আড়াই শতকের ইতিহাসে যুক্তরাষ্ট্র খুব কম সময়ই যুদ্ধের বাইরে ছিল। স্বাধীনতাযুদ্ধ থেকে শুরু করে গৃহযুদ্ধ, দুটি বিশ্বযুদ্ধ এবং কোরিয়া, ভিয়েতনাম, উপসাগরীয়, ইরাক, আফগান ও ইরান যুদ্ধ—প্রতিটি রক্তক্ষয়ী সংঘাত দেশটির রাজনীতি, অর্থনীতি ও বৈশ্বিক অবস্থান নতুনভাবে গড়ে দিয়েছে। তবে এর পেছনে দেশটিকে মূল্যও দিতে হয়েছে বিপুল। লাখো মানুষের প্রাণহানি, কোটি মানুষের বাস্তুচ্যুতি এবং ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের ব্যয়—সব মিলিয়ে এসব যুদ্ধের মানবিক ও অর্থনৈতিক মূল্য ছিল নজিরবিহীন।
.প্রতিটি রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের পেছনেই একটি গল্প থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের সেই গল্পের শুরু বন্দুকের গুলিতে। আড়াই শতাব্দী আগে ম্যাসাচুসেটসের লেক্সিংটনের একটি গ্রামীণ প্রান্তরে ব্রিটিশ সেনাদের মুখোমুখি হয়েছিলেন উপনিবেশগুলোর মিলিশিয়ারা (ব্রিটিশ শাসনাধীনে থাকা মার্কিন উপনিবেশগুলোর কৃষক, ব্যবসায়ী, কারিগর ও সাধারণ নাগরিক)।
এ সংঘর্ষের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র কখনো স্বাধীনতার জন্য, কখনো জাতীয় ঐক্য রক্ষায়, কখনো মতাদর্শের দ্বন্দ্বে, আবার কখনো বিদেশের মাটিতে আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় সামরিক অভিযানে জড়িয়েছে। প্রতিটি অভিযানই দেশটির ইতিহাসে নতুন মোড় এনে দিয়েছে—কোথাও রাষ্ট্রকে বদলে দিয়েছে, কোথাও রেখে গেছে গভীর ক্ষত।
এসব সামরিক অভিযান বা যুদ্ধের কোনোটি শেষ হয়েছে একতরফা বিজয়ে। কোনোটি গিয়ে থেমেছে অচলাবস্থায়, সেনা প্রত্যাহারে কিংবা এমন একটি শান্তিচুক্তিতে; যা কোনো পক্ষের প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ করতে পারেনি। তবে এসব যুদ্ধের একটি অভিন্ন মূল্য ছিল। তা হলো বিপুল প্রাণহানি, অসংখ্য আহত হওয়ার ঘটনা ও বেহিসাব ব্যয়।
এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা, মার্কিন জাতীয় আর্কাইভ, ব্রাউন ইউনিভার্সিটি কস্টস অব ওয়ার প্রজেক্টসহ বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য গবেষণা এবং ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানের তথ্যের ভিত্তিতে দুই পর্বের এ বিশেষ প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের জড়ানো যুদ্ধগুলোর সেই মানবিক ও অর্থনৈতিক মূল্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রথম পর্বে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতাযুদ্ধ থেকে কোরীয় যুদ্ধ। দ্বিতীয় পর্বে ভিয়েতনাম থেকে চলতি ইরান যুদ্ধ—সব মিলিয়ে আড়াই শতকের দীর্ঘ হিসাব।
.যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতাযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল এমন একটি গুলির মাধ্যমে, সেটি কে ছুড়েছিল, তা কখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। আড়াই শতাব্দী আগে ১৭৭৫ সালের ১৯ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের লেক্সিংটন ও কনকর্ডে ব্রিটিশ সেনা ও উপনিবেশগুলোর মিলিশিয়াদের মধ্যে গোলাগুলি শুরু হয়। এর মধ্য দিয়ে শুরু হয় দীর্ঘ ৮ বছরের যুদ্ধ।
ইতিহাস ও সাহিত্যে এ অজানা প্রথম গুলিটিকে ‘দ্য শট হার্ড রাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড’ (বিশ্ব কাঁপানো সেই গুলি) হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতাযুদ্ধের (আমেরিকান রেভোল্যুশনারি ওয়ার) সূচনা করেছিল এ গুলিই।
