মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। বর্তমানে জ্বালানি কেবল অর্থনীতির বিষয় নয়, বরং ভূরাজনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে বিশ্বের অনেক দেশই জ্বালানি নিরাপত্তার ঝুঁকিতে পড়েছে। তবে এই সংকট আকস্মিক নয়; ২০২১ সালে কোভিড-১৯ মহামারির পর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল হলে জ্বালানির চাহিদা দ্রুত বাড়ে, কিন্তু সরবরাহ সেই অনুপাতে বৃদ্ধি পায়নি। পরবর্তীতে ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ এবং চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়।

বাংলাদেশের বর্তমান জ্বালানি সংকটের পেছনে বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাব থাকলেও অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাগুলো এই সংকটকে আরও স্পষ্ট করেছে। দেশে গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগের অভাব, পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন হ্রাস এবং আমদানি করা জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এই সমস্যার মূল কারণ। এছাড়া জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্যের অভাব এবং সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার দুর্বলতা লক্ষ্য করা যায়। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সীমিত থাকা এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা বাড়লেও প্রয়োজনীয় জ্বালানির ব্যবস্থা না করায় বাংলাদেশ এখন জ্বালানি নিরাপত্তার সংকটে পড়েছে।

একসময় সস্তা দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হয়েছিল। বিদ্যুৎ, সার ও শিল্প খাতের বড় চাহিদা দেশীয় গ্যাসে মিটত। কিন্তু উৎপাদন কমায় এখন ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে, যার সরবরাহ অনিশ্চিত এবং আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ওপর নির্ভরশীল। এর ফলে বস্ত্র, স্পিনিং, সিরামিক, ইস্পাত ও সার শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। জ্বালানির এই অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের দ্বিধায় ফেলছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ সংকট তৈরি করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও রপ্তানি বহুমুখীকরণকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

এলডিসি থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে উৎপাদনশীলতা ও জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানো অপরিহার্য। জ্বালানির উচ্চ ব্যয় বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এছাড়া ডিজেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়লে পরিবহন ও সেচ খরচ বেড়ে যায়, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাদের ওপর পড়ে। মূল্যস্ফীতির এই সময়ে জ্বালানির দাম নির্ধারণে নিম্ন আয়ের মানুষের কথা বিবেচনা করা জরুরি।

সংকট উত্তরণে স্বল্প মেয়াদে জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল করা এবং এলএনজি আমদানিতে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ও স্পট মার্কেটের মধ্যে ভারসাম্য রাখা প্রয়োজন। এছাড়া রপ্তানিমুখী শিল্প, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সার কারখানার মতো জরুরি খাতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি ও বাণিজ্যিক ভবনে জ্বালানি সাশ্রয়ী ব্যবস্থা গ্রহণ এবং লক্ষ্যভিত্তিক মূল্য সংস্কারের মাধ্যমে সামর্থ্যবানদের কাছ থেকে বাজারমূল্য আদায়ের কথা বলা হয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে স্থল ও সমুদ্র—উভয় ক্ষেত্রে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান দ্রুত করতে হবে। বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়ানো এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক দক্ষ কোম্পানিগুলোকে যুক্ত করা যেতে পারে। পাশাপাশি সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার উন্নয়ন, শিল্পকারখানায় উন্নত বয়লার ও মোটর ব্যবহার এবং বিদ্যুৎ-সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতির প্রসার ঘটাতে হবে। সৌরবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর গুরুত্ব দিলে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনের মেগাওয়াট হিসাবের বাইরে গিয়ে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। নেপাল ও ভুটানের জলবিদ্যুৎ ব্যবহারের সম্ভাবনা এবং আঞ্চলিক বিদ্যুৎ-বাণিজ্যের সুযোগ কাজে লাগানো প্রয়োজন। জ্বালানি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়, কেনাকাটায় স্বচ্ছতা ও নীতিমালার ধারাবাহিকতা বজায় রাখলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে। বৈশ্বিক সংঘাত থাকলেও সঠিক সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনার মাধ্যমে জ্বালানি সমস্যাকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে বাধা হওয়া থেকে রক্ষা করা সম্ভব।