ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার একাধিক দেশে যখন দক্ষিণপন্থীরা সরকার গঠন করছেন, তখন যুক্তরাষ্ট্রে বামপন্থীরা রাজনীতির নতুন কান্ডারি হয়ে উঠেছেন। গত বছর নিউইয়র্কে জোহরান মামদানির চমকপ্রদ বিজয়ের পর চারদিকে যেন সাজ সাজ রব। একদিকে প্রগতিশীলেরা বলছেন, ‘এবার আমাদের সময়’। অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও দক্ষিণপন্থীরা ১০ নম্বর বিপৎসংকেত জারি করে চিৎকার তুলেছেন, ‘গেল গেল, কমিউনিস্টরা ক্ষমতায় এল!’
আসল ব্যাপারটি অবশ্য নীল ও লালের এত সরল লড়াই নয়। সাম্প্রতিক সময়ে ডেমোক্রেটিক পার্টির বেশ কয়েকটি বাছাইপর্বের নির্বাচনে প্রগতিশীল হিসেবে পরিচিত ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকার (ডিএসএ) প্রার্থীরা প্রতিষ্ঠানপন্থীদের পরাস্ত করে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছেন, এ কথা ঠিক। কিন্তু তাঁদের বিজয় এসেছে মূলত শহুরে ও শিক্ষিত ভোটারদের সমর্থনে।
মিশিগানের আবদুল এল-সাইয়েদ প্রাক্নির্বাচনী জরিপে বিস্তর এগিয়ে থেকেও জিতেছেন মাত্র দেড় হাজার ভোটে। অন্যদিকে উইসকনসিনে ডিএসএর প্রার্থী ফ্রান্সেসকা হং জরিপে ১৫ শতাংশ পয়েন্টে এগিয়ে থাকলেও শেষ পর্যন্ত এক মধ্যপন্থী প্রার্থীর কাছে হেরে গেছেন।
.ফিলিস্তিন যেভাবে পশ্চিমের রাজনীতি চিরতরে বদলে দিয়েছে.ইসরায়েলের কট্টর সমালোচক এল-সাইয়েদকে হারাতে যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েলপন্থী লবি ও ডেমোক্রেটিক এস্টাবলিশমেন্ট প্রায় ৭৫ মিলিয়ন ডলার খরচ করেছে। নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে তাঁকে ঠেকাতে সেই লবি আরও বেশি অর্থ ব্যয় করবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।
অন্যদিকে উইসকনসিনে ডিএসএর প্রার্থী হং ধর্মীয় ছুটি বাতিলের পাশাপাশি সীমান্ত খুলে দেওয়া এবং পুলিশ ও কারাগার তুলে দেওয়ার মতো ‘র্যাডিক্যাল’ প্রস্তাব দিয়েছিলেন। প্রগতিশীলদের একাংশের কাছে সেগুলো গ্রহণযোগ্য হলেও সাধারণ ভোটারদের বিরক্তির কারণ হয়। ফলে তাঁকে হারতে হয়েছে।
তাই প্রশ্ন উঠেছে, বাছাইপর্বে দলের নিজস্ব সমর্থকদের ভোটে জিতলেও এল-সাইয়েদের মতো বামপন্থী প্রার্থীরা কি সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হতে পারবেন? তাঁরা কি আদৌ নির্বাচনযোগ্য, অর্থাৎ ‘ইলেকটেবল’?
