কোটি কোটি টাকার আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম, অপারেশন থিয়েটার এবং প্যাথলজি ল্যাব থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসক, নার্স ও টেকনিশিয়ানের অভাবে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২ এর ২০০ শয্যার হাসপাতাল। দুই দশক ধরে এই পরিস্থিতি বিরাজ করায় প্রায় সাড়ে ১১ হাজার বন্দির উন্নত চিকিৎসাসেবা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে এবং মূল্যবান যন্ত্রপাতিগুলো অব্যবহৃত থেকে নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

গাজীপুরের কাশিমপুর কারা কমপ্লেক্সের চারটি কারাগারের মধ্যে কারাগার-২ এ সব ধরনের রোগের চিকিৎসার উপযোগী করে এই হাসপাতালটি নির্মাণ করা হয়। বাকি তিনটি কারাগারের বন্দিদের চিকিৎসাও এখানে হওয়ার কথা। তবে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ না হওয়ায় এর কার্যক্রম সীমিত। হাসপাতালের জন্য তত্ত্বাবধায়ক, দুজন সিনিয়র কনসালট্যান্ট, নয়জন জুনিয়র কনসালট্যান্ট, পাঁচজন আবাসিক চিকিৎসক, চিকিৎসা কর্মকর্তা, দুজন সহকারী সার্জন, একজন প্যাথলজিস্ট, দুজন রেডিওলজিস্ট, দুজন ফার্মাসিস্ট ও একজন ডিপ্লোমা নার্সসহ বিভিন্ন পদ সৃষ্টি করা হলেও প্রায় সবগুলোই বর্তমানে খালি।

কারাগার সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দুজন চিকিৎসককে প্রেষণে দেওয়া হয়েছে এবং গাজীপুরের সিভিল সার্জনের কার্যালয় থেকে আরও দুজন চিকিৎসক দিয়ে কোনোমতে সেবা চালানো হচ্ছে। তারা সপ্তাহে দু-চারদিন সকালে এসে দুপুরে চলে যান, বাকি সময়ে কোনো চিকিৎসক থাকেন না। অথচ বন্দিদের মধ্যে যক্ষ্মা, টাইফয়েড, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেশি। বিশেষ করে হৃদ্রোগে আক্রান্ত সংকটাপন্ন রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া প্রয়োজন হলেও যানজটের কারণে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছাতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগে, যা ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

হাসপাতালের সরঞ্জাম কেনার নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিভিন্ন বিভাগের জন্য মোট ৮ কোটি ৭৪ লাখ ২৯ হাজার ৪০১ টাকার সরঞ্জাম কেনা হয়েছে। এর মধ্যে রেডিওলজি ও ইমেজিং বিভাগে ২ কোটি ২৩ লাখ ৯৬ হাজার ৮০৬ টাকা, ল্যাবরেটরি ও প্যাথলজি বিভাগে ১ কোটি ৪৫ লাখ ৮৬ হাজার ৩০০ টাকা, অর্থোপেডিক বিভাগে ১ কোটি ৪১ লাখ ১০ হাজার ৫৬৬ টাকা এবং সার্জারি বিভাগে ৯৮ লাখ ৩৩ হাজার ৯৭২ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এছাড়া অপারেশন থিয়েটার ও অ্যানেসথেশিওলজি বিভাগে ৬৩ লাখ ৭৮ হাজার ৫ টাকা, ডেন্টাল বিভাগে ৬০ লাখ ৬১ হাজার ৮৭৪ টাকা এবং ব্লাড ট্রান্সফিউশন বিভাগে ৪০ লাখ ৮৪ হাজার ৫০০ টাকার সরঞ্জাম রয়েছে। ২০১১ সালের ৮ মার্চের একটি নথিতে রেডিওলজি ও ইমেজিং বিভাগের সরঞ্জাম সরবরাহের তথ্য পাওয়া গেছে। ইনভেন্টরি তালিকায় এক্স-রে মেশিন, কম্পিউটারাইজড রেডিওগ্রাফি সিস্টেম ও আলট্রাসনোগ্রাম মেশিনের উল্লেখ থাকলেও জনবল না থাকায় বন্দিদের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিতে হয়। তবে সেখানেও বন্দিদের জন্য আলাদা প্রিজন সেল বা প্রিজন ওয়ার্ড না থাকায় চিকিৎসা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

কারাগারের কর্মকর্তারা জানান, অন্যান্য কারাগার থেকে হাসপাতালের দূরত্ব পাঁচ থেকে সাত মিনিটের হলেও কাশিমপুরের ক্ষেত্রে এই দূরত্ব ও সময় অনেক বেশি। প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও জনবল নিয়োগ এবং হাসপাতালে প্রিজন সেল থাকলে এই সমস্যা দূর হতো।

কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারের জেল সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, "কারারক্ষীদের মধ্যে এসএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা করা কয়েকজনকে বাছাই করে আর্মড ফোর্সেস মেডিকেল কলেজে চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন নার্সিং পড়ানো হয়েছে। তাদের মধ্য থেকে একজনকে রেডিওলজিস্ট, দুজনকে ফার্মাসিস্ট এবং একজনকে ডিপ্লোমা নার্স হিসেবে কাজে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে চিকিৎসক সংকটের সমাধান হয়নি।"

কারা কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রায় ৩ হাজার ৫০০, কারাগার-২ এ প্রায় ৫ হাজার ৪০০, কারাগার-১-এ প্রায় ২ হাজার এবং কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারে প্রায় ৭০০ বন্দি রয়েছেন। মোট ১১ হাজার ৬০০ বন্দির জন্য বিশাল হাসপাতাল ও কোটি টাকার সরঞ্জাম থাকলেও জনবল সংকটে তা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

গাজীপুরের সিভিল সার্জন মামুনুর রহমান বলেন, "বিভিন্ন উপজেলা থেকে চারজন চিকিৎসককে প্রেষণে দেওয়া হয়েছে। তারা পালা করে দায়িত্ব পালন করেন।"

কাশিমপুর কারাগার-২ এর জেল সুপার হালিমা খাতুন বলেন, "দেশের অন্যান্য অনেক কারাগার থেকে হাসপাতালের দূরত্ব পাঁচ থেকে সাত মিনিটের। কিন্তু কাশিমপুর কারাগার থেকে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দূরত্ব অনেক। ফলে গুরুতর রোগীদের নিয়ে সমস্যায় পড়তে হয়। কাশিমপুরের কারা হাসপাতালে প্রয়োজনীয়সংখ্যক চিকিৎসক নিয়োগ করা হলে বন্দিদের চিকিৎসাসেবা আরও সহজ ও কার্যকর হতো।"