১৭৮৩ সালের ৩ সেপ্টেম্বর প্যারিস চুক্তি সইয়ের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে এ যুদ্ধের অবসান ঘটে। কর আরোপ ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিয়ে বিরোধ থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাত শেষ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতাযুদ্ধে রূপ নিয়েছিল। তবে ইতিহাসবিদদের মতে, যুদ্ধের প্রকৃত মূল্য সরকারি হিসাবের চেয়ে ছিল অনেক বেশি।
আমেরিকান ব্যাটলফিল্ড ট্রাস্টের হিসাবে, এ যুদ্ধে ৬ হাজার ৮০০ মার্কিন যোদ্ধা নিহত, ৬ হাজার ১০০ জন আহত ও ২০ হাজারের বেশি বন্দী হন। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের গোলাগুলি ছিল না মৃত্যুর প্রধান কারণ।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, রোগে মারা যান আরও অন্তত ১৭ হাজার মার্কিন। তাঁদের মধ্যে ৮ হাজার থেকে ১২ হাজার ছিলেন যুদ্ধবন্দী। নিউইয়র্ক বন্দরে নোঙর করা ব্রিটিশ জাহাজগুলোর (কারাগার) অস্বাস্থ্যকর ও নির্মম পরিবেশে তাঁদের মৃত্যু হয়।
.ইতিহাসবিদ মাইকেল প্যাট্রিক কালিনেনের মতে, ১৭৭৫ সালে ব্রিটিশ শাসনাধীন মার্কিন উপনিবেশগুলোর জনসংখ্যা ছিল মাত্র ২৫ লাখ। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতাযুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছিল এসব উপনিবেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১ শতাংশ। বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রে একই অনুপাতে মানুষ মারা গেলে সংখ্যাটি দাঁড়াত প্রায় ৩৫ লাখে।.
ইতিহাসবিদদেরও ধারণা, এই যুদ্ধে যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হওয়ার চেয়ে বন্দী অবস্থায় প্রাণ হারানো যোদ্ধার সংখ্যা ছিল বেশি।
অন্যদিকে ব্রিটিশ বাহিনীর প্রায় ২৪ হাজার নিয়মিত সেনা নিহত, আহত, বন্দী বা রোগে মারা যান। নিহত সেনাদের মধ্যে ছিলেন প্রায় ১ হাজার ২০০ হেসিয়ান (মূলত জার্মান ভাড়াটে সেনা) সেনা। রোগে মারা যান ৬ হাজার ৩৫৪ জন। যুদ্ধ শেষে আরও ৫ হাজার ৫০০ ভাড়াটে সেনা আর নিজ দেশে ফেরেননি। যে নতুন রাষ্ট্রকে দমন করতে তাঁদের ভাড়া করা হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সেখানেই থেকে যান তাঁরা।
যুদ্ধে প্রাণহানির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য হিসাব দিয়েছেন ইতিহাসবিদ হাওয়ার্ড এইচ পেকহ্যাম। ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘দ্য টোল অব ইনডিপেনডেন্স’ বইটি আজও এ বিষয়ে অন্যতম গ্রহণযোগ্য গবেষণা গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত। তাঁর হিসাবে, ৮ বছরে মোট ২৫ হাজার ৫৩৪ মার্কিন যোদ্ধার মৃত্যু হয়। এর মধ্যে মাত্র ২৭ শতাংশ নিহত হন যুদ্ধক্ষেত্রে। অন্যদের মৃত্যু হয় রোগে, অস্বাস্থ্যকর সেনাশিবিরে কিংবা জাহাজে।
ইতিহাসবিদ মাইকেল প্যাট্রিক কালিনেন বলেন, তখন ব্রিটিশ শাসনাধীন মার্কিন উপনিবেশগুলোর জনসংখ্যা ছিল মাত্র ২৫ লাখ। সেই হিসাবে যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছিল মোট জনসংখ্যার প্রায় ১ শতাংশ। বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রে একই অনুপাতে মানুষ মারা গেলে সংখ্যাটি দাঁড়াত প্রায় ৩৫ লাখে।
সংখ্যার বিচারে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী যুদ্ধগুলোর তুলনায় স্বাধীনতাযুদ্ধে প্রাণহানি কম ছিল। তবে মাত্র ২৫ লাখ জনসংখ্যার একটি নবীন রাষ্ট্রের জন্য ২৫ থেকে ৩০ হাজার মানুষের মৃত্যু ছিল এক বিরাট ক্ষতি। তাই জনসংখ্যার অনুপাতে যুদ্ধটি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী সংঘাতগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত।
