নিজ দেশে ফেরার অপেক্ষায় কক্সবাজারের উখিয়ার লম্বাশিয়া আশ্রয় শিবিরে নয় বছর কেটে গেল ৫৫ বছর বয়সী আব্দুর রশিদের। এই দীর্ঘ সময়ে বদলে গেছে তার ফেলে আসা রাখাইন রাজ্যের চিত্র। কবে ফিরবেন সেই নিশ্চয়তা না থাকলেও স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে কোনো একদিন দেশে ফিরবেন সেই স্বপ্নে দিন কাটাচ্ছেন তিনি।

রশিদের মতো একই স্বপ্ন দেখেন উখিয়া টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয়শিবিরে বসবাসকারী লাখ-লাখ রোহিঙ্গা। যদিও নয় বছরে নানা উদ্যোগে কোনো রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসন হয়নি। সম্প্রতি রোহিঙ্গাদের নিয়ে নতুন বিতর্ক উস্কে দিয়েছে মিয়ানমার সরকার। ফলে প্রশ্ন উঠেছে–দেশটির বিতর্কিত অবস্থানে ফের কোথায় গিয়ে ঠেকছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন।

রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশমুখী ঢলের নয় বছর পূর্ণ হলো মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট)। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারে সামরিক বাহিনীর অভিযান শুরু হলে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় লাখ-লাখ রোহিঙ্গা।

বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ দাবি করে গত ১৫ আগস্ট মিয়ানমার সরকার এক বিবৃতি দেয়। এতে বলা হয়, সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আরসর হুমকি ও আক্রমণের মুখে স্থানীয় জাতিগত লোকজন অন্যান্য শহর ও গ্রামে পালিয়ে যায়। আরসা সন্ত্রাসী হামলার আগে রাখাইন রাজ্যের বুথিডং, মংডো এবং রাথেডং টাউনশিপে সাত লাখ ৪০ হাজারেরও বেশি ‘বাঙালি’ বসবাস করত। এই ঘটনার পর দুই লাখের বেশি ‘বাঙালি’ এই অঞ্চলে রয়ে যায় এবং ৫ লাখ ৪০ হাজারেও বেশি ‘বাঙালি’ বাংলাদেশে পালিয়ে যায়।

দেশটির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যাচাই করা ব্যক্তিদের মধ্যে তিন লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে চার হাজার ২৪১ জনকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত’। এক লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে দাবি করেছে মিয়ানমার।

এ বিষয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, মিয়ানমার নতুন বিতর্ক তৈরি করে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করতে চাইছে। ‘বাঙালি’ বিতর্কে বাংলাদেশের জড়ানো ঠিক হবে না। বাংলাদেশের অবস্থান হওয়া উচিত–মিয়ানমারকে তার দেশের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে হবে।

অভিবাসন ও শরণার্থী বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, মিয়ানমারের বক্তব্যকে তাদের কূটনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে। ২০১৭ সাল থেকে তারা বিভিন্ন সরকারি প্ল্যাটফর্মে নিজেদের ভাষ্য প্রকাশ করে আসছে। তবে বর্তমান বক্তব্যে অসঙ্গতি রয়েছে। একদিকে তারা সংকটকে দ্বিপক্ষীয় বলছে, অন্যদিকে বাংলাদেশকে সরাসরি আগে জানাচ্ছে না। আবার রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ পরিচয় দিয়ে তাদের নাগরিকত্ব অস্বীকারের চেষ্টা করছে।

কী চাইছে মিয়ানমার

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের সর্বশেষ হালনাগাদ করা তথ্যানুযায়ী, ৩১ জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গার মধ্যে নিবন্ধিত সংখ্যা ১২ লাখ ২ হাজার ২৪।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান বলেন, ২০১৮ সালে বাংলাদেশ প্রায় ৮ লাখ ২৮ হাজার রোহিঙ্গার তথ্য মিয়ানমারের কাছে হস্তান্তর করেছিল। জাতিসংঘের সঙ্গে যৌথ যাচাই প্রক্রিয়ায় পরিবারের সদস্য ও ‘ফ্যামিলি ট্রির’ তথ্যের ভিত্তিতে এসব ডেটা তৈরি করা হয়।

