জায়গাটির নাম বিজয়নগর। যশোর শহর থেকে সাত কিলোমিটার দূরে সদর উপজেলার কাশিমপুর ইউনিয়ন। এই ইউনিয়নের একটি জায়গা বিজয়নগর। গ্রামের পশ্চিম পাশ দিয়েই বয়ে চলেছে ভৈরব নদ। ভৈরব নদ থেকে পাকা সর্পিল সড়ক দিয়ে আনুমানিক ৩০০ মিটার এগোলেই দেখা মিলবে বিশাল একটি নিমগাছের। প্রায় ১২ শতাংশ সরকারি জমির ওপর চারদিকে ডালপালা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে অতিকায় এই প্রাচীন গাছটি।
নিমগাছটির বয়স নিয়ে এলাকার মানুষের মধ্যে নানা মত। কেউ বলেন এর বয়স দুই শ বছরের বেশি। কেউ আড়াই শ। আবার অনেকের মতে, গাছটির বয়স চার শ বছরের বেশি। তবে গাছটির বয়স নিয়ে যতই মতভিন্নতা থাকুক, গাছটি শতবর্ষী—এ নিয়ে কারও নেই। গাছটির পরিচয় তাই ‘শতবর্ষী নিমগাছ’।
.নিসর্গীদের মতে, নিম দীর্ঘ চিরহরিৎ বৃক্ষ। এর ইংরেজি নাম ‘মারগোসা ট্রি’; আর বৈজ্ঞানিক নাম Azadirachta Indica।
যশোর সামাজিক বন বিভাগের কর্মকর্তারা ৬ আগস্ট নিমগাছটি পরিদর্শন করেছেন। তাঁরা একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছেন। প্রতিবেদনে গাছটির বয়স আনুমানিক ৪০০ বছর উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া প্রতিবেদনে গাছটির উচ্চতা প্রায় ৬০ ফুট (গাছটির যে জায়গা থেকে ডালপালা বেরিয়েছে, গোড়া থেকে সেই জায়গা পর্যন্ত ১৩ ফুট) এবং কাণ্ডের বেড় ২০ ফুট উল্লেখ করা হয়।
.বিজয়নগরের শতবর্ষী নিমগাছটি পরিদর্শন করেছি। গাছটির উচ্চতা প্রায় ৬০ ফুট এবং বুকসমান উচ্চতায় কাণ্ডের বেড় ২০ ফুট। গাছটির বয়স আনুমানিক ৪০০ বছর।অমিতা মণ্ডল, বিভাগীয় বন কর্মকর্তা, যশোর সামাজিক বন বিভাগ
কয়েকজন এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শতবর্ষী নিমগাছটি এলাকার ঐতিহ্য। কিন্তু গাছটি সংরক্ষণ বা রক্ষণাবেক্ষণের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি সরকারি বা বেসরকারি—কোনো তরফ থেকে। তাঁরা চান গাছটি সংরক্ষণ করতে উদ্যোগ নিক সরকার। ঐতিহ্যবাহী এই গাছ ঘিরে এখানে একটি পর্যটনকেন্দ্রে গড়ে তোলা যেতে পারে।
.বিজয়নগর গ্রামের কৃষক মতিয়ার মোল্যা (৬০) বলেন, ‘১৯৯৮ সালে আমার বাবা শরিতুল্য মোল্যা ১০০ বছরের বেশি বয়সে মারা যান। আমার বাবা, দাদার কাছে এই নিমগাছের গল্প শুনেছি। তাঁরা বলেছেন, ছোটবেলা থেকে তাঁরা গাছটিকে যেভাবে দেখেছেন, এখনো গাছটি সেইভাবে আছে। তবে আগে গাছটির অনেকটা জায়গাজুড়ে ডালপালা বিস্তৃত ছিল। ডালপালা ভেঙে এখন কিছুটা ছোট হয়ে গেছে। নিমগাছটির বয়স ৪০০ বছরের বেশি হবে।’
.নিমগাছকে ‘প্রকৃতির বিস্ময়’ মনে করা হয়। এ গাছের পাতা, কাণ্ড মূল সবকিছুই আমাদের কাজে লাগে আবার বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষা করতে এবং পরিবেশদূষণ প্রতিরোধে সক্রিয় ভূমিকা রাখে।এম মনজুর হোসেন, উদ্ভিদবিজ্ঞানী
যশোর সামাজিক বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা অমিতা মণ্ডল বলেন, ‘বিজয়নগরের শতবর্ষী নিমগাছটি পরিদর্শন করেছি। গাছটির উচ্চতা প্রায় ৬০ ফুট এবং বুকসমান উচ্চতায় কাণ্ডের বেড় ২০ ফুট। গাছটির বয়স আনুমানিক ৪০০ বছর। শতবর্ষী নিমগাছটিকে “স্মারক বৃক্ষ” ঘোষণার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। “স্মারক বৃক্ষ” হলো যেসব বৃক্ষের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রথাগত মূল্য রয়েছে, এরূপ ঐতিহ্যবাহী বৃক্ষ বা পুরোনো দেশীয় উদ্ভিদ বা শতবর্ষী বৃক্ষ।’
.উদ্ভিদবিজ্ঞানী ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এম মনজুর হোসেন বলেন, ‘নিম দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্রুত বর্ধনশীল সহজলভ্য বৃক্ষ। নিমগাছ ‘প্রকৃতির বিস্ময়’ মনে করা হয়। এ গাছের পাতা, কাণ্ড মূল সবকিছুই আমাদের কাজে লাগে আবার বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষা করতে এবং পরিবেশদূষণ প্রতিরোধে সক্রিয় ভূমিকা রাখে। আয়ুর্বেদ অনুসারে নিমগাছ মানবজাতির জন্য একটি মহামূল্যবান সম্পদ! উপযুক্ত পরিবেশে নিমগাছ উচ্চতায় ৬০ থেকে ৮০ ফুট পর্যন্ত হয় এবং ৩০০ বছরের বেশি বাঁচতে পারে।’