.স্বাধীনতার যুদ্ধ যদি যুক্তরাষ্ট্রের জন্ম দেয়, গৃহযুদ্ধ দেশটিকে প্রায় ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছিল। ১৮৬১ সালের ১২ এপ্রিল ভোরের আগে সাউথ ক্যারোলাইনার চার্লসটন বন্দরের ফোর্ট সামটারে গোলাবর্ষণ শুরু করে কনফেডারেট বাহিনী। ৩৪ ঘণ্টার টানা হামলার পর আত্মসমর্পণ করে সেখানে অবস্থান নেওয়া ইউনিয়ন বাহিনীর ছোট গ্যারিসন।
এ ঘটনার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ভার্জিনিয়া, আরকানসাস, টেনেসি ও নর্থ ক্যারোলাইনা কনফেডারেসির সঙ্গে যোগ দেয়। কনফেডারেট বাহিনী হলো যুক্তরাষ্ট্রের গৃহযুদ্ধের (১৮৬১–১৮৬৫) সময় ইউনিয়ন (কেন্দ্রীয় সরকার) থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া দক্ষিণাঞ্চলীয় অঙ্গরাজ্যগুলোর যৌথ সামরিক বাহিনী।
যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন দাসপ্রথাপ্রধান ১১টি দক্ষিণাঞ্চলীয় অঙ্গরাজ্য (সাউথ ক্যারোলাইনা, মিসিসিপি, ফ্লোরিডা, আলাবামা, জর্জিয়া, লুইজিয়ানা, টেক্সাস, ভার্জিনিয়া, আরকানসাস, টেনেসি ও নর্থ ক্যারোলাইনা) ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে গিয়ে ‘কনফেডারেট স্টেটস অব আমেরিকা’ (কনফেডারেসি) নামে একটি পৃথক রাষ্ট্র গঠন করে। এ রাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীই হলো কনফেডারেট বাহিনী।
.অনেক দিক থেকেই মার্কিন ইতিহাসে এক নতুন ধরনের যুদ্ধ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের গৃহযুদ্ধ। প্রথমবার এ যুদ্ধে ব্যবহৃত হয় লৌহবর্মে মোড়া যুদ্ধজাহাজ। যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে ওঠে টেলিগ্রাফ ও রেলপথ। ব্যবহৃত হয় কার্যকর মেশিনগান ও শত্রুপক্ষের জাহাজ ডুবিয়ে দিতে সক্ষম সাবমেরিন। আবার এ যুদ্ধই প্রথম, যার বিভীষিকা সাধারণ মানুষ ক্যামেরায় তোলা ছবির মাধ্যমে খুব কাছ থেকে দেখতে পেরেছিল।.
দাসপ্রথা বজায় রাখা, পশ্চিমের অঙ্গরাজ্যগুলোতে এ প্রথার বিস্তার ও অঙ্গরাজ্যগুলোর স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে এ বাহিনী প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে।
অনেক দিক থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এক নতুন ধরনের যুদ্ধ ছিল এটি। প্রথমবারের মতো যুদ্ধে ব্যবহৃত হয় লৌহবর্মে মোড়া যুদ্ধজাহাজ। যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে ওঠে টেলিগ্রাফ ও রেলপথ। ব্যবহৃত হয় কার্যকর মেশিনগান ও শত্রুপক্ষের জাহাজ ডুবিয়ে দিতে সক্ষম সাবমেরিন। আবার এ যুদ্ধই প্রথম, যার বিভীষিকা সাধারণ মানুষ ক্যামেরায় তোলা ছবির মাধ্যমে খুব কাছ থেকে দেখতে পেরেছিল।
এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে ইতিহাসের গ্রন্থে এ যুদ্ধে মৃতের সংখ্যা বলা হতো ৬ লাখ ২০ হাজার, যা সেই সময়ের মার্কিন জনসংখ্যার প্রায় ২ শতাংশ। আমেরিকান ব্যাটলফিল্ড ট্রাস্টের হিসাবে, বর্তমান জনসংখ্যার অনুপাতে এ ক্ষতি প্রায় ৬০ লাখ মানুষের মৃত্যুর সমান।
.কিন্তু পরে গবেষকেরা দেখেছেন, সেই হিসাব সম্ভবত প্রকৃত সংখ্যার চেয়ে কম ছিল। উন্নত পরিসংখ্যানগত পদ্ধতি ব্যবহার করে ২০১০–এর দশকের শুরুতে এক জনসংখ্যাতাত্ত্বিক ইতিহাসবিদ নতুন হিসাব প্রকাশ করেন।
এ হিসাবে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৭ লাখ ৫২ হাজার। এমনকি প্রকৃত সংখ্যা ৮ লাখ ৫১ হাজার পর্যন্ত হতে পারে বলেও ওই ইতিহাসবিদ ধারণা দেন। পরে অধিকাংশ বড় ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান এ সংশোধিত হিসাব গ্রহণ করেছে। তবে ৬ লাখ ২০ হাজারের পুরোনো সংখ্যাটি এখনো জনস্মৃতি ও অনেক পুরোনো তথ্যসূত্রে রয়ে গেছে।
