প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে ১৮০ দিনের একটি কর্মপরিকল্পনা জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আমরা ধরে নিতে পারি যে মন্ত্রণালয়ের কাজকর্ম ও দক্ষতা মূল্যায়নের একটি সময়সীমা হিসেবে তিনি ছয় মাসকে একটি পর্যায় হিসেবে বিবেচনা করেছেন।
বিএনপি সরকার এরই মধ্যে ছয় মাস পার করেছে। মন্ত্রণালয় বা মন্ত্রীদের কাজকর্ম মূল্যায়নের ফলাফল বা প্রধানমন্ত্রী কীভাবে তা করেছেন বা আদৌ করছেন কি না, তা আমরা জানি না। তবে ছয় মাসের মাথায় আমরা মন্ত্রিসভায় রদবদল দেখলাম। বাস্তবে এটা যতটা না ‘রদবদল’, তার চেয়ে বেশি হচ্ছে মন্ত্রিসভার ‘সম্প্রসারণ’। চার নতুন মন্ত্রী ও দুই প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। একটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে পরিবর্তন আনা হয়েছে। একজন মন্ত্রীকে সরিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা করা হয়েছে।
এর মধ্য দিয়ে মন্ত্রিসভার আকার বড় হয়েছে। মন্ত্রিসভার সদস্য দাঁড়িয়েছে ৫১ জনে। এ ছাড়া মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারী আছেন আরও ১৩ জন। সব মিলিয়ে ৬৪ জন। বাংলাদেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় বৃহত্তম মন্ত্রিসভা। ২০০৮ সালের পর আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে মন্ত্রিসভার আয়তন একপর্যায়ে ৭০–এ পৌঁছেছিল।
.নতুন সরকারের ছয় মাসে কী পেল নাগরিক সমাজ.সরকারের ৬ মাস: সামনে অর্থনীতির কঠিন সমীকরণ.এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সরকারের ছয় মাসের মাথায় মন্ত্রিসভার রদবদল ও নতুন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী নিয়োগকে আমরা কীভাবে দেখব? প্রধানমন্ত্রী যেহেতু মন্ত্রণালয়গুলোর ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা চেয়েছিলেন, তাই এই সময়সীমা পার হওয়ার পর আমরা অনেকেই ধরে নিয়েছিলাম যে পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করে রদবদল ঘটবে। কিন্তু বাস্তবে যা ঘটেছে, তা হচ্ছে নতুন নিয়োগ। যে দুটি রদবদল হয়েছে, তা কোন বিবেচনায় বা পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে ঘটেছে কি না, সেটাও এক বড় প্রশ্ন।
আমরা দেখছি, বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীকে সরিয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ওই মন্ত্রীর অধীনে থাকা প্রতিমন্ত্রীকে পূর্ণ মন্ত্রী করা হয়েছে। এই পরিবর্তন কি দায়িত্ব পালনে মন্ত্রীর ব্যর্থতা বা প্রতিমন্ত্রীর সাফল্যের মূল্যায়ন? নাকি অন্য কোনো কারণে দায়িত্ব পুনর্বণ্টন? যদি পারফরম্যান্সের কারণে হয়ে থাকে, তাহলে কোন সূচকে আগের মন্ত্রীর পারফরম্যান্স কম ছিল? আর নতুন দায়িত্বে তাঁর যোগ্যতা কীভাবে বিবেচনা করা হলো?
তথ্য মন্ত্রণালয়ের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন। মন্ত্রীকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দিয়ে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা করা হয়েছে। এটিকে কি পদোন্নতি বলা হবে, নাকি মন্ত্রিত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া? যদি তাঁর পারফরম্যান্স ভালো হয়ে থাকে, তাহলে কেন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রাখা হলো না? আর যদি ভালো না হয়ে থাকে, তাহলে কেন তাঁকে একই মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা করা হলো?
.নতুন সরকার কোন তিনটি কাজে গুরুত্ব দেবে, তা মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে ঠিক করা হয়েছিল। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা। এই তিন ক্ষেত্রে সরকার যে সফল হতে পারেনি, তা স্পষ্ট।.
