বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শিক্ষা ও গবেষণার প্রাণকেন্দ্রে রূপান্তরের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। উচ্চশিক্ষায় জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার প্রসার, শিক্ষার মানোন্নয়ন, কারিকুলাম সংস্কার, শিক্ষক–সংকট নিরসন, কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য নানামুখী সহায়তা কর্মসূচি গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, সুশিক্ষা নিশ্চিত করা, মেধাবী শিক্ষক নিয়োগসহ দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক, কর্মমুখী, উৎপাদনমুখী ও সময়োপযোগী করার লক্ষ্যে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণের কথা বলা হয়েছে।

সরকারের ঘোষিত কর্মসূচি ও উদ্যোগের একটি বড় অংশ এখনো পরিকল্পনা কিংবা বাস্তবায়নের প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও উচ্চশিক্ষা খাতে ইতিমধ্যে বেশ কিছু প্রশাসনিক পরিবর্তন এসেছে। দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্য ও সহ-উপাচার্যদের অব্যাহতি দিয়ে নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে সবাইকে অব্যাহতি দেওয়া হয়নি; কারও কারও ক্ষেত্রে পদোন্নতিও ঘটেছে। তাঁদের ক্ষেত্রে বিশেষ একাডেমিক যোগ্যতা বা প্রশাসনিক দক্ষতা বিবেচনা করা হয়েছে নাকি বিশেষ দলীয় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা কাজ করেছে—সে প্রশ্ন উঠেছে।

নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্য ও সহ-উপাচার্যদের মধ্যে এমন একাধিক শিক্ষক রয়েছেন, যাঁরা দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে সাময়িকভাবে অব্যাহতিপ্রাপ্ত এবং যাঁদের বিরুদ্ধে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে তদন্ত চলছে। এছাড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে ভাষা-সাহিত্য কিংবা বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষকদের উপাচার্যের দায়িত্ব দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ, ১৯৭৩ অনুযায়ী, উপাচার্যের পদ শূন্য হলে রাষ্ট্রপতি সাময়িকভাবে কাউকে দায়িত্ব দিতে পারেন। পূর্ণ মেয়াদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সিনেট নির্বাচিত তিন সদস্যের শিক্ষক প্যানেল থেকে নিয়োগ দেওয়ার বিধান থাকলেও সম্প্রতি নিয়ম বহির্ভূতভাবে চার বছরের জন্য পূর্ণ মেয়াদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনেও (ইউজিসি) পরিবর্তন এসেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রায় সবাইকে অব্যাহতি দিয়ে নতুন চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। চেয়ারম্যানসহ নতুন কমিশনের ছয় সদস্যের মধ্যে চারজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের, একজন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং একজন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। মেডিকেল ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে ইউজিসির সদস্য নিয়োগ সম্ভবত এবারই প্রথম।

তবে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত কয়েকজন সদস্যের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। দুজন সদস্য অধ্যাপক হিসেবে অপেক্ষাকৃত তরুণ, যার মধ্যে একজন মাত্র দুই মাস আগে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেয়েছেন এবং তাঁর কোনো উচ্চতর ডিগ্রি নেই। ইউজিসি অধ্যাদেশ, ১৯৭৩ অনুযায়ী, সদস্য নিয়োগের ক্ষেত্রে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন শিক্ষক কিংবা শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ খ্যাতি ও কৃতিত্ব অর্জনকারী ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রচলিতভাবে অভিজ্ঞ ও বয়োজ্যেষ্ঠ অধ্যাপক কিংবা সাবেক উপাচার্যরা এই দায়িত্ব পান। সেই বিবেচনায় তরুণ অধ্যাপকদের নিয়োগ কতটা নীতিসম্মত ও বিধিসংগত, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এছাড়া একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চারজনকে নিয়োগ না দিয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দিলে আঞ্চলিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা যেত, যা সরকারের একটি অগ্রাধিকার।

সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের নবীনবরণ বা একাডেমিক অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের উপস্থিতি লক্ষণীয় হয়ে উঠেছে। শিক্ষামন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, শিক্ষাসচিব, ইউজিসি চেয়ারম্যান, স্থানীয় সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারসহ বিভিন্ন দপ্তরের প্রধানদের উপস্থিতি অনুষ্ঠানের মর্যাদা বাড়ালেও একাডেমিক আয়োজনে এই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক উপস্থিতির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন ও একাডেমিক অগ্রাধিকারকে কেন্দ্র করেই পরিকল্পনা হওয়া উচিত।

বিশ্ববিদ্যালয় যেন রাজনীতির উন্মুক্ত মঞ্চে পরিণত না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। এমপি কিংবা শিক্ষকনেতাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য করা বা তাঁদের দিয়ে উদ্বোধনী ক্লাস নেওয়ার প্রবণতা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা বাড়াতে পারে।

পরিশেষে, উপাচার্য ও ইউজিসির সদস্য নিয়োগ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক উপস্থিতির ফলে উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। লেখক মনে করেন, "দেশের ছাত্র-জনতার হাজারো প্রাণের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা একটি সুন্দর ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার সুযোগ পেয়েছি। শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন ছাড়া সেই কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ বিনির্মাণ সম্ভব নয়। এই সুযোগ হেলায় হারানোর অবকাশ নেই—নইলে জাতি পিছিয়ে যাবে।"

শিক্ষা খাতে মেধা ও যোগ্যতার সঙ্গে আপস করে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন কিংবা শিক্ষাকে বিজ্ঞানমনস্ক, সৃজনশীল ও উৎপাদনমুখী করার উদ্যোগ সফল হবে না। রাজনৈতিক আনুগত্য যদি একাডেমিক যোগ্যতার ওপরে স্থান পায়, তবে শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক ও সময়োপযোগী করার স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।