তবে নিহতের সংখ্যা ৬ লাখ ২০ হাজার ধরা হোক বা ৭ লাখ ৫২ হাজার—উপসংহার একই। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে প্রাণঘাতী যুদ্ধ। মার্কিন ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, কোরীয় যুদ্ধ ও ভিয়েতনাম যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মোট প্রাণহানির চেয়েও বেশি মানুষ মারা গিয়েছিলেন এ এক যুদ্ধেই।
অর্থনৈতিক ক্ষতিও ছিল সেই সময়ের জন্য অকল্পনীয়। ইউনিয়ন ও কনফেডারেসি—দুই পক্ষ মিলিয়ে যুদ্ধ পরিচালনায় ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৬ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
.তবে নিহতের সংখ্যা ৬ লাখ ২০ হাজার ধরা হোক বা ৭ লাখ ৫২ হাজার—উপসংহার একই। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এটিই (গৃহযুদ্ধ) ছিল সবচেয়ে প্রাণঘাতী যুদ্ধ। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, কোরীয় যুদ্ধ ও ভিয়েতনাম যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মোট প্রাণহানির চেয়েও বেশি মানুষ মারা গিয়েছিলেন এ এক যুদ্ধেই।.
তবে এ যুদ্ধের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার ছিল মানবিক বিপর্যয়। অসংখ্য সেনা আহত অবস্থায় বাড়ি ফিরেছিলেন। অনেকে সারা জীবনের জন্য পঙ্গুত্ববরণ করেন। আরও অনেকে এমন মানসিক আঘাত নিয়ে ফেরেন, যাকে আজ পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার নামে চিহ্নিত করা হয়।
ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিসের মতে, এই গৃহযুদ্ধের গুরুত্ব শুধু সামরিক বিজয় বা পরাজয়ে সীমাবদ্ধ ছিল না। এ যুদ্ধের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত মীমাংসা হয়েছিল একটি মৌলিক প্রশ্ন। আর তা হলো, ওই সময় রাজতন্ত্র ও সাম্রাজ্যবাদের আধিপত্যে থাকা বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের এ নবীন ও নাজুক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারবে কি না। একই সঙ্গে দাসপ্রথার ভবিষ্যৎও নির্ধারিত হয়।
যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের ঐক্য রক্ষার প্রশ্নে, তা–ই শেষ হয় স্বাধীনতার প্রশ্নে। প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের মুক্তি ঘোষণা ও পরে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী দেশটিতে দাসপ্রথার অবসানের পথ খুলে দেয়। অবশ্য যুদ্ধ-পরবর্তী দেশে পুনর্গঠন শুরু হলেও এই সংঘাতের গভীর ক্ষত পুরোপুরি শুকাতে আরও এক শতাব্দীর বেশি সময় লেগে যায়।
.প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যোগ দিয়েছিল বেশ দেরিতে। আর যুদ্ধ শেষে অন্য ইউরোপীয় শক্তিগুলোর তুলনায় তুলনামূলক কম ক্ষতি নিয়ে বেরিয়েও এসেছিল। যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে টেনে আনার তাৎক্ষণিক কারণ ছিল ‘জিমারম্যান টেলিগ্রাম’।
১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে জার্মানির পাঠানো একটি গোপন সাংকেতিক টেলিগ্রাম (জিমারম্যান টেলিগ্রাম) ব্রিটিশ গোয়েন্দারা ধরে ফেলেন। বার্তায় জার্মানি মেক্সিকোকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জোট গঠনের প্রস্তাব দেয়। বিনিময়ে যুদ্ধে জিতলে টেক্সাস, অ্যারিজোনা ও নিউ মেক্সিকো ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
একই সময় জার্মানি আটলান্টিক মহাসাগরে নির্বিচার সাবমেরিন হামলা শুরু করে। এতে মার্চ মাসে একের পর এক মার্কিন বাণিজ্যিক জাহাজ ডুবতে থাকে। দুটি ঘটনাই যুক্তরাষ্ট্রের জনমত দ্রুত যুদ্ধের পক্ষে নিয়ে যায়।
২ এপ্রিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন কংগ্রেসে বলেন, ‘বিশ্বকে গণতন্ত্রের জন্য নিরাপদ করে তুলতে হবে।’ চার দিন পর জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে কংগ্রেস।
