জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মওদুদীর মতাদর্শের বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন কওমি ঘরানার আলেম ও রাজনৈতিক দলের নেতারা। তাঁদের মতে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আকিদা-বিশ্বাসের বিষয়ে কোনো আপস করা যাবে না এবং কওমি ঘরানার দলগুলোকে এ বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
মঙ্গলবার রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (আইডিইবি) মাল্টিপারপাস হলে আয়োজিত জাতীয় উলামা-মাশায়েখ কনভেনশনে বক্তারা এসব কথা বলেন। ইমান আকিদা সংরক্ষণ কমিটির আয়োজনে এই কনভেনশনের মূল উদ্দেশ্য ছিল আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আকিদা-বিশ্বাস সংরক্ষণে গণসচেতনতা সৃষ্টি, হেযবুত তওহীদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা এবং সংসদে পাস হওয়া শ্রম আইন বাতিলের দাবি জানানো।
কনভেনশনে হেফাজতে ইসলাম ও দেওবন্দ ঘরানার বিভিন্ন আলেম বক্তব্য প্রদান করেন। সেখানে অভিযোগ করা হয় যে, কওমি অঙ্গনে জামায়াতের ‘অনুপ্রবেশ’ ঘটছে। বক্তারা সতর্ক করে বলেন, কওমি অঙ্গনে জামায়াতের এই অনুপ্রবেশ ঠেকাতে হবে এবং জামায়াতের নেতৃত্বে ইসলামপন্থী দলগুলোর কোনো ঐক্য সম্ভব নয়।
আলেমরা মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকনকে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী করার প্রতিবাদ জানান। পাশাপাশি তাঁরা হেযবুত তওহীদের কার্যক্রম ও প্রচারণা নিষিদ্ধ করা, আহমদিয়া মুসলিম জামায়াতকে (কাদিয়ানী) রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণা করা এবং শ্রম আইন বাতিলের দাবি উত্থাপন করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও লিখিত বক্তব্য পাঠান হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী। তাঁর বক্তব্যে বলা হয়, "মওদুদীবাদের মতাদর্শিক ভুল ও বিভ্রান্তি সম্পর্কে উম্মাহকে সতর্ক থাকতে হবে। ইসলামি সমাজ বিনির্মাণ হতে হবে কোরআন–সুন্নাহ অনুযায়ী। কোনো ব্যক্তিবিশেষের রাজনৈতিক মনগড়া ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে নয়।"
হেযবুত তওহীদের বিষয়ে তিনি বলেন, "দেশের ধর্মীয় শান্তি, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং আকিদাগত নিরাপত্তার স্বার্থে সরকারকে হেযবুত তওহীদের কার্যক্রম ও প্রচারণার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতে হবে।" কাদিয়ানীদের বিষয়ে তিনি বলেন, "কাদিয়ানীদের রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণা করতে হবে।"
হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব আল্লামা সাজিদুর রহমান বলেন, "হেযবুত তওহীদ পাশের কোনো দেশের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে। এই সংগঠনকে অতি দ্রুত নিষিদ্ধ করতে হবে।" তিনি আরও হুঁশিয়ারি দেন যে, ট্রান্সজেন্ডার আইন বাস্তবায়ন হতে দেওয়া হবে না। ভ্রান্ত মতাদর্শের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সরকার যেন কোরআন-সুন্নাহবিরোধী কোনো আইন পাস না করে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমদের পরামর্শ নিয়ে ধর্মীয় বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়।
হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমির আল্লামা আবদুল হামিদ (মধুপুরের পীর) বলেন, "যারা সাহাবায়ে কেরামকে সত্যের মাপকাঠি হিসেবে গণ্য করে না, তারা ইসলামের শত্রু। জামায়াত কোনো দিন ইসলামের কাজ করেনি।" তিনি সরকারের কাছে দাবি জানান, শামীম কায়সার লিংকনকে অন্য মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রিত্ব দিয়ে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী হিসেবে হানাফি মাজহাবের যোগ্য কাউকে নিয়োগ দেওয়া হোক।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম সতর্ক করে বলেন, সরকার আলেমদের বক্তব্যকে গুরুত্ব না দিলে তাদের ভবিষ্যৎ ভালো হবে না। দেওবন্দ ঘরানার আলেমদের মধ্যে অনুপ্রবেশকারী থাকলে তাদের ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিহত করতে হবে।
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী বলেন, ইমান-আকায়েদ সংরক্ষণে অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করতে হবে এবং কোনো আপস করা যাবে না। তিনি জানান, যে নেতৃত্ব সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমের মতের অধীনে থাকবে তাকে তারা স্বাগত জানাবেন, তবে ভ্রান্ত মতাদর্শের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্ব তারা মানবেন না।
কনভেনশনে বিশেষ আলোচক হিসেবে উর্দু ভাষায় বক্তব্য রাখেন পাকিস্তানের সারগোদাহের মারকাজ আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের পরিচালক মাওলানা ইলিয়াস গুম্মান।
মাওলানা আবদুল আউয়ালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন জুনায়েদ আল হাবিব, মুফতি বশির উল্লাহ, আল্লামা নূরুল ইসলাম ওলীপুরী, মাওলানা মুহিউদ্দিন রব্বানী এবং আবদুল কাইয়ুম সুবহানী। এছাড়া অধ্যাপক মোহাম্মদ সরোয়ার হোসেন, আবদুল্লাহ মোহাম্মদ হাসান, আবদুর রব ইউসুফী, সাখাওয়াত হোসেন রাজি, মুজিবুর রহমান হামিদী ও মুফতি রেজাউল করীম আবরারসহ অর্ধশতাধিক আলেম এই কনভেনশনে বক্তব্য রাখেন।