এখানে ‘ইলেকটেবিলিটি’র পাশাপাশি প্রার্থীর নিজস্ব গুণাগুণও আলোচনায় এসেছে। মিশিগান ও উইসকনসিন—উভয় জায়গাতেই দেখা গেছে, প্রগতিশীল প্রার্থীরা শহুরে ভোটার, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শ্বেতাঙ্গ উদারপন্থীদের সমর্থন পেলেও নিম্ন আয়ের হিস্পানিক ও আফ্রিকান-আমেরিকান ভোটারদের পর্যাপ্ত সমর্থন পাননি।
.এই আপাতবৈপরীত্য সত্ত্বেও একটি বিষয়ে কোনো ভুল নেই: প্রগতিশীলদের আবির্ভাব মার্কিন রাজনীতিতে বড় ধরনের ঝাঁকুনি দিয়েছে। এ মুহূর্তে সিনেট ও কংগ্রেস থেকে শুরু করে সিটি কাউন্সিল পর্যন্ত সারা যুক্তরাষ্ট্রে জয়ী অথবা প্রায় নিশ্চিতভাবে জয়ী ডিএসএ প্রার্থীর সংখ্যা কমপক্ষে ৩৫। ডিএসএর বাইরে থাকা প্রগতিশীল প্রার্থীদের ধরলে সংখ্যাটি দ্বিগুণ।
বিষয়টি ডেমোক্রেটিক পার্টির কর্তাব্যক্তিদের জন্য প্রবল শিরঃপীড়ার কারণ হয়ে উঠেছে। কেন্দ্রীয় নেতাদের বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এবং তাঁদের নেতৃত্ব অস্বীকার করে প্রগতিশীলেরা পাল্টা প্রার্থী দিচ্ছেন, জয়ও ছিনিয়ে আনছেন। দলের পুরোনোপন্থী নেতারা বলছেন, বাছাইপর্বে জিতলেও সাধারণ নির্বাচনে তাঁদের জয় অসম্ভব। দলের নাম ব্যবহার করে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তাঁরা আসলে ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের জয়ই নিশ্চিত করবেন।
প্রগতিশীলদের ঠেকাতে ডেমোক্রেটিক-সমর্থিত ‘থার্ড ওয়ে’ নামে একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠী ইতিমধ্যে ১৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ের ঘোষণা দিয়েছে। অনেকেই তাই বলছেন, রিপাবলিকানদের ঠেকানোর বদলে ডেমোক্র্যাটরা নিজেদের মধ্যেই গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছেন।
.ডিএসএ আলাদা কোনো দল নয়; এটি ডেমোক্রেটিক পার্টির ভেতরের একটি উপদল। তাদের দাবি, দলের পুরোনো নেতৃত্ব সাধারণ মানুষের ‘পালস’ বুঝতে অক্ষম; তাঁরা এখনো করপোরেট লবির কাছে হাত-পা বাঁধা। ইসরায়েলপন্থী লবির বিরুদ্ধেও টুঁ শব্দটি করা তাঁদের অসাধ্য। এখন তাঁদের জায়গা ছেড়ে দেওয়ার সময় এসেছে।
ধনতন্ত্র ও সাম্রাজ্যবাদের সর্বোচ্চ স্তর হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্রে বামঘেঁষা রাজনীতির এই উত্থান কিছুটা বিস্ময়কর বৈকি। সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ৬০ শতাংশ মানুষ ‘সমাজতন্ত্রের’ সমর্থক। তবে সমাজতন্ত্র বলতে আমরা যা বুঝি, নবীন মার্কিন ভোটারদের ধারণা মোটেই তা নয়। তাঁরা বাজার অর্থনীতি বা উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার বিরোধী নন; তাঁদের আপত্তি খোলাবাজারের নামে গড়ে ওঠা বৈষম্যের পাহাড়ে। তাঁদের বক্তব্য, আমরা যখন শুধু টিকে থাকার লড়াইয়েই পিছিয়ে পড়ছি, তখন দেশের মোট সম্পদের ৩১ শতাংশ মাত্র ১ শতাংশ অতিধনীর হাতে। অর্থনীতি হোক বা রাজনীতি—সব প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নেন এই অতিধনীরাই। এ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অনৈতিক।
.যুক্তরাষ্ট্রে মামদানি-সাইয়েদ কি মধ্যপন্থীদের মনে ভয় ধরালেন.মার্কিন রাজনীতিতে ইসরায়েলবিরোধী শক্তির উত্থান.বর্তমান ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী তরুণ প্রজন্ম। ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার অব্যাহত বৈষম্য ও তার কারণ বুঝতে তাঁদের মার্ক্স বা লেনিন পড়ার প্রয়োজন নেই; নিজেদের অভিজ্ঞতাতেই তাঁরা তার বিস্তর প্রমাণ পেয়েছেন।
সম্প্রতি হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি ৩০ বছরের কম বয়সী তরুণ-তরুণীদের মধ্যে একটি জরিপ চালিয়েছে। এতে উঠে এসেছে কিছু কঠোর সত্য। তাঁদের ৪৫ শতাংশ বলেছেন, দৈনন্দিন খরচ জোগানোর সামর্থ্য তাঁদের নেই। তাঁদের মা-বাবার প্রজন্ম ১৫ থেকে ২০ বছরের মধ্যে বাড়ির মালিক হতে পারলেও তাঁদের কাছে সে স্বপ্ন এখন অবাস্তব। এই বয়সীদের ৪৯ শতাংশ এখনো মা-বাবার সঙ্গে একই বাড়িতে থাকেন; এক বা দুই প্রজন্ম আগে যে চিত্র ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। একসময় বলা হতো, উচ্চশিক্ষা পেলেই ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত। এখন অনেক তরুণ বলছেন, তাঁরা শিক্ষাঋণের ভারে ডুবে আছেন। প্রতি ১০ জনে ৬ জন মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ভুল পথে চলছে এবং বর্তমান ব্যবস্থায় তাঁদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।
নতুন প্রজন্মের নারী-পুরুষদের প্রশ্ন: বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশ যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের স্থান কোথায়?
