কেন সবাই ‘স্পাইডার-ম্যান’কে এত ভালোবাসে? ২০২১ সালের শেষ দিকে যখন ‘স্পাইডার-ম্যান: নো ওয়ে হোম’ মুক্তি পেল, তখন যুক্তরাষ্ট্রেই ছবিটি আয় করেছিল ৮১৪ মিলিয়ন ডলার। সেই সাফল্য যেন সুপারহিরো ছবিকে ঘিরে দর্শকের একঘেয়েমির ধারণাকেই উড়িয়ে দিয়েছিল। ছবিটির অভাবনীয় সাফল্যের কারণটা ছিল খুবই পরিষ্কার, সেখানে একসঙ্গে ছিলেন তিন ‘স্পাইডার-ম্যান’—টম হল্যান্ড, অ্যান্ড্রু গারফিল্ড ও আসল ‘স্পাইডার-ম্যান’খ্যাত টোবি ম্যাগুইরে। যেন মাকড়সার জাল-ছাপা পোশাক পরা এক রাজপরিবারের পুনর্মিলন!

তবে এই তিন ‘স্পাইডার-ম্যান’ একসঙ্গে হাজির হওয়ার পেছনে ছিল বেশ কিছু ঘটনার নিখুঁত সমাপতন। এর দুই বছর আগে মুক্তি পেয়েছিল ‘স্পাইডার-ম্যান: ইনটু দ্য স্পাইডার-ভার্স’, যা অনেক সমালোচকের বিচারে ‘নো ওয়ে হোম’-এর চেয়েও অসাধারণ ছবি। কমিক বই থেকে গভীরভাবে অনুপ্রেরণা নিয়ে ছবিটি ‘স্পাইডার-ম্যান’–এর গল্পে মাল্টিভার্সের উন্মাদনাকে দারুণভাবে যুক্ত করেছিল। ‘নো ওয়ে হোম’-এর নির্মাতারা যেন বলেছিলেন, ‘আমরাও সেটাই করব, তবে আরও বেশি চমক, আরও বেশি তারকা আর যত বেশি সম্ভব স্পাইডার-ম্যানকে একই জালে ঝুলিয়ে!’ তখন অনেকের মনে হয়েছিল, এটি একবারের জন্যই সম্ভব।

কিন্তু ‘স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে’ আবারও সেই হিসাব বদলে দিয়েছে। ছবিটি নিখুঁতভাবে নির্মিত একটি জমজমাট অ্যাডভেঞ্চারের বেশি কিছু নয়, কমও নয়। এখানে টম হল্যান্ডের পিটার পার্কার ও তার প্রেমিকা এমজে (জেনডায়া) একে অপরের সঙ্গে প্রায় কথাই বলতে পারে না। কারণ, এমজে আর জানে না সে কে। কেউ এমন দাবিও করছে না যে ‘ব্র্যান্ড নিউ ডে’ ‘স্পাইডার-ম্যান ২’-এর মতো অসাধারণ। অথচ তারপরও ছবিটি এখন সম্ভবত সর্বকালের সর্বোচ্চ আয়কারী সিনেমা হতে যাচ্ছে। অন্তত পরবর্তী ‘স্পাইডার-ম্যান’ ছবি মুক্তি না পাওয়া পর্যন্ত।

.

তাহলে প্রশ্ন হলো, কেন এখনো ‘স্পাইডার-ম্যান’? ১৯৬২ সালে আত্মপ্রকাশের পর থেকেই ‘স্পাইডার-ম্যান’ বিপুল জনপ্রিয়। চরিত্রটি প্রকাশের অনুমোদন পেতেও অবশ্য স্ট্যান লিকে প্রকাশকের সংশয় মোকাবিলা করতে হয়েছিল।

তবে গত ৫০ বছরের মার্কিন কমিক-বুক সিনেমার ইতিহাসের দিকে তাকালে অস্বীকার করার উপায় নেই, দীর্ঘদিনের রাজত্ব ছিল মূলত ‘সুপারম্যান’ ও ‘ব্যাটম্যান’–এর।
ক্রিস্টোফার রিভের অভিনয়ে প্রথম দুই ‘সুপারম্যান’ সিনেমা এখনো অনেকের কাছে, পর্দায় সুপারহিরো চরিত্রের সবচেয়ে নিখুঁত উপস্থাপনাগুলোর মধ্যে পড়ে। সেই দুই ছবি আজও একধরনের পৌরাণিক মর্যাদা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

এরপর কয়েক দশক ধরে কমিক-বুক সিনেমার জগতে রাজত্ব করেছে ‘ব্যাটম্যান’। কারণ, ‘ব্যাটম্যান’ই একমাত্র সুপারহিরো, যার কোনো অতিমানবীয় ক্ষমতা নেই। আর এ কারণেই সে অন্যদের তুলনায় আমাদের কাছের।