তিনি বলেন, আট বছরে দেড় লাখের বেশি রোহিঙ্গা নতুন করে বাংলাদেশে এসেছে। ক্যাম্পে প্রতিবছর নতুন শিশু জন্ম নিচ্ছে এবং নতুন পরিবার গড়ে উঠছে। তাই ২০১৮ সালের তথ্য দিয়ে ২০২৬ সালের বাস্তবতা বিচার করা যাবে না। প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে হালনাগাদ তথ্য বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

এ বিষয়ে ‘ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গা’ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মো. সোয়েব মুক্তকণ্ঠকে বলেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে জাতিসংঘের মাধ্যমে বাংলাদেশে থাকা রোহিঙ্গাদের নিবন্ধন করা হয়েছে। মিয়ানমার এসব তথ্য অস্বীকার করে মূলত জাতিসংঘের তথ্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ আট লাখের বেশি রোহিঙ্গার তালিকা দিলেও প্রায় নয় বছরে মিয়ানমার মাত্র প্রায় চার লাখের তথ্য যাচাই করেছে। এতে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে মিয়ানমারের প্রকৃত সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বরং মিয়ানমারে থাকা অবশিষ্ট রোহিঙ্গাদেরও বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তৈরি হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি চাপ

রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার নয় বছরের এই দীর্ঘ সময়ে বদলে গেছে উখিয়া-টেকনাফের চিত্র। গড়ে উঠেছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ আশ্রয়শিবির। বিশাল সংখ্যক মানুষের বসবাসের কারণে স্থানীয়দের জীবন-জীবিকা, পরিবেশ, অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও সামাজিক কাঠামোর ওপর তৈরি হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি চাপ।

২০১৭ সালে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসার সময় মানবিক কারণে নিজের বাড়ির আঙিনায় তাদের থাকার জায়গা করে দিয়েছিলেন কুতুপালং লম্বাশিয়া গ্রামের বাসিন্দা সালেহা বেগম। নয় বছর পর তার নিজের বাড়ির চারপাশই ঘিরে গড়ে উঠেছে রোহিঙ্গা বসতি।

সালেহা বেগম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ক্ষেত-খামার ও পানের বরজের আয় দিয়ে আমাদের সংসার চলত। কিন্তু রোহিঙ্গারা আসার পর থেকে আমরা আর আগের মতো ক্ষেত-খামার বা পানের বরজ করতে পারছি না। আমাদের এলাকায় এখন স্থানীয় বাসিন্দা মাত্র পাঁচটি পরিবার। অথচ রোহিঙ্গা পরিবারের সংখ্যা তিন হাজারের বেশি। আমার নিজের ভিটেতে একশর বেশি রোহিঙ্গা পরিবার বসবাস করছে। ফলে চাষাবাদ করার মতো কোনো জায়গা খালি নেই।

বালুখালীর বাসিন্দা মোহাম্মদ রায়হান বলেন, রোহিঙ্গারা আসার আগে দিনমজুরি করতে গেলে সহজেই কাজ পাওয়া যেত। এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। রোহিঙ্গারা কম মজুরিতে কাজ করায় স্থানীয় শ্রমিকদের কাজের সুযোগ কমেছে। বর্তমানে ৫০০ টাকা মজুরিতেও রোহিঙ্গারা কাজ করছেন। ফলে স্থানীয় বাঙালিরা অনেক সময় কাজ পাচ্ছেন না।

