১৯৭৩ সাল থেকে বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো)-এর নতুন কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন কাজুইকি কাতাওকা। ২০২৫ সালের জুন মাসে তিনি এই পদে আসীন হন। একই সঙ্গে তিনি জাপানিজ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন অব ঢাকার মহাসচিব এবং জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (জেবিসিসিআই) যুগ্ম মহাসচিব। সম্প্রতি গুলশানে জেট্রো কার্যালয়ে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে শফিকুল ইসলামের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে কথা বলেন তিনি।
বাংলাদেশের বর্তমান আর্থসামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে কাজুইকি কাতাওকা বলেন, "আমি বাংলাদেশে এসেছি ২০২৫ সালের জুনে। এটি খুব সংক্ষিপ্ত সময়। তবে গত এক বছর দুই মাসেই এখানকার পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে পরিবর্তন হতে দেখেছি। ব্যবসা ও অর্থনীতির দিক থেকে বলতে গেলে মূল্যস্ফীতি এখন বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুতর সমস্যা। রাজনৈতিক দিকে থেকে বলতে গেলে, শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের কারণে পরিবেশ উন্নত হয়েছে। এতে জাপানি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে আসার ক্ষেত্রে ভালো উদ্দীপনা পাচ্ছেন। নির্বাচনের পরে বেশ কিছু জাপানি কোম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও বাংলাদেশে আসছেন। এ কারণে জাপান থেকে বাংলাদেশে আরও বিনিয়োগ নিয়ে আসার জন্য জেট্রোর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।"
বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনার প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো উল্লেখ করে তিনি জানান, শুল্কায়ন প্রক্রিয়া, মূলধন ও মুনাফা নিজ দেশে ফেরত পাঠানো এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি (ইন্টিলেকচুয়াল প্রোপার্টি) সংক্রান্ত সমস্যাগুলো জাপানি কোম্পানিগুলোকে ভোগাচ্ছে। এছাড়া দুর্নীতিকে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করে তিনি বলেন, "আমার মনে হয়, দুর্নীতি দূর করা বেশ কঠিন। কারণ, এটি একধরনের অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে।"
শুল্কায়ন জটিলতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "শুল্কায়ন–জটিলতার ক্ষেত্রে দেখা যায় আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ইনভয়েস বা চালান মূল্যের ওপর ভিত্তি করে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করতে হয়। কিন্তু এই দেশে কিছু কোম্পানি আন্ডার-ইনভয়েসিং (কম মূল্য দেখানো) করে। তাই কাস্টমস ইনভয়েস মূল্যকে বিশ্বাস করতে পারে না। ফলে আমাদের বাস্তবের চেয়ে অনেক বেশি শুল্ক পরিশোধ করতে হয়। এ ছাড়া বেসরকারি বিনিয়োগ ও উন্নয়নমূলক প্রকল্প যেটাই হোক, জাপানি কোম্পানিগুলোর জন্য মুনাফা ফেরত পাঠানো খুবই কঠিন। মাঝেমধ্যে টাকা পাঠানোর জন্য যেসব কাগজপত্র প্রয়োজন হয়। এ জন্য আমাদের কখনো বিডাতে, কখনো এনবিআরে, আবার কখনো বাংলাদেশ ব্যাংকে দৌড়াতে হয়।"
বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ সুরক্ষায় সরকারের অনীহা এবং নকল পণ্যের আধিক্যের কথা উল্লেখ করে তিনি সিটিজেন ক্যালকুলেটর ও ওমরনের উদাহরণ দেন এবং জানান যে এসব কোম্পানি নকল পণ্যের কারণে বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে।