একটু বেশি আত্মবিশ্বাস থাকলে যেন আমরাও ‘ব্যাটম্যান’ হতে পারতাম! ‘ব্যাটম্যান’ একই সঙ্গে বিষণ্ন, শীতল এবং নোয়ার ঘরানার এক চরিত্র। রাতের অস্তিত্ববাদী অন্ধকারের এই নায়ক আমাদের একাকিত্ব ও বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে কথা বলে। সে কারণেই ক্রিস্টোফার নোলানের ‘দ্য ডার্ক নাইট’ আমার কাছে সর্বকালের সেরা কমিক-বুক সিনেমা।

আর ষাটের দশকের শেষ দিকে প্রচারিত মূল ‘ব্যাটম্যান’ টেলিভিশন সিরিজটির কথাও ভুলে গেলে চলবে না। অতি সাধারণ সেটে মাত্র আধঘণ্টার পর্বে নির্মিত সেই সিরিজটি এমন এক আবহ তৈরি করেছিল, যেন কমিক বইটাই জীবন্ত হয়ে পর্দায় উঠে এসেছে। অ্যাডাম ওয়েস্টের অভিনয়ে একই সঙ্গে ছিল গাম্ভীর্য ও মৃদু রসবোধ, যার তুলনা আজও মেলা কঠিন।

.

টম হল্যান্ড কি তাঁদের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারেন?
মিষ্টি স্বভাবের, প্রাণবন্ত এবং আকর্ষণীয় টম হল্যান্ড কি সত্যিই ‘সুপারম্যান’ ও ‘ব্যাটম্যান’–এর সেই বিশাল উত্তরাধিকারের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারেন?

অভিনেতা হিসেবে হল্যান্ড সময়ের সঙ্গে আত্মবিশ্বাসী হয়েছেন। এখন নিঃসন্দেহে বলা যায়, পিটার পার্কারের চরিত্রটি তিনি নিজের করে নিয়েছেন, টোবি ম্যাগুয়েরে চেয়েও যেন বেশি। অ্যান্ড্রু গারফিল্ড অবশ্য ফ্র্যাঞ্চাইজির তুলনামূলক দুর্বল এক অধ্যায়ে আটকে পড়েছিলেন; তাঁকে প্রায়ই বিষণ্ন ও কিছুটা দিশাহারা মনে হয়েছে।
অন্যদিকে এক প্রজন্ম টম হল্যান্ডকে পিটার পার্কার হিসেবেই দেখে বড় হয়েছে। এখন তাঁর পিটার যখন তরুণ বয়স পেরিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পথে, তখন মনে হচ্ছে আরও বড় রাজত্বের জন্যই যেন তিনি প্রস্তুত।

সুপারহিরো ছবিকে ঘিরে একঘেয়েমি বারবার ফিরে আসার একটি কারণ হলো, যে বিষয়টি প্রথমে আমাদের আকৃষ্ট করে, সেটিই আবার একসময় ক্লান্তিকর হয়ে ওঠে। সুপারহিরোদের অলিম্পিয়ান শক্তি, মহিমা এবং অজেয়তার বিশাল আইকনোগ্রাফি আমাদের মুগ্ধ করে ঠিকই, কিন্তু একই সঙ্গে তা ক্লান্তও করে।
তার ওপর এখন সুপারহিরোরা দল বেঁধে আসে—‘অ্যাভেঞ্জার্স’, ‘এক্স-মেন’, ‘ফ্যান্টাস্টিক ফোর’। পৃথিবী যখন এত সুপারহিরোতে ভরা, তখন একজন সুপারহিরো আসলে কতটা ‘সুপার’ থাকতে পারে?
‘স্পাইডার-ম্যান’ এই ক্লান্তির বিপরীতে একধরনের স্বস্তি এনে দেয়।

.

আসল শক্তি ‘আমাদের মতো’ হওয়া
‘স্পাইডার-ম্যান’কে বর্ণনা করতে মানুষ যে শব্দটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে, সেটি হলো—সম্পর্কিত মনে হওয়া।

পিটার পার্কার শুরু করে একজন সাধারণ স্কুলছাত্র হিসেবে। একটি মাকড়সার কামড়ের পর তার জীবনে যে পরিবর্তন আসে, তা অনেকটা বয়ঃসন্ধির মতোই অস্বস্তিকর। কবজি থেকে আঠালো জাল ছোড়ার ক্ষমতা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, সেটিও তাকে শিখতে হয়।

পিটার পার্কারের আছে স্কুলের বুলির সমস্যা, প্রেমের সমস্যা, গোপন পরিচয় লুকিয়ে রাখার সমস্যা। সে সুপারহিরোদের জেমস ডিন-ভুল বোঝা এক তরুণ, যে জাল ছুড়ে অপরাধীদের সঙ্গে লড়াই করে।

আর টম হল্যান্ড যেভাবে চরিত্রটিকে ফুটিয়ে তোলেন, শরীরী শক্তির সঙ্গে সামান্য লজ্জা ও অপ্রস্তুত ভাব মিশিয়ে তাতে তিনি অনেকটা এমন এক বয়-ব্যান্ড তারকার মতো, যাকে দর্শকের কাছে আপন মনে হয়।

আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ‘স্পাইডার-ম্যান’ নিজের শহর নিউইয়র্কের সঙ্গেই আটকে থাকে। জাল ছুড়ে দুলতে হলে তার এই শহরের সুউচ্চ ভবনগুলো প্রয়োজন। তার চারপাশে থাকা বন্ধুরাও হয়ে ওঠে একধরনের পরিবার।

এই স্থানীয়, ঘরোয়া আবহই ‘স্পাইডার-ম্যান’কে এতটা আপন করে তোলে।

.