লম্বাশিয়া এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ কামাল বলেন, উখিয়া-টেকনাফে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার বসবাসের কারণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে। কাজের সুযোগ কমে যাওয়া, দ্রব্যমূল্যের চাপ ও নানা সংকটে স্থানীয় মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হেলাল উদ্দিন বলেন, বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার পর স্থানীয় মানুষ ভেবেছিলেন, দুই-তিন বছরের মধ্যে তারা নিজ দেশে ফিরে যাবেন। কিন্তু প্রায় নয় বছর পেরিয়ে গেলেও প্রত্যাবাসনের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। দীর্ঘদিন রোহিঙ্গাদের অবস্থানের কারণে পরিবেশগত বিপর্যয়, অর্থনৈতিক চাপ ও নিরাপত্তাজনিত সমস্যায় স্থানীয়রা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও রোহিঙ্গা বিষয়ক গবেষক ড. রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশ সরকারকে প্রতিবছর প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়। প্রশাসন, নিরাপত্তা, অবকাঠামো ও পরিবেশ সংরক্ষণসহ বিভিন্ন খাতে সরকারকে বিনিয়োগ করতে হচ্ছে। ফলে সরকারের ওপর বিশাল চাপ তৈরি হচ্ছে। প্রত্যাবাসন না হলে সামনে এই সংকট আরও বাড়বে।

সংকুচিত হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা

রোহিঙ্গাদের সংখ্যা দিন দিন বাড়লেও অর্থায়ন কমে যাওয়ায় স্বাস্থ্যসেবা সংকুচিত হচ্ছে। শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, ২০২১ সালে রোহিঙ্গা জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে আট লাখ থাকাকালে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ছিল প্রায় ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার। ২০২৫ সালে রোহিঙ্গা জনসংখ্যা প্রায় ১২ লাখে পৌঁছালেও বরাদ্দ কমে ৪ কোটি ৯৯ লাখ ডলারে নেমেছে। অর্থাৎ এ সময়ে রোহিঙ্গা জনসংখ্যা ৪০ শতাংশের বেশি বাড়লেও স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়ন কমেছে ৩৯ শতাংশ।

আরআরআরসি কার্যালয়ের স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১১৮টি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ও ৪০টি পুষ্টিকেন্দ্র রয়েছে। ছয়টি সংস্থার পরিচালনায় ছয়টি ফিল্ড হাসপাতাল সপ্তাহে সাত দিন ২৪ ঘণ্টা সেবা দিচ্ছে। এ ছাড়া ১৭টি সংস্থার পরিচালনায় ৪৬টি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, ৪০টি সংস্থার পরিচালনায় ৫৯টি হেলথ পোস্ট এবং তিনটি ডায়রিয়া চিকিৎসাকেন্দ্র রয়েছে।

২০২১ সালে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১৬৮টি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ও ৫৯টি পুষ্টিকেন্দ্র ছিল। অর্থাৎ চার বছরের ব্যবধানে স্বাস্থ্যসেবার পরিসর কমেছে। শুধু ২০২৪ সালের পর তহবিল সংকটে ১৬টি হেলথ পোস্ট ও ছয়টি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র বন্ধ হয়েছে। চলতি মাসে আরও তিনটি হেলথ পোস্ট বন্ধ হওয়ার কথা রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সাড়ে তিন হাজারের বেশি স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩৯৫ জন চিকিৎসক, ৩৮০ জন নার্স, ২২১ জন প্যারামেডিক ও ২৯২ জন মিডওয়াইফ।

২০২১ সালে ক্যাম্পে ৫ হাজার ২০০-এর বেশি স্বাস্থ্যকর্মী ছিলেন। তাঁদের মধ্যে চিকিৎসক ছিলেন ৪৮০ জন, নার্স ৪৮৮, প্যারামেডিক ৫০২ এবং মিডওয়াইফ ৫৬৭ জন। অর্থাৎ চার বছরের ব্যবধানে স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা কমেছে প্রায় ৩২ শতাংশ।

জড়িয়ে পড়েছে অপরাধে

রোহিঙ্গারা ক্যাম্পে দীর্ঘ দিনের অবস্থানের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যানুযায়ী, গত নয় বছরে ক্যাম্পে ২৮৮টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২৭৭টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে প্রায় দুই হাজার রোহিঙ্গাকে।

