দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী ডিবিএল গ্রুপ তাদের ৭টি তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল কারখানার ছাদে ৫ দশমিক ৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিট স্থাপন করেছে। পাশাপাশি নতুন করে সিরামিক, তৈরি পোশাকসহ ১০টি কারখানায় ১৬ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ বসানোর পরিকল্পনা নিয়েছে তারা। এর মধ্যে চলতি বছর উৎপাদনে আসবে ৮ মেগাওয়াট। বাকিটা আগামী বছর।

জানতে চাইলে ডিবিএল গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান এম এ রহিম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জ্বালানিনিরাপত্তা ও বিদেশি ক্রেতাদের কার্বন নিঃসরণের চাপ থাকায় আমরা দ্রুত সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ করছি। নতুন প্রযুক্তি আসায় এখন সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে আগের চেয়ে সময় কম লাগছে। কারখানার ছাদের সৌরবিদ্যুতে প্রতি ইউনিটে খরচ পড়ছে ৬ থেকে সাড়ে ৬ টাকা।’

ডিবিএল গ্রুপের মতো বড় শিল্পকারখানাগুলো এখন দ্রুতগতিতে সৌরবিদ্যুতের দিকে ঝুঁকছে। গত দশকে সরকারের নীতি ও বিদেশি ক্রেতাদের কার্বন নিঃসরণ কমানোর চাপে পড়ে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন শুরু হয়। জ্বালানিসংকট প্রকট হওয়ার পাশাপাশি জ্বালানির দাম বাড়তে থাকায় তিন বছর ধরে সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে বড় বড় শিল্পগোষ্ঠী।

.

সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সঙ্গে যুক্ত একাধিক প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা জানান, শিল্পকারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুতের যতগুলো বড় প্ল্যান্ট হয়েছে, তার অধিকাংশই হয়েছে গত দুই বছরে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন শিল্পকারখানায় ৬০০ মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদনক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ইউনিট স্থাপিত হয়েছে। তার মধ্যে বেশির ভাগই রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পে।

যদিও ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ–শিল্পের বিদ্যুতের পুরো চাহিদা পূরণ করতে পারে না। তবে কারখানার তিন–চার ঘণ্টা পর্যন্ত কার্যক্রম সচল রাখতে সহায়তা করে। সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে কারখানার মোট বিদ্যুৎ–চাহিদার ৫-১৫ শতাংশ পর্যন্ত পূরণ হয়। যদিও কারখানাভেদে এই হার বেশিও হয়। ফলে দিনের বেলায় জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের ওপর চাপ কিছুটা হলেও কমাতে পেরেছে এসব শিল্পকারখানার ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ—এমনটাই জানান সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত শিল্পের কর্তাব্যক্তিরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, আবুল খায়ের স্টিল, ওয়ালটন, হা-মীম গ্রুপ, প্রাণ–আরএফএল গ্রুপ, বিএসআরএম, ইয়ংওয়ান গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই), প্যাসিফিক জিনস গ্রুপ, টিম গ্রুপ, ডিবিএল গ্রুপ, রাইজিং গ্রুপ, ঊর্মি গ্রুপ, মাইক্রোফাইবার গ্রুপ, পলমল গ্রুপ, অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার, কর্ণফুলী শু ইন্ডাস্ট্রিজ, মাসকো গ্রুপসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে তাদের কারখানায় বিভিন্ন ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ইউনিট স্থাপন করেছে।

.

শিল্পের ছাদে বসছে সৌরবিদ্যুৎ

দেশের শিল্পকারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ছাদে বসানো সৌরবিদ্যুতের ক্ষমতা যে বাড়ছে, সে বিষয়ে ধারণা পাওয়া যায় যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জ্বালানিবিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) এক প্রতিবেদনে।

গত ৪ আগস্ট প্রকাশিত সংস্থাটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারি হিসাবে দেশে বর্তমানে ছাদে স্থাপন করা সৌরবিদ্যুতের উৎপাদনসক্ষমতা ৪১৮ মেগাওয়াট। তবে আইইইএফএর হিসাবে, ২৩৯টি বড় শিল্পকারখানার ছাদে স্থাপন করা সৌরবিদ্যুতের প্রকৃত সক্ষমতা ৬৬৭ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে।

আইইইএফএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বড় শিল্পকারখানার পাশাপাশি ছোট ছোট স্থাপনার ছাদে স্থাপন করা সৌরবিদ্যুৎ হিসাবের আওতায় আনলে বাংলাদেশের ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের মোট উৎপাদনসক্ষমতা ১ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত হতে পারে। এতে দিনের বেলায় বিদ্যুতের চাহিদা সামান্য কমেছে। ২০২৪ সালের ১৬ এপ্রিল থেকে ১১ জুনের সঙ্গে চলতি বছরের একই সময়ের বিদ্যুতের চাহিদার তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে এই তথ্যের সত্যতা মিলেছে বলে দাবি করেছে আইইইএফএ।

.

দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী প্রাণ-আরএফএল তাদের বিভিন্ন কারখানার ছাদে ১০০ মেগাওয়াটের বেশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করেছে। ২০টি কারখানায় ইতিমধ্যে ৩৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। এ বছরের মধ্যে আরও অন্তত ৩০ মেগাওয়াট যুক্ত হতে পারে। নিজেদের কারখানা ব্যবহারের পাশাপাশি দুটি কারখানা থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে।

কারখানার ছাদে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াচ্ছে আরেক বড় গোষ্ঠী আকিজ বশির গ্রুপ। তাদের জনতা জুট মিলসে ২১ মেগাওয়াট উৎপাদনসক্ষমতা তৈরি করা হয়েছে। এখন চাহিদার শতভাগ বিদ্যুৎ ছাদ থেকে পাচ্ছে পাটকলটি। হবিগঞ্জে আকিজ গ্লাসের কারখানার ছাদে ১৩ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ইউনিট বসানো হয়েছে, যার মধ্যে ৮ মেগাওয়াট ব্যাটারি সিস্টেম আছে। এতে রাতেও বিদ্যুৎ পায় কারখানাটি। ২০২২ সালে উৎপাদন শুরু করে তারা। এখন সব মিলে ছাদ থেকে ৭৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে আকিজ বশির। আরও ২৮ মেগাওয়াট উৎপাদনসক্ষমতা বাড়ানোর কাজ চলছে বর্তমানে।

মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই) তাদের বিভিন্ন কারখানার ছাদে ৬৪ দশমিক ৮৪ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ইউনিট স্থাপন করেছে। এই বিদ্যুৎ তাদের কারখানার বিদ্যুৎ–চাহিদার ৫ শতাংশের কাছাকাছি। নতুন করে আরও ৫০ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। সেটি হলে তাদের সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ১১৫ মেগাওয়াটে উন্নীত হবে।

.

জানতে চাইলে এমজিআইয়ের পরিচালক তানভীর মোস্তফা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরেই নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন ও ব্যবহার আমাদের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে। শুধু কারখানার ছাদ নয়, ভবনের সম্মুখভাগ, সীমানাপ্রাচীর ও সড়ক বিভাজকের আলোকব্যবস্থায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সৃজনশীল উপায় খুঁজছি আমরা।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ধাপে ধাপে ব্যক্তিগত গাড়ি ও বাণিজ্যিক যানবাহনকে বৈদ্যুতিক যানে রূপান্তর করছি। প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকটের সময়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোয় এলপিজি ব্যবহারের নির্ভরযোগ্য উপায় খুঁজে দেখছি। এসব উদ্যোগ জাতীয় জ্বালানি সংকটের সমাধান করতে পারবে না। তবে জ্বালানি সম্পদের ওপর আমাদের নির্ভরতা কমাতে ভূমিকা রাখবে।’

ইস্ট কোস্ট গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ওমেরা সোলার ২০২১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ১০০টি শিল্পকারখানার ছাদে ১৩০-১৪০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ইউনিট স্থাপন করেছে। বর্তমানে ১২টি শিল্পে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের কাজ চলমান আছে তাদের। এগুলো চালু হলে আরও ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে।