এ বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪–১৯১৮) শেষ হওয়ার সময় পর্যন্ত দুই পক্ষ—মিত্রশক্তি ও কেন্দ্রীয় শক্তি মিলিয়ে প্রায় ৮৫ লাখ সেনা নিহত হন (নিহত সেনার সংখ্যা নিয়ে ঐতিহাসিক তথ্যে কিছুটা তফাত আছে)। তাঁদের মৃত্যু হয়েছে যুদ্ধক্ষেত্রে আঘাত ও নানা রোগে। প্রাণহানির সবচেয়ে বড় কারণ ছিল কামানের গোলা। এরপর ছোট আগ্নেয়াস্ত্র ও বিষাক্ত গ্যাস।
মিত্রশক্তির পক্ষে ছিল প্রধানত যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া (১৯১৭ পর্যন্ত), ইতালি (১৯১৫ থেকে), জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র (১৯১৭ থেকে)। কেন্দ্রীয় শক্তির পক্ষে ছিল প্রধানত জার্মানি, অস্ট্রিয়া–হাঙ্গেরি (অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্য), অটোমান সাম্রাজ্য ও বুলগেরিয়া।
.ইউরোপের ট্রেঞ্চ যুদ্ধের তুলনায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষয়ক্ষতি ছিল কম। যুদ্ধে অংশ নেওয়া ৪৭ লাখ মার্কিন সেনার মধ্যে ১ লাখ ১৬ হাজার ৫১৬ জন নিহত হন। আহত বা অসুস্থ হন আরও প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার।.
যুদ্ধের ভয়াবহতার মাত্রা বোঝাতে একটি তথ্যই উল্লেখযোগ্য। ১৯১৬ সালের ১ জুলাই সোমের যুদ্ধের প্রথম দিনই শুধু ব্রিটিশ বাহিনীর ৫৭ হাজার ৪৭০ জন সেনা হতাহত হন, যদিও এটি হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে যোগ দেওয়ার এক বছর আগে এবং সেখানে কোনো মার্কিন সেনা অংশ নেননি।
ইউরোপের ট্রেঞ্চ যুদ্ধের তুলনায় এ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষয়ক্ষতি ছিল কম। যুদ্ধে অংশ নেওয়া ৪৭ লাখ মার্কিন সেনার মধ্যে ১ লাখ ১৬ হাজার ৫১৬ জন নিহত হন। আহত বা অসুস্থ হন আরও প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার। প্রসঙ্গত, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সবচেয়ে বড় ও রক্তক্ষয়ী লড়াইগুলো হয়েছিল ইউরোপের ‘পশ্চিম রণাঙ্গনে’ (ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট)। সেখানে দুই পক্ষই হাজার হাজার মাইল দীর্ঘ পরিখা বা ট্রেঞ্চ খুঁড়ে অবস্থান নিয়েছিল। একে বলা হয় ট্রেঞ্চ যুদ্ধ।
তবে কম পরিচিত একটি তথ্য হলো, যুদ্ধক্ষেত্রের লড়াইয়ের চেয়ে রোগেই বেশি মার্কিন সেনার মৃত্যু হয়েছিল। সরাসরি যুদ্ধে নিহত হন ৫৩ হাজার ৪০২ জন, আর রোগে মারা যান ৬৩ হাজার ১১৪ জন। এর প্রধান কারণ ছিল ১৯১৮ সালের ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারি। যুদ্ধের শেষ তিন মাসে এ মহামারিতে যুক্তরাষ্ট্রের মোট সেনামৃত্যুর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ঘটে।
এ যুদ্ধের প্রভাব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ছিল না। যুদ্ধের পর জার্মানি, রাশিয়া, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি ও তুরস্ক—এ চার সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। একই সঙ্গে রাশিয়ায় বলশেভিক বিপ্লবের পথ তৈরি হয়। ইউরোপজুড়ে এমন এক রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়, যা দুই দশক পর আরও ভয়াবহ আরেকটি বিশ্বযুদ্ধের ভিত্তি গড়ে দেয়।
