গাজীপুরের শ্রীপুরের গ্রেটওয়াল সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজের টাইলস কারখানাটি গ্যাস–সংকটের কারণে এক সপ্তাহ ধরে পুরোপুরি বন্ধ। এতে কারখানাটির দৈনিক উৎপাদন ক্ষতি হচ্ছে ৪০ হাজার বর্গমিটার টাইলস। উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কারখানাটিতে কর্মরত অধিকাংশ শ্রমিককে ছুটি দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

প্রতিষ্ঠানটির স্যানিটারিওয়্যার উৎপাদনের কারখানা হবিগঞ্জে। গ্যাস–সংকটের কারণে এই কারখানারও উৎপাদন কমেছে ৩০ শতাংশের মতো। কারখানাটিতে মাসে ১ লাখ পিস কমোড-বেসিনসহ বিভিন্ন স্যানিটারি পণ্য উৎপাদন হয়।

জানতে চাইলে গ্রেটওয়াল সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আসিফ ইকবাল মাহমুদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, সাধারণত আমাদের ১ থেকে দেড় মাসের টাইলসের স্টক থাকে। প্রায় এক মাস ধরে গ্যাসের সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে চাহিদা অনুযায়ী বাজারে টাইলস দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ইতিমধ্যে বিক্রি কমে গেছে। এক-দুই সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বিক্রি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

.

প্রায় এক মাস ধরে চলমান গ্যাস-সংকটে গ্রেটওয়াল সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজের টাইলসের কারখানার মতো পুরোপুরি বন্ধ না থাকলেও সিরামিক খাতের আরও বেশ কয়েকটি কারখানার উৎপাদন আংশিকভাবে চালু রয়েছে। এই খাতের অধিকাংশ কারখানার উৎপাদন চলছে ২০-৩০ শতাংশের মতো। এতে বাজারে টাইলসের সরবরাহ কমতে শুরু করেছে।

সিরামিক খাতের একাধিক প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা জানান, চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস না পাওয়ায় কারখানার সব ইউনিট চালানো যাচ্ছে না। ফলে বাজারে চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে কারখানাগুলো ভয়াবহ আর্থিক সংকটের মধ্যে পড়বে। তাতে আমদানিও বাড়তে পারে।

তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল দুর্ঘটনার কারণে প্রায় এক মাস ধরে দেশের শিল্পকারখানা তীব্র গ্যাস–সংকটে ভুগছে। ১৫ আগস্ট টার্মিনালটি আংশিকভাবে চালু হয়। তবে সংকট পুরোপুরি কাটার আগেই আবার পরিস্থিতি খারাপ হয়। তিন দিন সরবরাহ কমার পর গত বুধবার বেলা তিনটায় কার্গো সংকটের কারণে এক্সিলারেট থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। গত শনিবার এক্সিলারেট টার্মিনাল আবার আংশিকভাবে চালু হয়।

.

বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমইএ) তথ্যানুযায়ী, দেশে বর্তমানে তৈজসপত্র, টাইলস, স্যানিটারিওয়্যার ও সিরামিক ইট উৎপাদনের ৭৬টি কারখানা রয়েছে। তার মধ্যে টাইলসের কারখানা ৩১টি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে টাইলসের স্থানীয় বাজারের আকার ছিল ৫ হাজার ৮৫৪ কোটি টাকার। তার মধ্যে ৮২ শতাংশ দেশীয় কোম্পানির দখলে ছিল।

জানা যায়, সিরামিক কারখানাগুলো গাজীপুর, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও ভোলায় গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে ভোলা ও হবিগঞ্জের ৭-৮টি ছাড়া অন্য এলাকার কমবেশি সব সিরামিক কারখানা গ্যাস–সংকটে ভুগছে।

.
সার্বিকভাবে সিরামিক খাতের উৎপাদন ৩০ শতাংশে নেমে গেছে। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আমদানি বেড়ে যাবে। কম উৎপাদনের কারণে সিরামিক কারখানাগুলো রুগ্‌ণ হয়ে পড়ছে।
আবদুল হাকিম, জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি, বিসিএমইএ  
.

দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় টাইলস উৎপাদনের কারখানা আরএকে সিরামিকের ৪টি ইউনিট গ্যাস–সংকটের কারণে টানা আট দিন বন্ধ ছিল। তারপর গত শুক্রবার তাদের একটি ইউনিট চালু হয়। সেই হিসাবে তাদের উৎপাদন ২৫ শতাংশে নেমেছে।

জানতে চাইলে আরএকে সিরামিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ খোরশেদ আলম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আট দিন বন্ধ থাকার পর আমাদের একটি ইউনিট চালু হয়েছে। বন্ধ থাকায় কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সেটি আমরা এখনো হিসাব–নিকাশ করিনি।’

.

এদিকে গাজীপুরের শ্রীপুরে অবস্থিত মীর সিরামিকসের কারখানার ৪টির মধ্যে ৩টি ইউনিটের উৎপাদন ১৭ দিন ধরে বন্ধ রয়েছে। দিনে ৩ লাখ বর্গফুট টাইলস উৎপাদনের সক্ষমতার কারখানাটিতে বর্তমানে ৫০ হাজার বর্গফুট টাইলস উৎপাদন হচ্ছে। উৎপাদন কম থাকায় কারখানাটির ৮০০ শ্রমিকের অধিকাংশই এখন ছুটিতে।

জানতে চাইলে মীর সিরামিকসের কারখানার কর্মকর্তা শহীদুজ্জামান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, গ্যাসের যে চাপ পাওয়া যাচ্ছে তা দিয়ে একটির বেশি ইউনিট চালানো যাচ্ছে না। এতে বাজারে চাহিদা অনুযায়ী টাইলস সরবরাহ করতে পারছি না। তাতে বাজারে পণ্যের সংকট তৈরি হচ্ছে।

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের আষাঢ়িয়ারচরে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) সিরামিক কারখানায় গ্যাস–সংকটের কারণে টাইলস উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে চাহিদা অনুযায়ী পণ্য উৎপাদন করতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি। তাদের কারখানার দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা ৫১ হাজার বর্গমিটার টাইলস।

.

জানতে চাইলে এমজিআইয়ের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান মেঘনা সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) এ কে এম জিয়াউল ইসলাম বলেন, ‘গ্যাস–সংকটের কারণে উৎপাদনে সমস্যা হলেও এখন পর্যন্ত চাহিদা পূরণে বড় সমস্যা হচ্ছে না। তার কারণ আমাদের কিছু মজুত পণ্য আছে। তবে তা দিয়ে সর্বোচ্চ ১৫-২০ দিন পর্যন্ত পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হবে।’

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে সিরামিক খাতের শিল্পমালিকদের সংগঠন বিসিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আবদুল হাকিম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, সার্বিকভাবে সিরামিক খাতের উৎপাদন ৩০ শতাংশে নেমে গেছে। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আমদানি বেড়ে যাবে। কম উৎপাদনের কারণে সিরামিক কারখানাগুলো রুগ্‌ণ হয়ে পড়ছে। এখন কারখানাগুলো টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারের নীতিসহায়তা দরকার।

.

জানতে চাইলে বিসিএমইএর সভাপতি মইনুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ভোলা ও হবিগঞ্জ ছাড়া অন্য এলাকার সিরামিক কারখানাগুলোতে গ্যাস–সংকটে পূর্ণ মাত্রায় উৎপাদন হচ্ছে না। এতে কারখানাগুলো আর্থিকভাবে রুগ্‌ণ হয়ে যাচ্ছে। কারখানাগুলো টিকিয়ে রাখতে ব্যাংকের ঋণের কিস্তি এক বছর স্থগিত রাখার পাশাপাশি কিস্তি ছয় মাস না দিলে খেলাপি হওয়ার বিধান বাতিল করতে হবে। এ ছাড়া ব্যাংকের বিভিন্ন চার্জ কমাতে হবে। বিষয়গুলো শিগগিরই আমরা গভর্নরের কাছে তুলে ধরব।

মইনুল ইসলাম আরও বলেন, শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের সঙ্গে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) প্রতিনিধিরা আজ (গতকাল) গ্যাস-সংকটসহ ব্যবসা-বাণিজ্যে সমস্যার সমাধান নিয়ে সাক্ষাৎ করেছেন। সেখানে আমিও ছিলাম। মন্ত্রী আমাদের কাছে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা চেয়েছেন। আমরা এফবিসিসিআইয়ের সহায়ক কমিটির সঙ্গে আলোচনা করে একটি পরিকল্পনা দেব।