আমন মৌসুমে ধান রোপণ শেষ হয়ে এক মাস পেরিয়ে আসছে। এই সময়ে কৃষকদের উচিত ছিল নির্ধারিত সময়ে সার প্রয়োগ করে ফলন বাড়ানোর প্রস্তুতি নেওয়া। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বগুড়া, খুলনা, যশোর, রাজশাহী ও সন্দ্বীপসহ প্রধান ধানক্ষেত্রগুলোতে কৃষকরা এখন সারের দোকান ঘুরছেন। সরকারি রেটের চেয়ে বস্তাপ্রতি অতিরিক্ত টাকা দিতে রাজি হয়েও তাঁরা চাহিদামতো সার পাচ্ছেন না। কিছু ডিলারের গুদামে তালা ঝুললেও অন্য কোথাও সিন্ডিকেটের কারণে সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে এবারের আমন ফসল এবং ধান-চালের দাম নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

তথ্য বলছে, ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সার সরকারি মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। ৫০ কেজির বস্তায় ৫০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত দিতে হচ্ছে। এরপরও সার মেলে না। অথচ পাশের খুচরা বাজারে বা অসাধু চক্রের কাছে সেই সারই সহজে পাওয়া যাচ্ছে। মাঠপর্যায়ে কঠোর তদারকির অভাবে বরাদ্দকৃত সার কালোবাজারে পাচার হচ্ছে বলেই এটি স্পষ্ট।

প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের বক্তব্য ও মাঠের বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান প্রকট। স্থানীয় কর্মকর্তারা এক সুরে দাবি করছেন, ‘সারের পর্যাপ্ত মজুত আছে, কোনো সংকট নেই।’ ক্ষেত্রবিশেষে অভিযোগ উঠছে যে, কৃষকরা আতঙ্কিত হয়ে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সার কিনে মজুত করছেন। বছরের পর বছর ধরে সিন্ডিকেট ও মজুতদারি চালু থাকলেও সংকটের সময় এটি সুযোগ নেয় এবং ইচ্ছাকৃতভাবে সংকট তৈরি করে। কৃষকদের এই দায় চাপানো যুক্তিসঙ্গত নয়। স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে সার কৃষকের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। যদি নিয়মিত বিতরণ হতো, তবে ডিলারের গুদামঘর থেকে সার লুট করার ঘটনা ঘটত না।

সন্দ্বীপ ও বগুড়ার মতো এলাকায় আবাদি জমি ও চাহিদার তুলনায় সারের বরাদ্দ অপ্রতুল। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বার্ষিক ও মাসিক চাহিদা নিরূপণে ত্রুটি রয়েছে। আরও বড় সমস্যা হলো কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে লাভবন হওয়ার চেষ্টা। বিএডিসি বা বিসিআইসির অনুমোদিত ডিলারদের কাছ থেকে নির্ধারিত দামের সার খুচরা বিক্রেতার বদলে অসাধু ব্যবসায়ীদের হাতে চলে যাচ্ছে। বগুড়ার এক ডিলারের স্বীকারোক্তি থেকে এটি প্রমাণিত। প্রশাসনিক উদাসীনতা ও লোকদেখানো ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান এই শক্তিশালী সিন্ডিকেট ভাঙতে ব্যর্থ হচ্ছে।

চালের বাজার আগেই সিন্ডিকেটের দখলে। সারের চড়া দাম ও কৃত্রিম সংকটের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলে কৃষক শুধু নিঃস্বই হবেন না, ভবিষ্যতে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে। সরকার ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতি অনুরোধ, কাগজের হিসাবে মজুত দেখিয়ে দায় এড়ানো বন্ধ করুন। মাঠপর্যায়ে চাহিদা পুনরায় নিরূপণ করে অবিলম্বে ব্যবস্থা নিন। ডিলারদের মজুত ও বিতরণে ডিজিটাল নজরদারি জোরদার করে প্রতি বস্তা সারের হিসাব উন্মুক্ত রাখুন। অতিরিক্ত দাম নেওয়া ও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারী ডিলার ও বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা ও লাইসেন্স বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু করুন। অনিয়মের সঙ্গে জড়িত সরকারি কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না।