.যুক্তরাষ্ট্রের জন্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয় এক শান্ত রোববারের সকালে। ১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর সকাল ৮টার কিছু আগে শত শত জাপানি যুদ্ধবিমান হাওয়াইয়ের হনোলুলুর কাছে পার্ল হারবার নৌঘাঁটিতে আকস্মিক হামলা চালায়। হামলায় আটটি যুদ্ধজাহাজসহ যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২০টি নৌযান ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয় ৩০০টির বেশি বিমান। নিহত হন বেসামরিক নাগরিকসহ ২ হাজার ৪০০–এর বেশি মানুষ। আহত আরও প্রায় ১ হাজার।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল আর্কাইভস অবশ্য কিছুটা ভিন্নভাবে ক্ষয়ক্ষতির হিসাব তুলে ধরেছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, পার্ল হারবার হামলায় মোট হতাহতের সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৪৩৫। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১৮৮টি বিমান, ৮টি যুদ্ধজাহাজ, ৩টি হালকা ক্রুজার (বৃহৎ যুদ্ধজাহাজ) এবং আরও ৪টি নৌযান। তাই বিভিন্ন সূত্রে সংখ্যার কিছুটা পার্থক্য থাকলেও তথ্যগুলোর মধ্যে মৌলিক কোনো বিরোধ নেই। হামলার পরদিনই প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট কংগ্রেসের কাছে জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার আহ্বান জানান।
.যুক্তরাষ্ট্রের জন্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয় এক শান্ত রোববারের সকালে। ১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর সকাল ৮টার কিছু আগে শত শত জাপানি যুদ্ধবিমান হাওয়াইয়ের হনোলুলুর কাছে পার্ল হারবার নৌঘাঁটিতে আকস্মিক হামলা চালায়।.
এরপর শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ সামরিক সমাবেশ। যুদ্ধের আগে যেখানে মার্কিন সেনাবাহিনীর সদস্য ছিল ২ লাখের কম, যুদ্ধ চলাকালে সশস্ত্র বাহিনীর মোট সদস্যসংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ১০ লাখের বেশি। জাহাজ, যুদ্ধবিমান ও গোলাবারুদের চাহিদা মেটাতে লাখো বেসামরিক মানুষ যুদ্ধশিল্পে যোগ দেন। তাঁদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক নারীও ছিলেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারে এক বড় পরিবর্তনের সূচনা করে।
যুক্তরাষ্ট্র একই সময়ে ইউরোপীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দুই যুদ্ধক্ষেত্রে পূর্ণশক্তিতে অংশ নেয়। ১৯৪২-৪৩ সালে উত্তর আফ্রিকা ও ইতালিতে অভিযানের পর ১৯৪৪ সালের ৬ জুন ঐতিহাসিক ‘ডি-ডে’ অভিযানে মিত্রবাহিনী (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স এবং এগুলোর সহযোগী ৫০টির বেশি দেশ) ফ্রান্সের নরম্যান্ডিতে অবতরণ করে এবং জার্মানিকে পরাস্ত করতে এগিয়ে যায়। এদিকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অভিযানে মার্কিন বাহিনী গুয়াডালকানাল, তারাওয়া, ইও জিমা ও ওকিনাওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপগুলোতে তীব্র লড়াই চালিয়ে জাপানের মূল ভূখণ্ডের দিকে অগ্রসর হয়। উল্লেখ্য, এ বিশ্বযুদ্ধে মিত্রবাহিনীর বিপরীতে ছিল অক্ষশক্তির দেশগুলো (নাৎসি জার্মানি, জাপান, ইতালি এবং এগুলোর সহযোগী কয়েকটি দেশ)।
.১৯৪৫ সালের আগস্টে হিরোশিমা (৬ আগস্ট) ও নাগাসাকিতে (৯ আগস্ট) যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক বোমা ফেলার পর ১৫ আগস্ট জাপান আত্মসমর্পণ করে। ২ সেপ্টেম্বর এ আত্মসমর্পণ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হয় ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে।
.এরপর শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ সামরিক সমাবেশ। যুদ্ধের আগে যেখানে মার্কিন সেনাবাহিনীর সদস্য ছিল ২ লাখের কম, যুদ্ধ চলাকালে সশস্ত্র বাহিনীর মোট সদস্যসংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ১০ লাখের বেশি। জাহাজ, যুদ্ধবিমান ও গোলাবারুদের চাহিদা মেটাতে লাখো বেসামরিক মানুষ যুদ্ধশিল্পে যোগ দেন।.