‘সুপারম্যান’ ও ‘ব্যাটম্যান’–এর মাঝামাঝি এক নায়ক
তরুণ প্রাপ্তবয়স্ক পিটার পার্কার এখন এমন এক ভারসাম্যের প্রতীক, যা আমাদের সময়ের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে মিলে যায়। ১৯৭৮ সালে, যখন সময়টা ছিল কিছুটা অগোছালো হলেও তুলনামূলক আশাবাদী, তখন ‘সুপারম্যান’ কমিক-বুক সিনেমার সংস্কৃতির সূচনা করেছিলেন সাহসী, সুগঠিত, অদম্য ও সর্বশক্তিমান এক নায়ক হিসেবে।

এর প্রায় এক দশক পর, যখন ঝলমলে আশির দশক ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে, তখন সামনে আসে ‘ব্যাটম্যান’। সে ধনী, কিন্তু তার ভেতরে রয়েছে অন্ধকার। তার আচরণ রুক্ষ। তার ক্ষমতা আসলে একধরনের বিশাল বিভ্রম। তার প্রকৃত শক্তি তাকে নিজের ভেতর থেকেই খুঁজে নিতে হয়।

‘স্পাইডার-ম্যান’ যেন ‘সুপারম্যান’ ও ‘ব্যাটম্যান’–এর নিখুঁত আধ্যাত্মিক সংমিশ্রণ।
‘স্পাইডার-ম্যান’ পরে আমেরিকান সংস্কৃতির চেনা লাল-নীল পোশাক। উড়ে বেড়ানোর মতোই রোমাঞ্চকরভাবে শহরের আকাশে জাল ছুড়ে দুলে বেড়ায়। নিজের নিয়তি সম্পর্কে তার বিশ্বাস আছে।

কিন্তু একই সঙ্গে সে মুখোশধারী, গোপনীয় ও মানসিকভাবে আহত।
‘ব্র্যান্ড নিউ ডে’-তে যখন ‘স্পাইডার-ম্যান’–এর মাকড়সার মতো ক্ষমতাগুলোই এলোমেলো হয়ে যায়, তখন সে আক্ষরিক অর্থেই বুঝতে পারে না কোন দিকটা ওপরে আর কোনটা নিচে।

আর এখানেই সে হয়ে ওঠে আমাদের সময়ের আয়না।

.১৭ দিনেই ২৪ হাজার কোটি টাকা আয়! যে ১০ কারণে ঝড় তুলল ‘স্পাইডার–ম্যান’.

এই অস্থির সময়ের সুপারহিরো
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অস্থির সময়ে আমাদের অনেকের মধ্যেই যেন একই অনুভূতি কাজ করে, অন্ধকারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চাই, অথচ নিজেরাও সেই অন্ধকারের মধ্যে আটকে আছি।
‘স্পাইডার-ভার্স’ সিনেমাগুলোতেও ‘স্পাইডার-ম্যান’ পরিচয় নিয়ে লড়াই করে। সেখানে তার সংকট এত গভীর যে ব্যাটম্যানের পরিচয়-সংকটও শিশুর খেলনার মতো মনে হয়।

তাহলে ‘স্পাইডার-ম্যান’ আসলে কে?
‘স্পাইডার-ম্যান’ কমিক-বুক সংস্কৃতির আলো ও অন্ধকার—দুই দিকের একসঙ্গে মিশে যাওয়া রূপ। সে এমন এক সুপারহিরো, যে আমাদের ভয় ও স্বপ্ন—দুটোর সঙ্গেই কথা বলে। একই সঙ্গে সে এক রোমান্টিক কিশোর প্রতিমা, যে প্রতিনিয়ত নিজেকে নতুন করে চিনতে বাধ্য হয়।

সম্ভবত এ কারণেই আমরা ‘স্পাইডার-ম্যান’কে এত ভালোবাসি।

কারণ, ‘স্পাইডার-ম্যান’ আমাদের থেকে অনেক দূরের কোনো অজেয় দেবতা নয়। সে আমাদেরই মতো—ভুল করে, ভয় পায়, প্রেমে পড়ে, নিজের পরিচয় নিয়ে দ্বিধায় থাকে, আবার প্রয়োজনের মুহূর্তে উঠে দাঁড়ায়।

‘স্পাইডার-ম্যান’ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরাও কখনো কখনো শুধু একটি সুতোয় ঝুলে থাকি। তবে সেই ঝুলে থাকার মধ্যেও থাকে অসাধারণ এক রোমাঞ্চ।

ভ্যারাইটি অবলম্বনে