জানতে চাইলে ওমেরা সোলারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাসুদুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, জ্বালানিসংকট প্রকট হওয়ায় গত দুই বছরে শিল্পকারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপিত হয়েছে সবচেয়ে বেশি। সৌরবিদ্যুতের প্ল্যান্টের জীবনকাল ২০-২৫ বছর। একবার বিনিয়োগ করলে পরবর্তী সময়ে রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়া তেমন কোনো ব্যয় নেই। তা ছাড়া গ্রিডের বিদ্যুতের চেয়ে দাম অর্ধেক বা তার কম। সে জন্য শিল্পোদ্যোক্তারা সৌরবিদ্যুতে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।

.

খরচ কমাচ্ছে সৌরবিদ্যুৎ

তৈরি পোশাকশিল্পের আরেক শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান রাইজিং গ্রুপ তাদের ৬টি শিল্পকারখানার ছাদে ১৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ইউনিট স্থাপন করেছে। এতে দুটি পোশাক কারখানার বিদ্যুতের চাহিদার ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে মিটছে তাদের। আর দুটি সুতার কলের (স্পিনিং মিল) চাহিদার ১৫ শতাংশ বিদ্যুৎ ছাদের সৌরবিদ্যুৎ থেকে আসছে।

রাইজিং গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাহমুদ হাসান খান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘মানিকগঞ্জে আমাদের স্পিনিং মিল দীর্ঘদিন গ্যাস–সংকটে ভুগছিল। পরে সংকট সমাধানে আমরা অনেকটা বাধ্য হয়েই ২০১৯ সালে কারখানাটিতে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করি। তবে পরে অন্যান্য কারখানায় আমরা সত্যিকারের ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে স্থাপন করেছি। কারণ, গ্রিডের তুলনায় সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন খরচ অর্ধেকের কাছাকাছি।’

.
* ২৩৯টি বড় শিল্পকারখানার ছাদে স্থাপিত সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা ৬৬৭ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে: আইইইএফএ
* বড় কারখানায় গ্রিডের বিদ্যুৎ ব্যবহারে প্রতি ইউনিটে ব্যয় ১২.৭৫ থেকে ১২.৮৫ টাকা। ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ইউনিটপ্রতি খরচ ৪ থেকে ৮ টাকা।
* পাঁচ বছর আগে ছাদে প্রতি মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে ৫ কোটি টাকা লাগত। এখন সেই খরচ কমে ৪ কোটিতে নেমেছে।  
* শিল্পকারখানায় স্থাপনের জন্য সৌরবিদ্যুতের যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধায় খরচ ১৫ শতাংশ কমতে পারে।
* ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ ৩০ শতাংশ কমানোর শর্ত দিয়েছে ইউরোপের তৈরি পোশাকের ক্রেতারা।
.

জানা যায়, ক্ষুদ্র শিল্পের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম এখন ১২ টাকা ৭৩ পয়সা। আর বড় কারখানায় মাঝারি চাপের সংযোগের ক্ষেত্রে গড় দাম ১২ টাকা ৮৫ পয়সা ও উচ্চ চাপে এটি ১২ টাকা ৭৫ পয়সা। যদিও রাতে সর্বোচ্চ চাহিদার সময় প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম পড়ে ১৬ টাকার কাছাকাছি। অথচ ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ইউনিটপ্রতি খরচ হচ্ছে ৪ থেকে ৮ টাকার মতো।

সুপারস্টার রিনিউবেল এনার্জি এখন পর্যন্ত ৯০টি শিল্পকারখানায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এসব প্রকল্পের মোট উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ১০০ মেগাওয়াট। বর্তমানে ১০টির বেশি শিল্পের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। এগুলো চালু হলে ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে।

জানতে চাইলে সুপারস্টার রিনিউবেল এনার্জির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মিজানুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, পাঁচ বছর আগে ছাদে প্রতি মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ ইউনিট স্থাপনে ৫ কোটি টাকা লাগত। এখন সেই খরচ কিছুটা কমে ৪ কোটি টাকায় নেমেছে। তবে সেটি জমিতে স্থাপন করতে গেলে ৮ কোটি টাকার কাছাকাছি খরচ হয়।

.