মাদকসংক্রান্ত প্রায় সাড়ে তিন হাজার মামলায় ৫ হাজার ৯৩৫ জন, অস্ত্র ও ডাকাতির ১৬৫ মামলায় ৩১২ জন, ধর্ষণ ও নারী-শিশু নির্যাতনের ৩৫২ মামলায় ৫২১ জন, অপহরণের ৩০৬ মামলায় ৩৫৩ জন এবং মানবপাচারের চার শতাধিক মামলায় ৮৭৯ জন রোহিঙ্গাকে আসামি করা হয়েছে। অন্যান্য আইনে আরও শতাধিক মামলা হয়েছে।

পালংখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ক্যাম্পে এখনও এক ডজনের বেশি অপরাধী চক্র সক্রিয়। এসব চক্রের বেশির ভাগই সশস্ত্র। ক্যাম্পে অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান জোরদার করতে হবে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বে থাকা উখিয়াস্থ ১৪ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মো. সিরাজ আমিন বলেন, প্রায় ১৫ লাখ মানুষের মধ্যে অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণ ও চিহ্নিত করা কঠিন। তবে ক্যাম্পের বর্তমান পরিস্থিতি আগের তুলনায় অনেক ভালো।

সমাধানের চ্যালেঞ্জ

রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরার যে আকুতি তা আশ্রয় শিবিরে কোনো বিদেশি প্রতিনিধি তাদের পরিস্থিতি দেখার জন্য এলে ফুটে উঠে। সম্প্রতি একটি দেশের প্রতিনিধি উখিয়ার আশ্রয় শিবির পরিদর্শন করার সময় রোহিঙ্গারা প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে ফেরার আকুতি জানিয়েছিল। তাদের প্ল্যাকার্ডে থাকা লেখার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল–‘আরাকান আমাদের বাড়ি, ফিরে যাওয়া আমাদের অধিকার’।

বর্তমানে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত রাখাইনের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে আরাকান আর্মি। প্রত্যাবাসনের নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার ও জমি-জমার নিশ্চয়তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন। যদিও বাংলাদেশ সরকার সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে প্রত্যাবাসনে জোর দিচ্ছে বলে জানা যাচ্ছে।

উখিয়া ক্যাম্প-৩-এ অশ্রিত রোহিঙ্গা আক্তার হোসেন বলেন, মিয়ানমার সরকার যদি আমাদের নাগরিকত্ব ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করে, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয় এবং হারিয়ে যাওয়া ঘরবাড়ি, ভিটেমাটি ও জমিজমা ফিরিয়ে দেয়, তাহলে আমরা কোনো শর্ত ছাড়াই এখনই স্বদেশে ফিরে যেতে প্রস্তুত।

আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জুবায়ের বলেন, দেখতে দেখতে নয় বছর হয়ে গেছে। মিয়ানমারের জান্তা সরকারের নির্যাতনের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে হয়েছে। দীর্ঘ এই সময়ে একজন রোহিঙ্গাও নিরাপদে নিজ দেশে ফিরতে পারেনি। নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা হলে আমরা ফিরতে প্রস্তুত।

সম্প্রতি ‘তিন লাখ’ রোহিঙ্গার আশ্রয় স্বীকার করার বিষয় সামনে এনে ‘ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গা’ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মো. রফিক বলেন, মিয়ানমার প্রায় চার লাখের তথ্য যাচাই করে তিন লাখকে স্বীকার করেছে। বাকি রোহিঙ্গাদের কোন মানদণ্ডে বাদ দেওয়া হয়েছে, তা মিয়ানমারকে স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করতে হবে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

সংগঠনের আরেক সদস্য মো. সোয়েব বলেন, মিয়ানমার প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গাকে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে স্বীকার করার কথা বলছে। কিন্তু আরাকানের পুরো নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে নেই। তাহলে সেখানে ফেরত পাঠানো রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার কীভাবে নিশ্চিত হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

একই মত দিয়েছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, মিয়ানমারের সামরিক সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রত্যাবাসন আলোচনা চললেও রাখাইনের বাস্তব নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তনকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কারণ, রোহিঙ্গাদের সম্ভাব্য প্রত্যাবাসন এলাকায় এখন আরাকান আর্মির প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। যদিও আরাকান আর্মি বেশি দিন টিকে থাকতে পারবে বলে মনে হয় না।