শ্রমের খরচ নিয়ে আলোচনায় তিনি বলেন, "এখানে শ্রমের খরচ হয়তো কম হতে পারে। কিন্তু আপনি যদি পরিষেবা মূল্য (ইউটিলিটি ফি) বা জমি অধিগ্রহণ খরচের মতো অন্য বিষয়গুলো দেখেন, তবে কিন্তু তা মোটেই কম নয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এটি মিয়ানমার বা শ্রীলঙ্কার চেয়েও বেশি। এ ছাড়া সরকারি প্রক্রিয়ার বিলম্ব বা অস্পষ্টতার জন্য অতিরিক্ত খরচ হয়। ফলে এখানে ব্যবসা করার সামগ্রিক খরচ অন্য দেশের তুলনায় কম নয়। এ দেশের ব্যবসার পরিবেশকে আকর্ষণীয় করতে হলে শুধু শ্রমের খরচে মনোযোগ না দিয়ে মোট খরচের দিকে তাকাতে হবে। বিশেষ করে অহেতুক খরচ কমাতে হবে।"
বিনিয়োগ সংস্থাগুলো একীভূত করার সরকারি উদ্যোগের বিষয়ে তিনি জানান, এটি তাদেরই প্রস্তাব ছিল। তবে এই পদক্ষেপের কার্যকারিতা নিয়ে তিনি বলেন, "কিছু দিক ইতিবাচক, আবার কিছু দিক ইতিবাচক না–ও হতে পারে। ইতিবাচক দিক হলো সরকারের বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করার সদিচ্ছা রয়েছে। তারই অংশ হিসেবে বিডা, বেজা ও পিপিপি কার্যালয়কে একীভূত করা হচ্ছে। তবে এটা কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা দেখতে আমাদের আরও অপেক্ষা করতে হবে। অন্যদিকে, সরকার বিনিয়োগ–সম্পর্কিত সব সংস্থাকে একীভূত করতে পারেনি। বেপজা ও হাই-টেক পার্ক এখনো আলাদা রয়েছে। আবার যে তিনটি সংস্থাকে একত্র করা হচ্ছে, তাদের ভূমিকা একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।"
তিনি আরও বলেন, "সরকারি কর্মকর্তাদের ইতিবাচক মনোভাব, বিশেষ করে মধ্য ও নিম্নপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মনোভাব এবং তাদের জবাবদিহি অত্যন্ত জরুরি। কারণ, আমরা এমন অনেক ঘটনা দেখি যেখানে অহেতুক নানা হয়রানি করা হয়।"
বাংলাদেশে বর্তমানে ৩৫০টির মতো জাপানি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। ভবিষ্যতে এই সংখ্যা বাড়বে বলে আশাবাদী কাতাওকা। তিনি জানান, জাপানি কোম্পানিগুলো এখন কেবল রপ্তানিমুখী উৎপাদন নয়, বরং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের দিকেও নজর দিচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে গত ফেব্রুয়ারি মাসে মিতসুই কোম্পানির এসিআই লজিস্টিকসে (স্বপ্ন) এবং এপ্রিলে মিতসুবিশি করপোরেশনের র্যাংগস গ্রুপে বিনিয়োগের কথা উল্লেখ করেন।
জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চলের খালি জমি প্রসঙ্গে তিনি জানান, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বিদ্যুৎ-গ্যাস ও খরচের সমস্যা বিনিয়োগের গতি কমিয়েছিল। তবে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর অনেক কোম্পানি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
আঞ্চলিক বাণিজ্যের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, "ভারতের সঙ্গে যদি আমরা যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি করতে পারি, তবে আমাদের পাশেই একটি বিশাল বাজার রয়েছে। জাপানি কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে পণ্য উৎপাদন করে সেভেন সিস্টার্সে রপ্তানি করতে পারে। আমি জানি এটি বেশ কঠিন, তবে এই সম্ভাবনাগুলো নিয়ে কাজ করা উচিত। বাংলাদেশের একটি আঞ্চলিক বাণিজ্যিক কেন্দ্র (হাব) হওয়ার পূর্ণ সম্ভাবনা রয়েছে।"
আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব নিয়ে তিনি বলেন, জাপানি কোম্পানির ব্যবসা আরও বহুমুখী হওয়া উচিত। ইস্পাত আমদানির পাশাপাশি কৃষি ও উচ্চমানের পণ্যের বাজারে সম্ভাবনা দেখছেন তিনি। তিনি মনে করেন, শুধু টেক্সটাইল বা খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ নয়, কৃষি ও অন্যান্য ক্ষেত্রেও দুই দেশ একে অপরকে সহায়তা করতে পারে।