবোর্ডে শুধু ‘আকবরনগর বাজার’ লেখা হলে মিরারচর গ্রামের বাসিন্দারা ক্ষুব্ধ হয়ে সাইনবোর্ড ভাঙচুর করেন। এর ফলে সৃষ্ট সংঘর্ষে শতাধিক মানুষ আহত হন। পরবর্তীতে গত ৭ জুলাই পুনরায় সংঘর্ষে মিরারচর গ্রামের মাসুদ মিয়া ও হিরণ মিয়া নিহত হন এবং শতাধিক ঘরবাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। এই ঘটনায় ভৈরব থানায় দুটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়, যেখানে আকবরনগর গ্রামের ৮৯ জন এজাহারভুক্ত এবং ১৩০ জন অজ্ঞাতনামা আসামি হন।

আজ রোববার ওই হত্যা মামলার আসামিরা কিশোরগঞ্জ আদালতে জামিনের আবেদন করলে আদালত তা নামঞ্জুর করে ৩৯ জনকে কারাগারে পাঠান। এই খবর এলাকায় পৌঁছানোর পর উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়দের দাবি, দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আকবরনগর গ্রামের লোকজন বাজারে মিরারচরের দুই ব্যক্তিকে মারধর করেন এবং পরে মাইকে সেই খবর প্রচার করা হয়। এর ফলে বেলা তিনটার দিকে দুই গ্রামের কয়েক শ মানুষ লাঠিসোঁটা নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন।

আহতদের মধ্যে চারজনকে ভৈরব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে এবং বাকিরা বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। আকবরনগর গ্রামের বাসিন্দাদের দাবি, আগের সংঘর্ষে তারা গৃহহীন হয়ে পড়েছেন এবং আজ আসামিদের জামিন না পেয়ে মিরারচরবাসীর উল্লাসে তারা ক্ষুব্ধ হয়ে এই ঘটনায় জড়ান। অন্যদিকে মিরারচরবাসীর দাবি, আদালতের সিদ্ধান্তে তাদের কোনো দায় নেই, বরং আকবরনগরের লোকজনই আক্রমণ শুরু করে।

ভৈরব রেলস্টেশনের স্টেশনমাস্টার ইউসুফ জানান, বিজয় এক্সপ্রেস বিকেল ৪টা ১০ মিনিটে স্টেশনে প্রবেশ করে। নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ট্রেনটি আটকে রাখা হয় এবং বিকেল ৫টা ৫০ মিনিটে গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। এতে ট্রেনটির ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিট বিলম্ব হয়।

ট্রেনের যাত্রী ব্যাংকার তমিজ উদ্দিন বলেন, "সমস্যা পাড়া কিংবা গ্রামের। কিন্তু এর প্রভাব পড়ে জাতীয় পর্যায়ে। কয়েক দিন পরপর ট্রেন ও বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও রেলপথ ঘণ্টার পর ঘণ্টা বন্ধ থাকছে। প্রচণ্ড গরমে যাত্রীদের অনেক কষ্ট হচ্ছে। এভাবে চলতে পারে না। ভৈরববাসী ও প্রশাসনকে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।"

ঘটনার খবর পেয়ে বেলা সাড়ে তিনটার দিকে ঘটনাস্থলে যান ভৈরব উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম। তিনি দুই পক্ষকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। আরিফুল ইসলাম বলেন, "ভৈরবের ইজ্জত আর রইল না। বাজারের নাম নিয়ে এত বিরোধ ভৈরব ছাড়া আর কোথাও আছে কি না জানা নেই। দুই গ্রামের সংঘর্ষের কারণে বারবার ট্রেন ও সড়কপথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। দেশবাসী আমাদের নিয়ে ট্রল করছে। এ আর হতে দেওয়া হবে না। এরপর যারা করবে সবাইকে থানায় নিয়ে বন্দী করে রাখা হবে। যথেষ্ট হয়েছে, আর ছাড় নেই।"