শিক্ষাকে কেন্দ্র করেই একটি আধুনিক, স্বনির্ভর ও মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের পথ তৈরি হয়। শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে মাধ্যমিক শিক্ষা সবচেয়ে সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তাই দীর্ঘদিন ধরে অপরিকল্পিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বাস্তবতাবিবর্জিত কারিকুলাম চাপিয়ে দেওয়ার যে ধারা চলে আসছে, তা থেকে বেরিয়ে আসার সময় এসেছে। শিক্ষাবিষয়ক নির্বাচনী ইশতিহার বাস্তবায়নের প্রথম ধাপ হিসেবে মাধ্যমিক শিক্ষার কারিকুলামে বাস্তবভিত্তিক সংস্কারকে সামনে আনা উচিত। প্রয়োজন এমন আধুনিক, যুগোপযোগী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাক্রম, যা বিশ্বমানের দক্ষ নাগরিক গড়বে এবং জাতীয় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতেও সরাসরি ভূমিকা রাখবে।

বর্তমান কারিকুলামে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা কাজ করছে। অতীতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই মাধ্যমিক শিক্ষা কারিকুলামে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হলেও বাস্তবায়নে কৌশলগত ত্রুটি, শিক্ষক-প্রশিক্ষণের ঘাটতি এবং অবকাঠামোগত সমন্বয়হীনতার বিষয়টি স্পষ্ট ছিল। কিছু ক্ষেত্রে সম্প্রতি পরিমার্জন করা হলেও মূল্যায়ন পদ্ধতি অনেকের কাছে জটিল ও অস্পষ্ট। বিশেষ করে গ্রামীণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাস্তব সামর্থ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য না থাকলে শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি চাপ বাড়ে, এবং কোচিং ও গাইড বই নির্ভরতা বাড়ার আশঙ্কাও থেকেই যায়।

বিজ্ঞান ও গণিতের মতো মৌলিক বিষয়গুলোকে যথাযথ গুরুত্ব না দিলে উচ্চশিক্ষার ভিত্তি দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। আবার কর্মমুখী দক্ষতা এবং জীবনঘনিষ্ঠ শিক্ষার ঘাটতি থাকলে শিক্ষাব্যবস্থা সনদ নির্ভর হয়ে পড়তে পারে। তাই মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়েই শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ভাষা, ডিজিটাল প্রযুক্তি, সমস্যা সমাধান, যোগাযোগ এবং সহ-পাঠক্রমিক কাজের মতো মৌলিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ নিশ্চিত করার কথা বলা হচ্ছে।

মাধ্যমিক শিক্ষা সংস্কারের রূপরেখা কতটা বাস্তবসম্মত হওয়া দরকার, তা বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্যের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। দেশে মাধ্যমিক পর্যায়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এই বড় জনগোষ্ঠীর কার্যক্রম আরও দক্ষতার সঙ্গে তদারকি ও সমন্বয় করতে মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য শক্তিশালী প্রশাসনিক কাঠামো প্রয়োজন বলে মত উঠে এসেছে।

বর্তমানে মাধ্যমিক শিক্ষা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে। মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য স্বতন্ত্র ও বিশেষায়িত প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা গেলে পরিকল্পনা, তদারকি, শিক্ষক ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষণ, মূল্যায়ন ও কারিকুলাম বাস্তবায়নে আরও কার্যকর সমন্বয় সম্ভব হবে বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে আলাদা মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি উঠেছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে যুগোপযোগী প্রশাসনিক কাঠামো এবং আধুনিক কারিকুলামের আওতায় আনা না গেলে জনমিতিক লভ্যাংশ বা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’-এর সুফল পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন হবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশ্বায়নের যুগে বিভিন্ন দেশের সফল শিক্ষাপদ্ধতি পর্যালোচনা করে বাংলাদেশের বাস্তবতা অনুযায়ী কারিকুলাম সাজানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। জাপানে নৈতিক শিক্ষা, সামাজিক দায়িত্ববোধ, শৃঙ্খলা ও নাগরিক মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ফিনল্যান্ডে বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের পাশাপাশি আন্তবিষয়ক ও বাস্তব সমস্যা সমাধানভিত্তিক শিক্ষার ওপর জোর রয়েছে। সিঙ্গাপুরে ‘টিচ লেস, লার্ন মোর’ ধারণায় কম বিষয়বস্তু মুখস্থ করানোর বদলে গভীরভাবে শেখা, প্রয়োগ এবং চিন্তাশক্তির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। মালয়েশিয়ায় প্রযুক্তি, দক্ষতা ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষার সমন্বয় করা হয়েছে।

উন্নত দেশের অভিজ্ঞতা ধরে নবম-দশম শ্রেণিতে নমনীয় বিষয়-পছন্দ বা ক্রেডিটভিত্তিক ব্যবস্থা চালুর কথাও বলা হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীরা বাধ্যতামূলক মৌলিক বিষয়ের পাশাপাশি নিজেদের মেধা, আগ্রহ ও ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার লক্ষ্য অনুযায়ী আইটি, বিজ্ঞান, ব্যবসা, মানবিক বা কারিগরি বিষয়ের মধ্যে নির্বাচন করতে পারবে—এমন ভাবনাও এসেছে।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রেক্ষাপটে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল প্রযুক্তিকে শিক্ষাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ করার কথা বলা হয়েছে। মাধ্যমিক স্তর থেকেই শিক্ষার্থীদের ‘এআই লিটারেসি’ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা, ডেটা বিশ্লেষণ, কোডিং ও সাইবার নিরাপত্তার মৌলিক জ্ঞান দেওয়ার জরুরি প্রয়োজনের কথা উঠে এসেছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শুধু এআই ব্যবহারের নিয়ম শেখালেই হবে না; কীভাবে এআইকে দায়িত্বশীলভাবে সমস্যা সমাধান, তথ্য বিশ্লেষণ ও গবেষণার সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করা যায়—সেই সক্ষমতাও গড়ে তোলার কথা বলা হচ্ছে। তথ্যের সত্যতা যাচাই, ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা, কপিরাইট এবং প্রযুক্তির নৈতিক ব্যবহারেও শিক্ষার্থীদের সচেতন করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

