কিশোরগঞ্জের ভৈরবে নিষিদ্ধ যুবলীগের নেতা আল আমিন (৪০) হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ ও তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। প্রাথমিক আলামত ও পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে পারিবারিক সম্পত্তি বিরোধের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
গত রোববার দিবাগত রাত ১২টার দিকে পৌর শহরের টিনপট্টি এলাকায় আল আমিনকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করা হয়। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রাত তিনটার দিকে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। হত্যার তিন দিন পর বুধবার বিকেলে আল আমিনের স্ত্রী তানিয়া খানম বাদী হয়ে ভৈরব থানায় মামলা দায়ের করেন। এজাহারে ৮ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং আরও ১০ থেকে ১২ জন অজ্ঞাতনামা আসামিকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
ভৈরব শহর ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) নুরুল হুদা ভূঁইয়া বলেন, "তদন্তের প্রয়োজনে এজাহারে উল্লেখ করা কারও নাম বলা যাচ্ছে না।"
তবে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, অভিযুক্তরা আল আমিনের পরিবারের সদস্য। এসআই নুরুল হুদা ভূঁইয়া মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "পাওয়া ফুটেজগুলোর মান ভালো না। তবে পরিবারের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে ফুটেজের অনেক কিছুর মিল পাওয়া গেছে। এ কারণে পরিবারের অভিযোগকে অপ্রাসঙ্গিক মনে করছে না পুলিশ। আপাতত পারিবারিক বিরোধকেই হত্যার মূল কারণ হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ব্যবসায়িক বিরোধ আছে কি না, তা–ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আরও কয়েকটি কারণ ভাবনায় রাখা হয়েছে।"
পুলিশি তদন্ত ও সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী, ঘটনার রাতে আল আমিন ভৈরব বাজারের তাঁর মালিকানাধীন রিভারভিউ হোটেলে ছিলেন। রাত ১১টা ৩৮ মিনিটে তিনি মোটরসাইকেল নিয়ে বের হয়ে ১১টা ৪২ মিনিটে গোপাল জিউর মন্দির এলাকা অতিক্রম করেন। এরপর বাড়ির সড়কে প্রবেশের এক মিনিটের মধ্যেই তিনি হামলার শিকার হন। পুলিশ খতিয়ে দেখছে হামলাকারীরা আগে থেকেই সেখানে অপেক্ষা করছিল কি না অথবা তাঁকে অনুসরণ করছিল কি না। ঘটনাস্থলের ক্যামেরায় হামলার দৃশ্য না থাকলেও কিছু শব্দ রেকর্ড হয়েছে, যা পুলিশ বিশ্লেষণ করছে।
নিহত আল আমিন ভৈরব পৌর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক, পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর এবং ভৈরব চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক পরিচালক ছিলেন। সারের ব্যবসার পাশাপাশি তাঁর একটি আবাসিক হোটেল ছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হলে তিনি দুবার গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে ছিলেন এবং সম্প্রতি জামিনে মুক্ত ছিলেন।
আল আমিনের স্ত্রী তানিয়া খানম জানান, আহত অবস্থায় তাঁর স্বামী কথা বলতে পারছিলেন এবং তখন তিনি আপন চাচাতো ভাই হাসান ও জুম্মানের নাম বলেছিলেন। তানিয়ার বিশ্বাস, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের সূত্র ধরেই এই হত্যাকাণ্ড। পরিবারের তথ্যমতে, ভৈরব বাজারের ‘ফকির মার্কেট’ নামক পারিবারিক সম্পত্তির ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে আল আমিনের সঙ্গে মোমেন মিয়ার ছেলে জুম্মান (২৪) ও হাসান (২২)-এর দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল।
আল আমিনের মা মিনারা বেগম বলেন, "সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের পর তাঁর দেবরের ছেলেরা আল আমিনকে কুপিয়ে ফেলে রাখার হুমকি দিতেন। আমি বিষয়টি বিশ্বাস করিনি। এখন তাঁর মনে হচ্ছে, সেই হুমকিই সত্যি হয়েছে।"
ঘটনার পর থেকে মোমেন মিয়ার পরিবারের সদস্যরা নিখোঁজ এবং তাঁদের বাড়ি তালাবদ্ধ। মুঠোফোনগুলোও বন্ধ পাওয়া গেছে। তবে মোমেন মিয়ার এক আত্মীয় নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সম্প্রতি উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলামের মধ্যস্থতায় ওই বিরোধ মীমাংসা করা হয়েছিল।
অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাসানকে ছাত্রদলের সঙ্গে যুক্ত বলে প্রচার করা হলেও ভৈরব উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে জানিয়েছেন, হাসানের সঙ্গে ছাত্রদলের কোনো সম্পর্ক নেই।