ক্যারিয়ারে বড় বড় শিরোপা জিতে অসংখ্যবার আবেগে ভেসেছেন রজার ফেদেরার। তবে এবার হাতে কোনো ট্রফি ছিল না। ছিল টেনিসে কাটানো দীর্ঘ পথের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। আন্তর্জাতিক টেনিস হল অব ফেমে জায়গা নিতে মঞ্চে উঠে কয়েকবার চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি সুইস কিংবদন্তি।

শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের রোড আইল্যান্ডের নিউপোর্টে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক টেনিস হল অব ফেমে অন্তর্ভুক্ত করা হয় ফেদেরারকে। ২০২৬ সালের শ্রেণিতে তার সঙ্গে জায়গা পেয়েছেন সাবেক খেলোয়াড়, ধারাভাষ্যকার ও সাংবাদিক মেরি ক্যারিলো।

মঞ্চে ফেদেরারকে পরিচয় করিয়ে দেন তার স্ত্রী ও সাবেক টেনিস খেলোয়াড় মিরকা। এরপর বক্তব্য দিতে এসে পরিবার, কোচ, চিকিৎসক, সতীর্থ ও দীর্ঘ ক্যারিয়ারে পাশে থাকা মানুষদের ধন্যবাদ জানাতে গিয়ে বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ৪৫ বছর বয়সী ফেদেরার।

তিনি বলেন, “এটি আমার জীবনের অন্যতম বড় সম্মান। জায়গাটির নাম হল অব ফেম, কিন্তু খ্যাতি কখনো আমার লক্ষ্য ছিল না।”

খ্যাতির বদলে ভালোবাসার কাজটি সারা জীবন করে যেতে চেয়েছিলেন ফেদেরার। এমন মানুষের সঙ্গে পথ চলতে চেয়েছিলেন, যারা খেলাটিকে তার মতোই ভালোবাসেন। তার কাছে টেনিস শুধু ম্যাচ খেলা কিংবা শিরোপা জেতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। নতুন কিছু তৈরি করা এবং খেলাটিকে নিজের মতো করে উপস্থাপন করাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

কোর্টে সেই বৈচিত্র্যের জন্যই আলাদা ছিলেন ফেদেরার। সার্ভ অ্যান্ড ভলি থেকে বেসলাইনের অনেক পেছনে দাঁড়িয়ে খেলা, মুহূর্তেই নেটে উঠে আসা কিংবা প্রতিপক্ষের সার্ভ ফেরাতে আচমকা সামনে চলে যাওয়া, সবই ছিল তার খেলায়। শেষের কৌশলটি পরে ‘স্নিক অ্যাটাক বাই রজার’ বা ‘এসএবিআর’ নামে পরিচিতি পায়।

বক্তব্যে নিজের পরিচিত হেডব্যান্ড নিয়েও রসিকতা করেন ফেদেরার। তার হিসাব অনুযায়ী, ক্যারিয়ারে পাঁচ হাজারের বেশি হেডব্যান্ড ব্যবহার করেছেন তিনি। প্রায় সব ম্যাচেই দুই জোড়া মোজা পরে কোর্টে নামার অভ্যাসও ছিল তার।

দুই দশকের বেশি সময়ের ক্যারিয়ারে ২০টি গ্র্যান্ড স্লাম জিতেছেন ফেদেরার। পুরুষ এককে রেকর্ড আটবার উইম্বলডন জয়ের পাশাপাশি ছয়টি অস্ট্রেলিয়ান ওপেন, পাঁচটি ইউএস ওপেন ও একটি ফ্রেঞ্চ ওপেন শিরোপা রয়েছে তার। বিশ্বের এক নম্বর খেলোয়াড় হিসেবে কাটিয়েছেন ৩১০ সপ্তাহ। সব মিলিয়ে জিতেছেন ১০৩টি এটিপি শিরোপা।

আন্দ্রে আগাসি, লেইটন হিউইট ও অ্যান্ডি রডিকের প্রজন্ম থেকে শুরু করে রাফায়েল নাদাল ও নোভাক জোকোভিচদের বিপক্ষে খেলেছেন ফেদেরার। ভিন্ন ভিন্ন প্রজন্মের এত খেলোয়াড়ের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারাকে নিজের বড় সৌভাগ্য বলে মনে করেন তিনি।

২০২২ সালের লেভার কাপে নাদালের সঙ্গে জুটি বেঁধে ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ খেলেছিলেন ফেদেরার। সেদিনও চোখের পানিতে বিদায় নিয়েছিলেন তিনি। চার বছর পর হল অব ফেমের মঞ্চে দাঁড়িয়েও মনে করিয়ে দিলেন, খেলোয়াড়জীবন শেষ হলেও টেনিসের সঙ্গে তার সম্পর্ক শেষ হয়নি।

নিজের নামের সঙ্গে সুইজারল্যান্ডও হল অব ফেমে প্রবেশ করছে বলে গর্ব প্রকাশ করেন ফেদেরার। বাসেলে ১৩ বছর বয়সে বলবয় হিসেবে টেনিসের বড় মঞ্চ কাছ থেকে দেখেছিলেন তিনি। সেখান থেকে বিশ্বের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হয়ে ওঠার দীর্ঘ যাত্রাটিও স্মরণ করেন।

নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের নিজেদের স্বকীয়তা ধরে রাখা, ঝুঁকি নেওয়া এবং প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে নতুন কিছু করার আহ্বান জানান ফেদেরার। সেই সঙ্গে পেশাদার টেনিস যত দ্রুতগতির ও বৈশ্বিক হয়ে উঠুক, খেলোয়াড়দের মধ্যকার বন্ধুত্ব যেন হারিয়ে না যায়, সেই প্রত্যাশাও জানান তিনি।

বক্তব্যের শেষ দিকে আবারও আবেগাপ্লুত হয়ে ফেদেরার বলেন, “আমি এখনো টেনিসের প্রতি আমার ভালোবাসার চিঠি লিখছি। খেলোয়াড় হিসেবে সময় শেষ, তবে এটি বিদায় নয়।”