যুদ্ধ শেষে যুক্তরাষ্ট্রের ৪ লাখের বেশি সেনাসদস্যের মৃত্যু হয়। আহত হন আরও প্রায় ৭ লাখ। তবে বৈশ্বিক পরিসরে এই সংখ্যা ছিল মোট প্রাণহানির একটি অংশমাত্র। যুদ্ধের সরাসরি কারণে বিশ্বজুড়ে ৫ কোটি থেকে ৫ কোটি ৬০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। দুর্ভিক্ষ, খাদ্যসংকট ও রোগে মৃত্যুর ঘটনা যোগ করলে সেই সংখ্যা দাঁড়ায় ৬ কোটি থেকে সাড়ে ৭ কোটি। অর্থাৎ ১৯৪০ সালের বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩ শতাংশ মানুষ এ যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছিলেন।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল যুদ্ধ। মূল্যস্ফীতির সমন্বয় করলে যুদ্ধটির ব্যয় ৪ ট্রিলিয়ন (৪ লাখ কোটি) মার্কিন ডলারের বেশি। ১৯৪৫ সালে শুধু সামরিক খাতেই ব্যয় হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশ।
এ যুদ্ধের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয়ের অঙ্কেও শুধু সীমাবদ্ধ ছিল না। পুরো দেশের অর্থনীতি, শিল্প ও জনশক্তিকে যুদ্ধের প্রয়োজনে সংগঠিত করতে হয়েছিল, যা এর আগে খুব কম সংঘাতেই দেখা গেছে। ১৯৪৫ সালের মধ্যে দেশটি বিশ্বের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়।
.জাপানের আত্মসমর্পণের মাত্র পাঁচ বছর পর আবার যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র। এবার যুদ্ধক্ষেত্র ইউরোপ নয়, কোরীয় উপদ্বীপ।
কোরীয় উপদ্বীপ সে সময় অনেক মার্কিন নাগরিকের কাছেই অপরিচিত ছিল। ১৯৫০ সালের ২৫ জুন প্রায় ৭৫ হাজার উত্তর কোরীয় সেনা ৩৮তম সমান্তরাল রেখা অতিক্রম করে দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রবেশ করেন। এ ঘটনাকে শীতল যুদ্ধের প্রথম প্রকৃত সামরিক সংঘর্ষ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। জুলাইয়ের মধ্যেই সিউলের পক্ষে যুদ্ধে যোগ দেয় যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের কাছে এটি ছিল আন্তর্জাতিক কমিউনিজমের বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াই।
উল্লেখ্য, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের পরাজয়ের পর যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন কোরীয় উপদ্বীপকে নিজেদের মধ্যে দখলের জন্য ৩৮ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশ রেখা বরাবর ভাগ করে নেয়—উত্তরে সোভিয়েত নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল (পরে উত্তর কোরিয়া) ও দক্ষিণে মার্কিন নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল (পরে দক্ষিণ কোরিয়া)।
যুদ্ধের পরিধি দ্রুতই বিস্তৃত হয়। এতে চীনও জড়িয়ে পড়ে। সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায়গুলোর একটি ছিল, ১৯৫০ সালের শেষ দিকে তীব্র শীতের মধ্যে চোসিন জলাধারের (উত্তর কোরিয়ার একটি কৃত্রিম হ্রদ) যুদ্ধ। চারদিক থেকে ঘেরাও হওয়া মার্কিন মেরিন সদস্যরা টানা ১৭ দিন চীনা সেনাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেন। পরে অবরোধ ভেঙে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। সে সময় কোথাও কোথাও তাপমাত্রা নেমেছিল মাইনাস ৩৫ ডিগ্রি ফারেনহাইটে। মার্কিন মেরিন কোরের ইতিহাসে ঘটনাটি এখনো অন্যতম কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হওয়ার উদাহরণ হিসেবে স্মরণ করা হয়।
.কোরীয় যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের সামনে যে সংঘাতগুলো আসে, সেগুলোর চরিত্র ছিল ভিন্ন। সংঘাতগুলো একেকটি যুদ্ধক্ষেত্র আর ইউরোপের সমতল ভূমি কিংবা কোরিয়ার পাহাড়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা ছড়িয়ে পড়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জঙ্গল এবং কয়েক দশক পর মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমিতেও।.
