ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্তের ইছামতী নদী থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল হাশমত মোহাম্মাদি নামে আফগাস্তানের এক নাগরিকের মরদেহ। গত ১৩ এপ্রিল তার মরদেহ উদ্ধারের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিচয় শনাক্ত করতে না পারায় বেওয়ারিশ হিসেবে মরদেহটি দাফন করা। মরদেহটি হাশমত মোহাম্মাদির বলে পরে বিভিন্ন সূত্রে নিশ্চিত হন তার পরিবারের সদস্যরা। সেই নিশ্চয়তার সূত্র ধরে তার ভাই ইমাল মোহাম্মদি বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। তিনি আফগানিস্তান থেকে এসে হাশমত মোহাম্মাদির মরদেহ দেশে নেওয়ার জন্য ঝিনাইদহে অপেক্ষায় রয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মরদেহ উত্তোলন করে আফগিস্তানে পাঠানোর জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় অনাপত্তি ও ব্যবস্থা নেওয়া নির্দেশ হয়েছিল। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা না থাকায় কবর থেকে মরদেহ উত্তোলনের প্রক্রিয়া আটকে আছে।

হাশমত মোহাম্মাদির বাংলাদেশি আইনজীবী মাহমুদুল হাসান মাসুম মুক্তকণ্ঠকে জানান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বহিরাগমন শাখা-১ থেকে গত ১১ আগস্ট পররাষ্ট্র সচিব, ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার বরাবর চিঠি দেওয়া হয়েছে। ওই চিঠিতে মরদেহ কবর থেকে উত্তোলন করে আফগানিস্তানে পাঠানোর বিষয়ে অনাপত্তি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, হাশমত মোহাম্মাদির ব্যক্তি যেহেতু বিদেশি নাগরিক, তাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিঠির পাশাপাশি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দিষ্ট আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা প্রয়োজন। সেই নির্দেশনা না আসায় মরদেহ উত্তোলন ও হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করা যাচ্ছে না।

ঝিনাইদহে কীভাবে আফগান নাগরিকের লাশ

গত ১৩ এপ্রিল ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার পলিয়ানপুর সীমান্তের ইছামতী নদী থেকে একটি অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহটি ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরিচয় জানার জন্য তার আঙুলের ছাপ নেয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। জাতীয় পরিচয়পত্রের ডাটাবেজে তার কোনো তথ্য পায়নি পিবিআই। পরে ১৪ এপ্রিল ঝিনাইদহ আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে মরদেহটি স্থানীয় গোরস্থানে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়।

বিষয়টি নিয়ে তখন অনুসন্ধান করতে গিয়ে মুক্তকণ্ঠ জানতে খোঁজ পেয়েছিল–অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধার হওয়া ব্যক্তি আফগানিস্তানের নাগরিক হাশমত মোহাম্মাদি। তিনি আফগানিস্তানের কাবুলের পাঞ্জশির এলাকার কুন্ডুস গ্রামের ইয়াসিন মোহাম্মদী ও সকিনা মোহাম্মদী দম্পতির ছেলে। তিনি আফগানিস্তানের নাগরিক হলেও ইতালির পাসপোর্টধারী ছিলেন। দাফনের ১১ দিন পর ২২ এপ্রিল তার ভাই মোহাম্মদ ইরা পরিচয় নিশ্চিত করেছেন।

তখন মহেশপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মেহেদী হাসান বলেছিলেন, মরদেহটি উদ্ধার করে সুরতহাল প্রস্তুত করার সময় আমাদের ধারণা হয়েছিল এটি কোনো বিদেশি নাগরিকের হতে পারে। ওই নাগরিকের ভাই ও ভাবি আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা যায়, মরদেহ উদ্ধারের পর হাশমত মোহাম্মাদির ছবি বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। ছবিটি নজরে আসে তার ভাই মোহাম্মদ ইরার। তিনি যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী। সেখান থেকে যোগাযোগ করেন মো. আহসানের সঙ্গে। তার বাড়ি বগুড়া জেলায়। মোহাম্মদ ইরা ও মো. আহসান পূর্বপরিচিত।

আহসান ধারণা করেন, মোহাম্মদ ইরার ভাই হাশমত মোহাম্মাদি যশোরের চৌগাছা সীমান্তে হত্যার শিকার হয়েছেন। এজন্য তিনি যোগাযোগ করেন চৌগাছা হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. সাইদুর রহমান ইমনের সঙ্গে। এই চিকিৎসক আহসানকে স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী রহিদুলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। তারা বিভিন্ন মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে নিশ্চিত হন, ঝিনাইদহ সীমান্ত এলাকায় উদ্ধার হওয়া মরদেহটি মোহাম্মদ ইরার ভাই হাশমত মোহাম্মাদির।

পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর হাশমত মোহাম্মাদির ভাই মোহাম্মদ ইরা যোগাযোগ করেন বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সঙ্গে। আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে দেওয়া তার তথ্যমতে–হাশমত মোহাম্মাদি ইতালির পাসপোর্ট নিয়ে ভারতে যাতায়াত করতেন। সেখান থেকে বিভিন্ন আংটির পাথর ও রত্ন নিয়ে এসে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিক্রি করতেন।

পাঁচ বছর আগে ভারতীয় কয়েকজন পার্টনারের সঙ্গে ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বে মারামারি হয়। এই ঘটনায় মামলা হলে ভারতীয় পুলিশ অন্যদের সঙ্গে হাশমতকেও গ্রেপ্তার করে। পাঁচ বছর কারাভোগের পর ভারতীয় আদালত হাশমতকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেন। কিন্তু দেশে ফেরার কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।

মোহাম্মদ ইরা আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে জানান, জেল থেকে বের হয়ে ইতালি ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা করতে থাকেন হাশমত মোহাম্মদি। তার সঙ্গে পরিচয় হয় বাংলাদেশ ও ভারতের দুই মানবপাচারকারীর সঙ্গে। তাদের একজন যশোর এলাকার মো. মাসুম। চক্রের আরেক সদস্য ভারতীয় নাগরিকের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ভারতীয় সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশে গেলে ইতালি যাওয়া যাবে বলে নিশ্চয়তা দেন তারা।

দুই মানবপাচারকারীর খপ্পরে পড়ে গত ১০ এপ্রিল বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা দেন হাশমত। এর মধ্যে ১১-১২ এপ্রিলের দিকে তার যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ভাই ইরাকে ফোনে জানান, সামনে একটা নদী (ইছামতি) আছে। এটা পার হলেই তিনি বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারবেন এবং নিরাপদ হয়ে যাবেন।

এ সময় মানবপাচারকারী দুজনের সঙ্গেও ইরার কথা হয়। কিছু সময় হাশমতের সঙ্গে ইরার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ইরা তথন মানবপাচারকারীদের ফোনও বন্ধ পান। তবে কয়েক দিন পর মানবপাচারকারীদের সঙ্গে ইরার আবার যোগাযোগ হয়। ইরাকে দুইটি ছবি পাঠিয়ে জানানো হয়, তার ভাই মারা গেছে এবং বাংলাদেশের পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়। এরপর থেকে মানবপাচারকারীদের ফোন বন্ধ রয়েছে।

এ বিষয়ে মহেশপুর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মহেশপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) টিপু সুলতান বলেছিলেন, গত ২২ এপ্রিল আহসান নামে একজনের মাধ্যমে মোহাম্মাদ ইরার সঙ্গে কথা হয়। মরদেহটি ইরার ভাইয়ের বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছি। তার আরেক ভাই লন্ডন প্রবাসী। তিনি বাংলাদেশে আসার জন্য ভিসাসহ অন্যান্য কাগজপত্র প্রস্তুত করছেন।

মরদেহ দেশে নিতে অপেক্ষা

সূত্র বলছে, হাশমত মোহাম্মদির মরদেহ নিতে লন্ডনপ্রবাসী ভাই মীর ওয়াইস মোহাম্মদি বাংলাদেশে এসেছিলেন। তবে তিনি আইনি জটিলতায় ব্যর্থ হয়ে ফিরে যান। তাদের আরেক ভাই ইমাল মোহাম্মদি আফগানিস্তান থেকে ডিএনএ পরীক্ষার নথিপত্র, পরিচয়পত্র, মন্ত্রণালয়ের চিঠিসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে বর্তমানে ঝিনাইদহে করছেন।

ইমাল মোহাম্মদির সঙ্গে কথা হয় মুক্তকণ্ঠের। তিনি বলেন, ‘ময়নাতদন্তের রিপোর্টে আমার ভাই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আমরা শুধু চাই, ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী তার মরদেহ নিজ দেশে নিয়ে দাফন করতে। কিন্তু এভাবে এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে ঘুরে বেড়ানো আমাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টের।’

আইনজীবী মাহমুদুল হাসান মাসুম বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে অনাপত্তি দেওয়া হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার অপেক্ষা করছি। মানবিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে বলে আমরা আশা করছি।

এ বিষয়ে ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক নোমান হোসেন বলেন, আমরা সব ধরনের সহযোগিতার জন্য প্রস্তুত আছি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিঠি পাওয়া গেলে মরদেহ হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।