সম্ভাবনার সঙ্গে চ্যালেঞ্জও আছে

তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সম্প্রতি ৪২৪টি তৈরি পোশাক কারখানার ওপর জরিপ চালিয়েছে। এই শিল্পের মালিকেরা প্রত্যেকেই তাঁদের কারখানায় ছাদে সৌরবিদ্যুৎ বসাতে আগ্রহী। তবে এ ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা হিসেবে অর্থায়নের সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়েছেন তাঁরা।

একাধিক পোশাকশিল্পমালিক জানান, ২০৩০ সালের মধ্যে উৎপাদনব্যবস্থায় কার্বন নিঃসরণ ৩০ শতাংশ কমানোর শর্ত দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) তৈরি পোশাকের ক্রেতারা। ফলে যাঁরা ইইউ ক্রেতাদের জন্য তৈরি পোশাক উৎপাদন করেন তাঁদের ওপর সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের চাপ আছে। তবে খরচ বেশি হওয়ায় মাঝারি উদ্যোক্তাদের পক্ষে সৌরবিদ্যুৎ ইউনিট স্থাপন করা বেশ চ্যালেঞ্জিং।

জানতে চাইলে বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড থেকে ৫ শতাংশ এবং ইডকল থেকে ৬ শতাংশ সুদে ঋণ পাওয়া যায়। তবে ইডকলের ঋণ পেতে ১০০ শতাংশ অর্থ ব্যাংক গ্যারান্টি দিতে হয়। ঋণপ্রাপ্তিতে সুদের হার কমাতে হবে অন্যথা ঋণ পরিশোধের সময় ৭ বছরের বদলে ৯ বছর করতে হবে। তাহলে মাঝারি শিল্পের মালিকেরা তাদের কারখানায় সৌরবিদ্যুৎ ইউনিট বসাতে পারবেন।

.

এক দশক ধরেই নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জোর দেওয়ার কথা বলা হলেও উৎপাদন তেমন বাড়েনি। মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে করার কথা ছিল ২০২১ সালে। লক্ষ্য পূরণ না হওয়ায় ২০২৫ সালে নতুন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। বর্তমান সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ২০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তারই অংশ হিসেবে চলতি অর্থবছরের বাজেটে সৌরবিদ্যুতের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ আমদানিতে আমদানি শুল্ক, রেগুলেটরি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক এবং আগাম কর তুলে দিয়েছে সরকার। তবে সুবিধা পেতে বেশ কিছু শর্ত মানতে হবে।

সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনকারী কোম্পানির কর্মকর্তারা বলছেন, শিল্পকারখানায় স্থাপনের জন্য সৌরবিদ্যুতের যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্কমুক্ত–সুবিধা দেওয়ায় খরচ ১৫ শতাংশ কমতে পারে। সেটি হলে ১ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে ৪ কোটি থেকে কমে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকায় নেমে আসতে পারে।

.

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, দেশের ৩ হাজার ৩২০টি পোশাক কারখানার ছাদে প্রায় ১ হাজার ৭৬৮ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। তার মধ্যে ৫০০ কারখানা সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত আছে। নানা সুবিধা দিয়ে আরও ১ হাজার ৩০০ কারখানায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে।

জানতে চাইলে সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘জ্বালানি–সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে অভ্যন্তরীণ গ্যাস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বিদ্যুতায়িত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে হবে। শিল্পকারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন বড় থেকে ছোট-মাঝারি শিল্পকারখানায় নিতে হলে কম সুদে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য শেয়ারবাজারে গ্রিন বন্ড ছাড়া যেতে পারে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনেক স্বল্প খরচের তহবিল রয়েছে। সেগুলো এনে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে অর্থায়ন করা যায়। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংককে গ্যারান্টি দিতে হবে। দুই বছর আগেই আমরা দেখেছিলাম বৈশ্বিক পর্যায়ে ৩৪ বিলিয়ন ডলারের স্বল্প খরচের তহবিল রয়েছে, যেগুলো বাংলাদেশ পেতে পারে।’