বগুড়া জেলার ৮১৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষক নেই। প্রায় এক দশক ধরে এসব বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় সহকারী শিক্ষকদের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এতে প্রশাসনিক কাজে জটিলতা তৈরি হচ্ছে এবং শ্রেণিকক্ষে স্বাভাবিক পাঠদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষক ও অভিভাবকেরা।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় মোট এক হাজার ৬০১টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৮১৬টিতে প্রধান শিক্ষক নেই। সবচেয়ে বেশি সংকট গাবতলী উপজেলায়, যেখানে ১৬৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ১০৪টিতে প্রধান শিক্ষক নেই।

অন্য উপজেলাগুলোর মধ্যে আদমদীঘিতে ৫৯টি, কাহালুতে ৬৪টি, দুপচাঁচিয়ায় ২৪টি, ধুনটে ৯৮টি, নন্দীগ্রামে ৬২টি, বগুড়া সদরে ৩৪টি, শিবগঞ্জে ৭৯টি, শেরপুরে ৭৩টি, সারিয়াকান্দিতে ৯৮টি, সোনাতলায় ৭১টি এবং শাজাহানপুরে ৫০টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে।

শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সহকারী শিক্ষকদের নিয়মিত দাপ্তরিক কাজ, সভা-সেমিনার, প্রতিবেদন তৈরি ও সরকারি নির্দেশনাবলী বাস্তবায়নে অধিকাংশ সময় দিতে হয়। ফলে তাদের পক্ষে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। বিশেষ করে ছোট আকারের বিদ্যালয়গুলোতে এই সংকট আরও তীব্র হয়ে উঠেছে।

অভিভাবকদের দাবি, মামলার নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আর দীর্ঘ সময় না নিয়ে দ্রুত বিকল্প কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তাদের মতে, প্রধান শিক্ষক না থাকায় বিদ্যালয়ের সামগ্রিক শিক্ষার মানও চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই শূন্যপদ পূরণ করে নিয়মিত পাঠদান ও একাডেমিক তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি।

গাবতলী উপজেলার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক অভিভাবক বলেন, "প্রধান শিক্ষক না থাকায় বিদ্যালয়ে নিয়মিত তদারকি ঠিকমতো হয় কি না, তা নিয়ে আমাদের মনে সবসময় উদ্বেগ থাকে। ভারপ্রাপ্ত শিক্ষকের ওপর একই সঙ্গে ক্লাস নেওয়া ও অফিসের কাজ করার দ্বিবিধ চাপ থাকে। এতে করে শেষ পর্যন্ত আমাদের সন্তানদের পড়াশোনারই ক্ষতি হচ্ছে।"

আরেক অভিভাবক বলেন, "প্রাথমিক স্কুলেই শিশুদের শিক্ষার মুল ভিত্তি তৈরি হয়। সেখানে যদি বছরের পর বছর প্রধান শিক্ষক না থাকেন, তবে বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ ও শৃঙ্খলা দুটোই নষ্ট হয়। সরকার দ্রুত এই পদগুলো পূরণ করবে—এটাই আমাদের একমাত্র প্রত্যাশা।"

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সহকারী শিক্ষক জানান, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক অনেক জটিল দাপ্তরিক কাজ সামলাতে হয়। এর পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষের নিয়মিত পাঠদানও চালিয়ে নিতে হয়। ফলে কাজের মাত্রাতিরিক্ত চাপ তৈরি হয় এবং শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় সময় বের করা কঠিন হয়ে পড়ে।

আরেক শিক্ষক বলেন, "প্রধান শিক্ষক থাকলে প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক ও প্রশাসনিক বিষয়গুলো আলাদাভাবে দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করা যায়। কিন্তু ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে থাকলে দুটি ভিন্ন ধরনের কাজই একই ব্যক্তিকে সামলাতে হয়। এতে শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত মানসিক ও শারীরিক চাপ পড়ে।"

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্যমতে, ২০১৬ সাল থেকে এসব বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদগুলো পর্যায়ক্রমে শূন্য হতে শুরু করে। সাধারণত সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতি বা সরাসরি পদায়নের মাধ্যমে প্রধান শিক্ষকের পদ পূরণ করা হয়ে থাকে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সেই প্রক্রিয়া পুরোপুরি বন্ধ থাকায় প্রতিবছর শূন্য পদের সংখ্যা কেবল বাড়ছেই।

বগুড়া জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. রেজোয়ান হোসেন বলেন, "২০১৩-১৪ সালের দিকে শিক্ষকদের জ্যেষ্ঠতা নিয়ে একটি মামলা দায়ের হয়। মূলত ওই মামলার কারণেই প্রধান শিক্ষক পদে নতুন পদোন্নতি ও পদায়ন বন্ধ রয়েছে। প্রায় এক যুগ ধরে ঝুলে থাকা এই মামলার জটিলতায় এমন অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।" তিনি আরও জানান, "কয়েক দিন আগেই আদালতে মামলাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ শুনানি হয়েছে। আমরা আশাবাদী, খুব শিগগিরই এই আইনি জটিলতা কেটে যাবে। জটিলতা কাটলেই শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণ করা সম্ভব হবে এবং বিদ্যালয়গুলোতে আবারও স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ ফিরে আসবে।"