দেশজুড়ে তীব্র জ্বালানি সংকটের মধ্যে যাত্রাবাড়ীর সুতিরখালপাড় ও বিবিরবাগিচা এলাকায় রাতের আঁধারে দুই শতাধিক বাড়িতে অবৈধ গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, তিতাস গ্যাসের কর্মচারী সবুজ হোসেনের উপস্থিতিতেই তার সহযোগী ঠিকাদার জাহাঙ্গীর হোসেন এই কাজ সম্পন্ন করেছেন। প্রতিটি বাড়ির কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এই অবৈধ সংযোগের ফলে আশপাশের এলাকায় বিদ্যমান গ্যাস সরবরাহও পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগী বাড়িওয়ালাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যাত্রাবাড়ীর সুতিরখালপাড় ও বিবিরবাগিচা এলাকায় তিতাস গ্যাসের কর্মচারী সবুজ হোসেন এবং স্থানীয় প্রভাবশালী জাহাঙ্গীর হোসেনের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী অবৈধ সংযোগ সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। গ্যাসের তীব্র সংকটকে কাজে লাগিয়ে এই চক্রটি '২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস' সরবরাহের লোভনীয় প্রতিশ্রুতি দিয়ে অবৈধ সংযোগ দিচ্ছে। সুতিরখালপাড় এলাকার দায়িত্ব সামলান জাহাঙ্গীর হোসেন এবং বিবিরবাগিচা এলাকার তদারকি করেন সবুজ হোসেন।

প্রত্যক্ষদর্শী একাধিক বাড়িওয়ালা জানান, গত বুধবার (১৯ আগস্ট) ও বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) গভীর রাতে বিবিরবাগিচা এলাকার সবুজ ছায়া স্কুল ও মক্কা বিল্ডিং সংলগ্ন সড়কে তিতাসের ঠিকাদার জাহাঙ্গীরের শ্রমিকদের অবৈধ গ্যাস সংযোগের কাজ করতে দেখা যায়। রাত ৯টার দিকে সেখানে কয়েকজন সংবাদকর্মী উপস্থিত হলে সবুজ নিজ পকেট থেকে টাকা দিয়ে তাদের 'ম্যানেজ' করার চেষ্টা করেন। এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও ফুটেজ মুক্তকণ্ঠের হাতে এসেছে।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, সুতিরখালপাড় ও বিবিরবাগিচার ১ ও ২ নম্বর সড়কের শতাধিক বাড়ি থেকে ৫০ হাজার টাকা করে তোলেন জাহাঙ্গীর, আর তিতাস অফিস 'ম্যানেজ' করার দায় নেন সবুজ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিবিরবাগিচার ২ নম্বর রোডের এক বাসিন্দা বলেন, “আমরা ঠিকমতো গ্যাস পাচ্ছি না, তাই বাধ্য হয়ে টাকা দিয়েছি।”

এসব অভিযোগের বিষয়ে সবুজ হোসেনের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “আমি তিতাসে চাকরি করি, তবে এসবের মধ্যে আমি নেই। কাজটা জাহাঙ্গীর করেছে। সে তিতাসের ঠিকাদার, নিজের লোক দিয়ে বাড়িওয়ালাদের এই লাইন দিয়েছে। টাকা তোলাসহ যাবতীয় কাজ জাহাঙ্গীরই করেছে।” সংবাদকর্মীদের টাকা দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, “সেদিন রাতে সাংবাদিকেরা এলে আমি গিয়েছিলাম ঠিকই, কারণ আমার বাড়ি ওই দিকেই। আমি তাদের বিষয়টি দেখতে বলেছিলাম। বাড়িওয়ালাদেরও জানিয়ে দিয়েছি এটা অবৈধ লাইন, কয়েক দিন পর অফিস এসে কেটে দিলে আমাকে কিছু বলতে পারবেন না। এছাড়া এতে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।” অবৈধ সংযোগ দেওয়ার সময় উপস্থিত থেকেও কেন বাধা দেননি; এমন প্রশ্নে সবুজ বলেন, “এখানে স্থানীয় সমাজকল্যাণ কমিটি, স্থানীয় সংসদ সদস্য ও ছাত্রদল সভাপতি সবাই সব জানেন। আমি একা কীভাবে বাধা দেব?”

ঠিকাদার জাহাঙ্গীর হোসেন মুক্তকণ্ঠের কাছে টাকা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, “আমি লাইনের কাজ করি। প্রতি ফুট পাইপের দাম ২১০ টাকা, তার ওপর শ্রমিক খরচ আছে। টাকা না নিয়ে কীভাবে করব?” অবৈধ লাইনের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “আমি তো নতুন করে গ্যাস দিচ্ছি না। সবার বাড়িতে ৩০ বছরের পুরোনো লাইন রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে লিকেজের কারণে সবাই ঠিকমতো গ্যাস পায় না। তাই বাড়িওয়ালাদের অনুরোধেই কেবল নতুন লাইন বসিয়ে দিচ্ছি। এটা স্থানীয় সবাই জানে। আপনারা এসে দেখা করে যোগাযোগ রাইখেন।”

এ বিষয়ে তিতাস গ্যাসের প্রশাসন বিভাগের মহাব্যবস্থাপক হাসান আহম্মদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “আমাদের কাছে এখন পর্যন্ত কেউ এ ধরনের অভিযোগ করেনি। সুনির্দিষ্টভাবে দাপ্তরিক অভিযোগ পেলে তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এমনকি আমাদের অফিসের কেউ এতে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধেও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”