বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জরাজীর্ণ ভবন, তীব্র চিকিৎসক সংকট এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি বন্ধ থাকায় রোগীদের চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। গণপূর্ত বিভাগ ঘোষিত একটি পরিত্যক্ত ভবনে জরুরি বিভাগসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হলেও ভবনের ফাটল ও ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে চিকিৎসক ও রোগীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। পাশাপাশি, অ্যানেস্থেশিয়া কনসালট্যান্টের অভাবে পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে জটিল অস্ত্রোপচার বন্ধ রয়েছে। প্যাথলজি বিভাগ ও নতুন ডিজিটাল এক্স-রে মেশিনও বিদ্যুৎ ও স্থান সংকটে চালু করা সম্ভব হচ্ছে না।
সরেজমিনে পরিদর্শনে দেখা যায়, হাসপাতালটির ইতিহাসে ১৯৭৬ সালে ৩১ শয্যা নিয়ে যাত্রা শুরু হলেও ২০০৫ সালে তা ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। বর্তমানে অনুমোদিত ৩৪টি চিকিৎসক পদের বিপরীতে মাত্র ১৪ জন কর্মরত আছেন, যার মধ্যে নিয়মিত উপস্থিত আছেন ১০ জন। ফলে ২০টি পদ শূন্য রয়েছে। বিশেষ করে অ্যানেস্থেশিয়া কনসালট্যান্টের অভাবে গত পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে কোনো জটিল অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হচ্ছে না। যদিও আধুনিক অপারেশন থিয়েটার রয়েছে, তবুও কেবল ছোটখাটো কাটা-ছেঁড়া বা ফোঁড়ার চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
প্যাথলজিস্টের পদ থাকলেও টেকনোলজিস্টের অভাবে দীর্ঘদিন ধরে প্যাথলজি বিভাগের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। ফলে রক্ত পরীক্ষা ও রোগ নির্ণয়ের জন্য রোগীদের বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে হচ্ছে। একইভাবে, ১৯৭২ সালের পুরোনো এক্স-রে মেশিন দিয়ে কাজ চালানো হলেও প্রায় নয় মাস আগে আগত নতুন ডিজিটাল এক্স-রে মেশিনটি বাক্সবন্দি পড়ে আছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, নতুন মেশিন চালু করতে প্রায় ৮০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন, অথচ হাসপাতালের সংযোগ মাত্র ২০ কিলোওয়াট। পল্লী বিদ্যুৎ ও স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে বারবার চিঠি দেওয়া হলেও এখনো কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।
চিকিৎসা নিতে আসা নাজমুল আহমেদ বলেন, "ডাক্তার কম থাকায় দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষাও এখানে হয় না। ভবনের অবস্থা খুবই খারাপ, পলেস্তারা খসে পড়ছে, ফাটল দেখা দিয়েছে। সবসময় ভয়ে থাকতে হয়। আমরা চাই সরকার দ্রুত ভবন সংস্কার করে পর্যাপ্ত ডাক্তার-নার্স নিয়োগ দিক।"
ভর্তি এক নারী রোগীর স্বজন মো. অয়ন বলেন, "ভবন পরিত্যক্ত হওয়ায় নারী-পুরুষ সবাইকে একই জায়গায় থাকতে হচ্ছে। শয্যাসংকটে বারান্দায় রাত কাটাতে হচ্ছে, যা নারীদের জন্য খুবই বিড়ম্বনার। ছাদে রড বের হয়ে আছে, পর্যাপ্ত ফ্যান ও বাথরুম নেই। যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।"
স্থানীয় বাসিন্দা সাগর মল্লিক বলেন, "উপজেলার মানুষের প্রধান ভরসা এই হাসপাতাল। কিন্তু এখানে এসে সেবা না পেয়ে বাধ্য হয়ে বাগেরহাট শহর বা বেসরকারি হাসপাতালে যেতে হচ্ছে। এতে টাকা ও সময় দুটোই নষ্ট হচ্ছে। দ্রুত এর সমাধান দরকার।"
হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স চালক শেখ আসাদুজ্জামান জানান, "ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সরকারি কোয়ার্টার ছেড়ে বাইরে থাকছি। এখনো কিছু কর্মচারী সেখানে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন। যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।"
মেডিকেল অফিসার ডা. মুশফিকুর রহমান তরফদার বলেন, "জীবনের ঝুঁকি নিয়েই পরিত্যক্ত ভবনে প্রতিদিন জরুরি, আন্তঃ ও বহির্বিভাগ মিলিয়ে ৩০০-এর বেশি রোগীকে সেবা দিতে হচ্ছে। ফাটল ধরা ভবনে ভূমিকম্প বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ঝুঁকি আরও বাড়ে। অ্যানেস্থেশিয়া কনসালট্যান্ট না থাকায় বড় অস্ত্রোপচারও বন্ধ রাখা হয়েছে।"
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হাসান মাহমুদ বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, "বিদ্যুৎ ও কক্ষের সংকটে নতুন ডিজিটাল এক্স-রে মেশিন চালু করা যাচ্ছে না। বিষয়টি পল্লী বিদ্যুৎ ও স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বারবার জানানো হয়েছে। আশা করছি দ্রুত সমাধান আসবে।"
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর ৬৭টি অনুমোদিত পদের বাইরে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ছয়জন কর্মরত থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ পদে জনবল সংকট কাটছে না। স্থানীয়রা দাবি করছেন, দ্রুততম সময়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অপসারণ করে নিরাপদ অবকাঠামো নির্মাণ, শূন্য পদে জনবল নিয়োগ এবং বন্ধ থাকা চিকিৎসাসেবা পুনরুদ্ধার করতে হবে; অন্যথায় সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা হারাবে।