মন্ত্রিসভায় কে থাকবেন বা থাকবেন না, অথবা কে কোন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাবেন, তা প্রধানমন্ত্রীর সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে। আর মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন বা রদবদল তিনি কেন করেছেন, তার ব্যাখ্যা দেওয়ার বাধ্যবাধকতাও নেই। কিন্তু সরকারের তরফে যখন ছয় মাস পর পারফরম্যান্স মূল্যায়নের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, তখন জনগণ মন্ত্রিসভার রদবদলের সঙ্গে মূল্যায়নের বিষয়টি মিলিয়ে দেখতে চাইবেন। এখানে আমরা সরকারের সুনির্দিষ্ট কোনো বার্তা বা অবস্থান দেখতে পাইনি। ফলে একে নিছক মন্ত্রিসভার সম্প্রসারণ বা পুনর্বিন্যাস হিসেবেই বিবেচনা করতে হচ্ছে।
তবে মন্ত্রীরা কে কেমন করলেন, তা মাপার কাজটি সহজ নয়। একজন মন্ত্রী কতগুলো প্রকল্প অনুমোদন করলেন, কতগুলো সভা করলেন, কোথায় কোথায় গেলেন বা কী কী বললেন—শুধু এসব দিয়ে তাঁর সাফল্য মাপা যায় না। সরকার ও রাজনীতি বিজ্ঞানের গবেষণায় মন্ত্রীদের পারফরম্যান্স মূল্যায়নের নানা পথ ও পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা আছে। সাধারণভাবে কিছু দিক বিবেচনায় নিয়ে কাজটি করা হয়। যেমন লক্ষ্য অর্জনে মন্ত্রণালয়ের সাফল্য কতটুকু, কতটা দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং সিদ্ধান্তের মান কেমন, মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক দক্ষতা কোন পর্যায়ের, অর্থ ব্যবহারের দক্ষতা কেমন ও অনিয়মের কোনো অভিযোগ উঠেছে কি না, জনগণ মন্ত্রণালয়ের সেবায় সন্তুষ্ট কি না, সংসদে মন্ত্রী তাঁর কাজের ব্যাপারে ঠিকভাবে জবাবদিহি করতে পারছেন কি না—এসব দিক দেখা হয়।
.এসবের বাইরে গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি বিবেচনার বিষয় হলো কোনো মন্ত্রীর কর্মকাণ্ড, আচরণ বা বক্তব্যে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে কি না। কারণ, একজন মন্ত্রীর কোনো ভুল বা উল্টাপাল্টা কথাবার্তাকে শুধু ব্যক্তির ভুল হিসেবে দেখা হয় না, এর দায় সরকারের ওপর গিয়ে পড়ে। আসলে একজন মন্ত্রীর পারফরম্যান্স মূল্যায়ন শুধু ‘কাজ হওয়া বা না হওয়ার’ মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নেতৃত্বগুণ, জন–আস্থা তৈরি ও বিতর্ক সামাল দেওয়ার সক্ষমতাও এর সঙ্গে যুক্ত।
আমরা দেখেছি, গত ছয় মাসে কয়েকজন মন্ত্রীর কর্মকাণ্ড ও বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কিছু সিদ্ধান্ত ও বক্তব্য প্রত্যাহার করতে হয়েছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রীকেও হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে অনিয়ম ও দুর্নীতিমূলক স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে।
নতুন সরকার কোন তিনটি কাজে গুরুত্ব দেবে, তা মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে ঠিক করা হয়েছিল। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা। এই তিন ক্ষেত্রে সরকার যে সফল হতে পারেনি, তা স্পষ্ট। তবে ছয় মাস খুব দীর্ঘ সময় নয়। নতুন সরকারকে অনেক কিছু নতুন করে শুরু করতে হয়। প্রশাসনকে গুছিয়ে নিতে হয়। আগের সরকারের রেখে যাওয়া সমস্যারও সমাধান করতে হয়। ফলে ছয় মাসে সব প্রতিশ্রুতি পূরণ না হওয়াই স্বাভাবিক।
.সরকারের ছয় মাস: উচ্চশিক্ষায় যেসব পরিবর্তন প্রশ্ন ও সংশয় তৈরি করল.সংস্কারের চেতনা থেকে সরকার অনেকটা সরে এসেছে.কিন্তু সরকারের কাজের ধরন ও অভিমুখ বোঝার জন্য ছয় মাস যথেষ্ট সময়। এই সময়ে সরকার কোন জায়গায় ভালো করেছে, কোথায় অসফল হয়েছে, কোন মন্ত্রণালয় প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি—তার একটি হিসাব-নিকাশ জরুরি ছিল। মন্ত্রিসভা রদবদলের ক্ষেত্রে যদি তার প্রতিফলন ঘটত, তাহলে জনগণ সরকারের সদিচ্ছা ও সক্রিয়তার একটি প্রমাণ পেত। অবশ্য পত্র-পত্রিকার প্রতিবেদন বলছে, মন্ত্রিসভার এই পরিবর্তনই শেষ কথা নয়, সামনে আরও রদবদলের সম্ভাবনা আছে।
এত বড় মন্ত্রিসভা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এক মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টার ভূমিকা অনেক সময় সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব ঘটায়। সমন্বয়হীনতাও দেখা দেয়। সে কারণে ছোট, কার্যকর ও দক্ষ মন্ত্রিসভার পক্ষে মত দেন সরকার ও রাজনীতিবিজ্ঞানের বিশেষজ্ঞরা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনও মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী মিলিয়ে ৩৫ জনের মন্ত্রিসভার প্রস্তাব করেছিল।
.আমরা জানি যে রাজনৈতিক সরকারের নানা বিবেচনা থাকে। বিএনপি দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে ছিল। আওয়ামী শাসনে দলের অনেক নেতা অত্যাচার–নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। সরকারবিরোধী আন্দোলনে অনেকেই সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন, অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। এর প্রতিদান, পুরস্কার বা মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে গিয়েই সম্ভবত মন্ত্রিসভার আকার এত বড় হয়েছে। কিন্তু কার্যকরভাবে সরকার পরিচালনা ও দক্ষতার দিকটিই হওয়া উচিত সরকারের প্রথম বিবেচনা।
বড় মন্ত্রিসভার আরও চ্যালেঞ্জ হলো কার্যকরভাবে এত সংখ্যক মন্ত্রীকে পরিচালনা করা, কাজের তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়টি। তা ছাড়া দেখা যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী যে রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চা করছেন, মন্ত্রীদের সবাই তা যথাযথভাবে অনুসরণ করতে পারছেন না বা করছেন না। এখানে যে একটি ফারাক রয়ে গেছে, তা স্পষ্ট। সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় শুধু প্রধানমন্ত্রীর ভাবমূর্তিই শেষ কথা নয়। তিনি সরকার পরিচালনা করেন মন্ত্রিসভার মাধ্যমে, তাঁদের কাজের দায়ও প্রধানমন্ত্রীকেই নিতে হয়।
এ কে এম জাকারিয়া মুক্তকণ্ঠর উপসম্পাদক
মতামত লেখকের নিজস্ব