যশোরের কেশবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিত্রটি দেশের প্রান্তিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে খুব একটা ভিন্ন নয়। ৫০ শয্যার এই হাসপাতাল কেবল কেশবপুর নয়; খুলনা ও সাতক্ষীরার সীমান্তঘেঁষা একাধিক উপজেলার লাখ লাখ মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসাস্থল। অথচ দীর্ঘ দুই বছর ধরে অচল পড়ে আছে হাসপাতালের এক্স-রে যন্ত্রটি, সচল অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও চালকের দেখা নেই টানা চার বছর ধরে। এর সঙ্গে জুড়ছে ওষুধসংকট, চিকিৎসক ও কর্মচারীর শূন্য পদ এবং চরম নোংরা পরিবেশ। সব মিলিয়ে সেবা পাওয়ার আশায় আসা সাধারণ ও দরিদ্র রোগীদের ভাগ্যে জুটছে কেবল পদে পদে ভোগান্তি ও অতিরিক্ত অর্থের অপচয়।
রোগীদের দেওয়া সরকারি স্বাস্থ্যসেবার চিত্রটি কতটা ভঙ্গুর, তা পরিসংখ্যানেই পরিষ্কার। যেখানে প্রতিদিন বহির্বিভাগ গড়ে সাড়ে চার শ থেকে সাড়ে ছয় শ রোগী সেবা নিতে আসেন এবং শয্যাসংখ্যার প্রায় দ্বিগুণ রোগী অন্তর্বিভাগে ভর্তি থাকেন, সেখানে চিকিৎসকের ৪৩টি পদের মধ্যে ১৯টিই খালি। অর্থোপেডিক, কার্ডিওলজি, চর্ম কিংবা সার্জারির মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই। চার বছর ধরে চালক না থাকায় রোগীকে দ্বিগুণ ভাড়ায় বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সে জেলা সদরে বা খুলনায় নিতে হচ্ছে, যা জরুরি রোগীদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার শামিল। একইভাবে সরকারি এক্স-রে সুবিধা বন্ধ থাকায় দরিদ্র রোগীদের দ্বিগুণ খরচে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে হচ্ছে। এমনকি ৪ বছরের শিশু থেকে ৭০ বছরের বৃদ্ধা—ওষুধ না পেয়ে প্রেসক্রিপশন হাতে খালি হাতে বাড়ি ফিরছেন।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংকট সমাধানের আমলাতান্ত্রিক অজুহাত ও ‘প্রক্রিয়াধীন’ থাকার গৎবাঁধা ব্যাখ্যা বহু পুরোনো। অর্থবছর শেষ হওয়া কিংবা দরপত্র আহ্বানের প্রথাগত জটিলতায় কেন মাসের পর মাস গরিব রোগীর ওষুধ সরবরাহ বন্ধ থাকবে, তা বোধগম্য নয়। চালক কিংবা পরিচ্ছন্নতাকর্মীর মতো চতুর্থ শ্রেণির সামান্য কয়েকটি পদ বছরের পর বছর ফাঁকা রেখে একটি হাসপাতাল কীভাবে চালু রাখা সম্ভব, সে প্রশ্নও উঠে আসে। সরকারি স্বাস্থ্য খাতে বাজেট ও অবকাঠামো থাকলেও সদিচ্ছা, কার্যকর তদারকি এবং সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবেই প্রান্তিক মানুষ এই সেবাবঞ্চিত হচ্ছে।
হাসপাতালগুলোয় এমন দুরবস্থা চলতে থাকলে প্রান্তিক জনগণের সরকারি স্বাস্থ্যসেবার ওপর আস্থা একেবারেই হারিয়ে যাবে। শুধু ফাইল চালাচালি আর আশ্বাস না দিয়ে অবিলম্বে কেশবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জরুরি ভিত্তিতে শূন্য পদে চিকিৎসক ও অ্যাম্বুলেন্সচালক নিয়োগ দিতে হবে। চালু করতে হবে এক্স-রে যন্ত্র এবং নিশ্চিত করতে হবে প্রয়োজনীয় ওষুধের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ। প্রান্তিক মানুষের চিকিৎসাসেবা কোনো দয়াদাক্ষিণ্য নয়, এটি সংবিধানস্বীকৃত মৌলিক অধিকার—সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এ সত্য দ্রুত উপলব্ধি করতে হবে।