ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে। তবে এর আগের দিন অর্থাৎ সোমবার তেলের দাম ২ শতাংশের বেশি হ্রাস পায়। বর্তমানে বিনিয়োগকারীরা যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষণা অনুযায়ী ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা দেশগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞার প্রভাব খতিয়ে দেখছেন।

মঙ্গলবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৯ সেন্ট বা দশমিক ১ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯২ দশমিক ১৬ ডলার হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম ১ সেন্ট বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৫ দশমিক শূন্য ২ ডলার হয়েছে।

এর আগে সোমবার দুই ধরনের তেলের দামই ২ শতাংশের বেশি কমেছিল, যার ফলে ডব্লিউটিআই তেলের দাম এক সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। গত দুই সপ্তাহে দাম বাড়ার পর বিনিয়োগকারীদের মুনাফা সংগ্রহের প্রবণতার কারণে এই দরপতন ঘটে।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সম্প্রতি ইরানের আয়ের প্রধান উৎসগুলো বন্ধ করতে নিষেধাজ্ঞার পরিধি আরও বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন, যার লক্ষ্য দুই দেশের মধ্যকার চলমান যুদ্ধের অবসান ঘটানো। তিনি সতর্ক করে বলেন, "যারা ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করছে, তাদের ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে। তা না হলে ডলারভিত্তিক বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে তারা।"

তবে কোন কোন দেশ এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসবে বা তা কবে থেকে কার্যকর হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি বেসেন্ট। তবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে নতুন নির্দেশনা মেনে চলার জন্য সময় দেওয়া হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা যুক্তরাষ্ট্র নাকচ করে দেয়নি। তবে বর্তমানে সামরিক পদক্ষেপের চেয়ে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর দিকেই গুরুত্ব দিচ্ছে ওয়াশিংটন। বিশ্লেষকদের মতে, এর ফলে যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা কিছুটা কমেছে।

কেসিএম-এর প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার মনে করেন, সামরিক পদক্ষেপের তুলনায় অর্থনৈতিক চাপ কম ঝুঁকিপূর্ণ এবং বাজার সেভাবেই প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। এই কারণেই প্রাথমিক পর্যায়ে তেলের দাম বাড়ার পরিবর্তে কমেছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটানোর সক্ষমতা ইরানের এখনো রয়েছে, ফলে তেলের দামে ঝুঁকি প্রিমিয়াম বজায় থাকছে।

ইরানের এই সক্ষমতার প্রমাণ মেলে ওমানের আশ শিসাহ এলাকার প্রায় ৯ নটিক্যাল মাইল (১৬ দশমিক ৭ কিলোমিটার) উত্তর-পূর্বে একটি তেলবাহী ট্যাংকারে অজ্ঞাত বস্তু আঘাত হানলে। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস জানিয়েছে, এই ঘটনায় ট্যাংকারটি অচল হয়ে পড়েছে।

কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বলে দাবি করে আসছে ইরান। গত ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালির মাধ্যমে হতো। গতকাল ইরান ৪৫টি ট্যাংকারের নাম প্রকাশ করে জানিয়েছে, জাহাজগুলো প্রণালি অতিক্রমের ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়ম ভঙ্গ করেছে। এসব জাহাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং বহন করা তেল জব্দের হুমকিও দিয়েছে তেহরান।

উল্লেখ্য, ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের ফলে তেল সরবরাহে যে বিঘ্ন তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশ বাণিজ্যিক ও কৌশলগত মজুত থেকে তেল ব্যবহার করছে। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগের তথ্যমতে, গত সপ্তাহে দেশটির কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত (এসপিআর) থেকে অপরিশোধিত তেলের মজুত প্রায় ৩৭ লাখ ব্যারেল কমেছে। এর ফলে মোট মজুত দাঁড়িয়েছে ২৮ কোটি ৯৭ লাখ ব্যারেলে, যা ১৯৮২ সালের নভেম্বরের পর সর্বনিম্ন।