যুক্তরাষ্ট্রের প্রগতিশীল রাজনীতির শীর্ষ নেতা বার্নি স্যান্ডার্স। তাঁর বয়স এখন ৮৪, কিন্তু নবীন প্রজন্মের গভীর অসন্তোষ ও ক্ষোভের কারণ তিনিই সবচেয়ে সঠিকভাবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর কথায়, যে রাজনৈতিক বন্দোবস্তে আমরা বাস করছি, তা কাঠামোগতভাবেই সাধারণ মানুষের স্বার্থের বিরুদ্ধে। একটি অবাস্তব ও অবৈধ যুদ্ধের জন্য আমরা বিপুল অর্থ ব্যয় করছি, অথচ মানুষের স্বাস্থ্যসেবার জন্য অর্থ নেই; শিক্ষাঋণ মওকুফে বা স্বল্পবিত্ত মানুষের আবাসনের জন্য ব্যয় বরাদ্দে প্রশাসন অনাগ্রহী। তরুণেরা এ ব্যবস্থা প্রত্যাখ্যান করলে তাঁদের কি দোষ দেওয়া যায়?
.সাধারণ মানুষ, বিশেষত তরুণদের এই ধূমায়িত ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচনে সাফল্য পেয়েছেন মামদানি। মেয়র হিসেবে তাঁর মাত্র ছয় মাস পেরিয়েছে; এরই মধ্যে অধিকতর সমতাপূর্ণ নাগরিক পরিষেবার যে প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছিলেন, তা ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করছেন। নিজেকে ‘সোশ্যালিস্ট’ বলতে তাঁর কোনো দ্বিধা নেই। তবে যাঁরা তাঁকে কমিউনিস্ট বলে গাল দেন, তাঁদের উদ্দেশে তাঁর বক্তব্য: আমার নামের আগে-পিছে যে লেবেল ইচ্ছা দিন। আসল প্রশ্ন হলো, আমি আমার দেওয়া প্রতিশ্রুতি রাখতে পারছি কি না।
মামদানির এ কথার সঙ্গে চীনা নেতা দেং শিয়াওপিংয়ের বিখ্যাত উক্তির মিল আছে: বিড়াল কালো না সাদা, সেটি বড় কথা নয়; আসল কথা সে ইঁদুর ধরতে পারে কি না।
দেখাই যাচ্ছে, লাল-নীল লেবেলের ঊর্ধ্বে উঠে মামদানি ইঁদুর ঠিকই ধরছেন। গত সপ্তাহের এক জনমত জরিপে নিউইয়র্ক শহরের ৬৯ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, তাঁরা মামদানির কাজে সন্তুষ্ট। একই সময়ে পরিচালিত জাতীয় জরিপে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাজে সন্তুষ্টি জানিয়েছেন মাত্র ৩৭ শতাংশ মানুষ।
যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ মামদানি ও তাঁর মতো প্রগতিশীল রাজনীতিকদের দিকে তাকিয়ে আছেন। কাজের ক্ষেত্রে তাঁদের সাফল্যই হবে ‘দেশ গেল’ বলে রিপাবলিকানদের প্রচারণার সেরা জবাব।
● হাসান ফেরদৌস প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক
* মতামত লেখকের নিজস্ব