ভারতের কলকাতার একটি হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে নিহত কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত, তাঁর স্ত্রী, ছেলে ও শ্বশুরের মরদেহ গতকাল শনিবার রাতে দেশে পৌঁছায়। কুষ্টিয়া শহরে তাঁদের লাশ আসার পর শোকের ছায়া নেমে আসে।
গতকাল রাত সাড়ে ১০টার দিকে লাশবাহী দুটি অ্যাম্বুলেন্স কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়ায় প্রবেশ করে। দেবাশীষের মরদেহ বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সটি তাঁর বাড়ির সামনে পৌঁছাতে বেগ পেতে হয়। পাড়ার সরু সড়কজুড়ে বিভিন্ন ধর্মের হাজারো মানুষের ভিড় ছিল। কারও হাতে ফুল, কারও চোখে অশ্রু। স্বজনেরা কাঁদছেন, সহকর্মীদের অনেকেই নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
দেবাশীষ দত্ত পরিবারসহ তিনতলা ভবনের দ্বিতীয় তলার একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। এই দুর্ঘটনার পর তাঁর বৃদ্ধ মা-বাবা, সাত বছরের মেয়ে মহিমা দত্ত ও একমাত্র অসুস্থ বোন ছাড়া পরিবারে আর কেউ রইল না।
বাড়ির সামনে মানুষের ভিড় এতটাই ছিল যে কফিন নামানো সম্ভব হয়নি। পরে মরদেহ দুটি প্রায় ২০০ মিটার দূরে তরুণ সংঘ পাঠাগারের সামনে নেওয়া হয়। সেখানে দেবাশীষের প্রতি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে ফুলেল শ্রদ্ধা জানানো হয়।
"ছেলে দেবাশীষের মুখ দেখে মা স্বপ্ন দত্ত চিৎকার করে কেঁদে ওঠেন। স্বজনেরা তাঁকে সামলানোর চেষ্টা করেও পারছিলেন না।"
এর আগে সন্ধ্যা সাতটার দিকে বেনাপোল স্থলবন্দর থেকে প্রায় ১৩৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স দুটি কুষ্টিয়ার উদ্দেশে রওনা হয়েছিল। রাত সাড়ে ১১টার দিকে দেবাশীষ ও তাঁর ছোট ছেলে শর্ণশীষ দত্তের মরদেহ বাড়ির সামনে নেওয়া হলে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। ছেলে দেবাশীষের মুখ দেখে মা স্বপ্ন দত্ত চিৎকার করে কেঁদে ওঠেন। স্বজনেরা তাঁকে সামলানোর চেষ্টা করেও পারছিলেন না।
দেবাশীষের সাত বছরের মেয়ে মহিমা স্বজনদের কাছে ছিল। বাবার মরদেহের দিকে তাকাতেও চাইছিল না সে; মুখ লুকিয়ে নিশ্চুপ হয়ে ছিল। পরে দেবাশীষ ও তাঁর ছেলের মরদেহ কুষ্টিয়া মহাশ্মশানে নেওয়া হয়। রাত দুইটার পর বাবা-ছেলের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
একই রাতে দেবাশীষের স্ত্রী আফসানা শারমিন ও শ্বশুর আকরাম আলীর জানাজা কুষ্টিয়া থানাপাড়া মডেল জামে মসজিদে অনুষ্ঠিত হয়। রাত তিনটার দিকে তাঁদের কুষ্টিয়া পৌর কবরস্থানে দাফন করা হয়।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চারজনের সৎকার ও দাফনের জন্য ২৫ হাজার টাকা করে অনুদান দেওয়া হয়। কুষ্টিয়া সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হারুন অর রশীদ গতকাল বিকেলে দেবাশীষের বাড়িতে গিয়ে তাঁর বাবার হাতে ওই অর্থ তুলে দেন।
"বেঙ্গালুরুতে চিকিৎসা শেষে ১৭ আগস্ট পরিবারটি কলকাতায় ফেরে। ১৯ আগস্ট সকালে তাঁদের দেশে ফেরার কথা ছিল।"
গতকাল দুপুর থেকেই দেবাশীষের সহকর্মীরা বেনাপোল স্থলবন্দরে মরদেহের অপেক্ষায় ছিলেন। কলকাতার পার্ক সার্কাস এলাকার পিস ওয়ার্ল্ড হিমঘর থেকে দুটি অ্যাম্বুলেন্স ভারতের পেট্রাপোল ইমিগ্রেশনে পৌঁছায়। প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে বিকেল সাড়ে পাঁচটায় ভারতীয় কর্তৃপক্ষ মরদেহ বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করে। প্রায় এক ঘণ্টা পর লাশবাহী গাড়ি কুষ্টিয়ার উদ্দেশে রওনা দেয়।
গত ৩ আগস্ট স্ত্রী ও সন্তানের চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়েছিলেন দেবাশীষ। দুদিন পর তাঁর শ্বশুরও সেখানে যান। বেঙ্গালুরুতে চিকিৎসা শেষে ১৭ আগস্ট পরিবারটি কলকাতায় ফেরে। ১৯ আগস্ট সকালে তাঁদের দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু ১৮ আগস্ট রাত দেড়টার পর কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এতে নয়জনের মৃত্যু হয়। তাঁদের মধ্যে সাতজন বাংলাদেশি, চারজনই কুষ্টিয়ার।
কলকাতায় নিউমার্কেটের কাছে হোটেলে আগুনে ৯ বাংলাদেশির মৃত্যু, বলছে পুলিশ।
দেবাশীষ দত্ত আজকের পত্রিকা ও বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল নাইন-এর কুষ্টিয়া প্রতিনিধি ছিলেন। পাশাপাশি তিনি কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত আজকের আলো পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক এবং কুষ্টিয়া প্রেসক্লাবের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।