আন্তর্জাতিক ভাষাদক্ষতার বিষয়েও জোর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে আন্তর্জাতিক ভাষাদক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ। মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ নিশ্চিত করার পরামর্শ রয়েছে। ভাষাশিক্ষাকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে সিইএফআরের মতো কাঠামোকে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। শিক্ষার্থীর আগ্রহ ও ভবিষ্যৎ কর্মক্ষেত্র বিবেচনায় জাপানিজ, জার্মান, আরবি, স্প্যানিশ বা অন্য বিদেশি ভাষা শেখার সুযোগ রাখার কথাও বলা হয়েছে।

কারও নির্দিষ্ট পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত ফল না হলে বিকল্প শিক্ষাপথ অনেকাংশে রুদ্ধ হয়ে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ নিয়েও আলোচনা এসেছে। নতুন কারিকুলামে মূল্যায়নকে আরও নমনীয় ও শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক করার প্রস্তাব রয়েছে। নির্দিষ্ট বিষয়ে দুর্বল বা ফেল করলে পুনর্মূল্যায়ন, ক্রেডিট পুনরুদ্ধার কিংবা বিকল্প কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাপথে যাওয়ার সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে নদীভাঙন, চরাঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা এবং অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা প্রান্তিক অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধে নমনীয় শিক্ষাব্যবস্থা, উপবৃত্তি ও প্রয়োজনভিত্তিক সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান রয়েছে। পর্যাপ্ত ল্যাব ও ইন্টারনেট সুবিধাবঞ্চিত গ্রামীণ বিদ্যালয়ের ওপর ব্যয়বহুল প্রকল্পের বোঝা না চাপিয়ে স্থানীয় সম্পদ ও চাহিদার আলোকে ব্যবহারিক শিক্ষা নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।

শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে মূল ভূমিকা শিক্ষকদের। বিশ্বমানের কারিকুলাম তৈরি হলেও তা শ্রেণিকক্ষে বাস্তবায়নের জন্য যোগ্য, প্রশিক্ষিত ও উদ্বুদ্ধ শিক্ষক প্রয়োজন। তাই শিক্ষকদের জীবনমান, সামাজিক মর্যাদা, পেশাগত স্বাধীনতা এবং আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন, পদোন্নতি, বদলি, প্রশিক্ষণ ও ক্যারিয়ার অগ্রগতির জন্য স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক নীতি প্রণয়নের কথা এসেছে। শিক্ষকদের জন্য একটি স্বাধীন বা স্বতন্ত্র ‘শিক্ষা কমিশন’ গঠন করে মেধা, যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে পদোন্নতি, বদলি এবং পেশাগত উন্নয়নের সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের প্রস্তাবও রয়েছে।

শিক্ষকদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের নিবিড় ও ধারাবাহিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে। উপযুক্ত সামাজিক মর্যাদা, পেশাগত স্বাধীনতা ও সম্মানজনক বেতনকাঠামো নিশ্চিত না করে কেবল কারিকুলাম পরিবর্তন করে কাঙ্ক্ষিত রূপান্তর সম্ভব নয়—এমন মত উঠে এসেছে।

শিক্ষায় সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করা হয়। ইউনেসকোর এডুকেশন ২০৩০ কাঠামোয় শিক্ষায় জিডিপির ৪-৬ শতাংশ অথবা সরকারি ব্যয়ের ১৫-২০ শতাংশকে একটি বৈশ্বিক বেঞ্চমার্ক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশকেও ধাপে ধাপে শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এই আন্তর্জাতিক মানের দিকে এগিয়ে যেতে হবে বলে মত দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা নিয়ে যেকোনো সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে একটি আধুনিক, টেকসই, বিজ্ঞানমনস্ক ও উৎপাদনমুখী জাতীয় শিক্ষানীতি এবং কারিকুলাম প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি বলেও বলা হয়েছে।

কারিকুলাম পরিবর্তনের পাশাপাশি শিক্ষক প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং প্রশাসনিক সক্ষমতারও সংস্কার প্রয়োজন বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে পৃথক মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা, শিক্ষকদের জীবনমান ও পদমর্যাদা উন্নয়ন এবং একটি শক্তিশালী ও স্বচ্ছ শিক্ষক পেশাগত কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে একটি যুগোপযোগী মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলেই বিপুল মানবসম্পদকে দক্ষ, সৃজনশীল ও উৎপাদনশীল জনশক্তিতে রূপান্তর সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়েছে। সেই শিক্ষাব্যবস্থাই মেধাভিত্তিক, বিজ্ঞানমনস্ক, আত্মনির্ভর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার ভিত্তি হতে পারে—এমন অভিমতও তুলে ধরা হয়েছে।

লেখক: শাহাব উদ্দীন মাহমুদ সালমী, সিনিয়র শিক্ষক, গবর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল, ঢাকা