এ যুদ্ধে ঠিক কত মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন, সে বিষয়ে আজও গবেষকদের মধ্যে পুরোপুরি ঐকমত্য নেই। বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্র ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যা দিয়েছে।
এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার একটি পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, কোরীয় যুদ্ধে অন্তত ২৫ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। তাঁদের অর্ধেকের বেশি ছিলেন বেসামরিক নাগরিক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও ভিয়েতনাম যুদ্ধের তুলনায়ও এ যুদ্ধে বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর হার ছিল বেশি। অন্যদিকে হিস্ট্রি ডটকম মোট প্রাণহানির সংখ্যা প্রায় ৫০ লাখ বলে উল্লেখ করেছে। ব্রিটানিকারই যুদ্ধবিরতি-সংক্রান্ত আরেকটি নিবন্ধে আবার বেসামরিক নাগরিকসহ মোট প্রায় ৪০ লাখ লোকের হতাহতের কথা বলা হয়েছে।
.সংখ্যার এ পার্থক্যের অর্থ এই নয় যে তথ্যগুলো ভুল। বিভিন্ন গবেষণায় ভিন্ন ভিন্ন মানদণ্ডে হিসাব করা হয়েছে। কোথাও শুধু নিহত ব্যক্তিদের গণনা করা হয়েছে, কোথাও সব ধরনের হতাহত ব্যক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কোথাও উভয় পক্ষের বেসামরিক নাগরিকদেরও হিসাব ধরা হয়েছে, কোথাও তা নয়।
এ যুদ্ধে মার্কিন বাহিনীর প্রাণহানির হিসাব তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট হলেও সেখানেও কিছু পার্থক্য রয়েছে। হিস্ট্রি ডটকম বলছে, যুদ্ধে প্রায় ৪০ হাজার মার্কিন সেনা নিহত হন। ব্রিটানিকার হিসাবে সেই সংখ্যা ৩৭ হাজার। আর মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ সংখ্যা ৩৬ হাজার ৫৭৪। গবেষকদের মতে, যুদ্ধক্ষেত্র ও যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে মৃত্যুর পৃথক হিসাব, নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরে মৃত ঘোষণা করা এবং অন্যান্য কারিগরি কারণে এ পার্থক্য দেখা যায়।
যুক্তরাষ্ট্রে কোরীয় যুদ্ধকে দীর্ঘদিন ধরে ‘ভুলে যাওয়া যুদ্ধ’ (দ্য ফরগটেন ওয়ার) হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। তিন বছর ধরে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর ১৯৫৩ সালের ২৭ জুলাই একটি যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ হয়। কিন্তু দুই কোরিয়ার সীমানা সেই আগের মতোই ৩৮তম সমান্তরাল রেখায় রয়ে যায়। এ রেখা বরাবর গড়ে তোলা হয় দুই কিলোমিটার প্রশস্ত একটি নিরস্ত্রীকৃত অঞ্চল।
.যুদ্ধের পরিধি দ্রুতই বিস্তৃত হয়। এতে চীনও জড়িয়ে পড়ে। সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায়গুলোর একটি ছিল, ১৯৫০ সালের শেষ দিকে তীব্র শীতের মধ্যে চোসিন জলাধারের (উত্তর কোরিয়ার একটি কৃত্রিম হ্রদ) যুদ্ধ। চারদিক থেকে ঘেরাও হওয়া মার্কিন মেরিন সদস্যরা টানা ১৭ দিন চীনা সেনাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেন। পরে অবরোধ ভেঙে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন।.
সাত দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এ সীমারেখা এখনো উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়াকে আলাদা করে রেখেছে। আলোচিত অন্য সব যুদ্ধের বিপরীতে কোরীয় যুদ্ধের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এটি আজও আনুষ্ঠানিক শান্তিচুক্তির মাধ্যমে সম্পূর্ণ শেষ হয়নি।
কোরীয় যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের সামনে যে সংঘাতগুলো আসে, সেগুলোর চরিত্র ছিল ভিন্ন। সংঘাতগুলো একেকটি যুদ্ধক্ষেত্র আর ইউরোপের সমতল ভূমি কিংবা কোরিয়ার পাহাড়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা ছড়িয়ে পড়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জঙ্গল এবং কয়েক দশক পর মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমিতেও।
এ বিশেষ প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্বে থাকবে ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে শুরু করে আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের ২০ বছরের সামরিক আগ্রাসন ও চলমান ইরান যুদ্ধ এবং সামগ্রিকভাবে গত আড়াই শতকের মার্কিন যুদ্ধের মানবিক ও অর্থনৈতিক হিসাব–নিকাশ।
[তথ্যসূত্র: হিস্ট্রি ডটকম, কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস, ইউএস ন্যাশনাল আর্কাইভস, এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা, আল–জাজিরা, সিএনএন, এনবিসি নিউজসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও সংস্থার প্রতিবেদন এবং ঐতিহাসিক নথিপত্র]