কলকাতার ঐতিহ্যবাহী যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে গত বুধবার রাতে বিজেপির ছাত্র সংগঠন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (এবিভিপি) তাণ্ডব চালিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, একদল বহিরাগতকে সঙ্গে নিয়ে গভীর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটক দিয়ে জোরপূর্বক প্রবেশ করে এবিভিপির নেতাকর্মীরা। এ সময় তারা বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের পোস্টার ও ব্যানার ছিঁড়ে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং ক্যাম্পাসে ভাঙচুর চালায়। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশদ্বারে স্থাপিত প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী নন্দলাল বসুর আঁকা মূল প্রতীকটিও ভেঙে ফেলা হয়।
ঘটনার পরপরই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বা বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ঘটনার প্রায় ৩৭ ঘণ্টা পর যাদবপুর থানায় একটি এফআইআর দায়ের করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তবে ঘটনার ছয় দিন পেরিয়ে গেলেও পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। ভিডিও ফুটেজে হামলাকারীদের স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা গেলেও পুলিশের এই নিষ্ক্রিয়তায় বামপন্থী ছাত্র-যুব সংগঠনসহ সিপিএম, কংগ্রেস ও তৃণমূল কংগ্রেসের নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
ভারতের অন্যতম সেরা এবং মূলত বামপন্থী ভাবাপন্ন এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হলেও এর নিয়ন্ত্রণে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে বামপন্থী ছাত্র ও যুব সমাজ। এই তাণ্ডবের প্রতিবাদে গতকাল সোমবার কলকাতায় বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে বামপন্থী ছাত্র ও যুব সংগঠনগুলো। এসএফআই, ডিওয়াইএফআই, ডিএসও, এআইডিএসও ও এআইএসএসহ বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে আয়োজিত মিছিলটি শিয়ালদহ থেকে শুরু হয়ে কলেজ স্ট্রিটে গিয়ে শেষ হয়। মিছিল থেকে অবিলম্বে ঘটনার সঙ্গে জড়িত এবিভিপি নেতাদের গ্রেপ্তারের দাবি জানানো হয় এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।
একই দিনে পাল্টা প্রতিবাদ মিছিল করেছে বিজেপিপন্থী বুদ্ধিজীবীদের সংগঠন ‘সচেতন নাগরিক ও প্রবুদ্ধ সমাজ’। ‘শিক্ষা বাঁচাও, বিশ্ববিদ্যালয় বাঁচাও’ স্লোগান নিয়ে দক্ষিণ কলকাতার ঢাকুরিয়া থেকে শুরু হওয়া মিছিলটি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪ নম্বর গেট হয়ে এইট-বি বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে শেষ হয়। মিছিলকারীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘কমিউনিস্ট চক্রান্ত’ বন্ধ করে শান্তি ও স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবি জানান। মিছিল চলাকালে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪ নম্বর গেট এলাকায় পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর নিরাপত্তা জোরদার করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য বুদ্ধদেব সাহু মামলার দেরির বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, “আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে তাণ্ডবের ঘটনায় মামলা দিতে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। তবে আমরা আশা করছি পুলিশ এ ব্যাপারে দ্রুত যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।” এদিকে যাদবপুরের এই সহিংসতার ঘটনা তদন্তে নেতাজি সুভাষ মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য শুভংকর সরকারের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তিনি সেই দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতেও জোর বিতর্ক শুরু হয়েছে। রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, “যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ওরা তাণ্ডব চালিয়েছে। এখন মানুষ বুঝে গেছে বিজেপি কেমন দল।”
পাল্টা বক্তব্যে রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “ওরা বিশ্ববিদ্যালয়ে সিসিটিভি বসাতে দেয় না। যারা ২৬ জানুয়ারি প্রজাতন্ত্র দিবস আর ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দিবস পালন করতে দেয় না, এবার এখানেই ভারতীয় সংস্কৃতির জাগরণ ঘটবে।”