গত মাসে চীন ‘বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহযোগিতা সংস্থা’ বা ওয়াইকো গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। ৩৮টি দেশ নিয়ে গঠিত এই প্ল্যাটফর্মের লক্ষ্য এআই নিয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এআইয়ের উদ্ভাবন ও ব্যবহার সহজ করা। এটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিলেও বর্তমান বিশ্বের প্রকৃত প্রয়োজন মেটাবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
প্রযুক্তিটির ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনীতি ও সমাজের জন্য এর সুফল নিশ্চিত করতে কার্যকর নিয়ম, প্রতিষ্ঠান ও জবাবদিহির ব্যবস্থা প্রয়োজন। এআইয়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এর ‘শাসনব্যবস্থা’, তবে সরকারগুলো এখনো সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্যর্থ।
এআই শাসনের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০১৯ সালে জি-২০-এর শেরপা হিসেবে লেখক ওইসিডির সদ্য গৃহীত এআই নীতিমালা জাপানের ওসাকা সম্মেলনে অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করেন। পরের বছর ওইসিডি বৈশ্বিক এআই অংশীদারত্ব গড়ে তোলে, যার সদস্য এখন ৪৬টি দেশ। তবে এর নীতিমালা অনুমোদন করতে হয়, যা অনেক দেশের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০২১ সালে ইউনেসকো এআইয়ের নৈতিকতা বিষয়ে সুপারিশমালা গ্রহণ করে, যার তদারকি করেছিলেন লেখক। জাতিসংঘের ১৯৪টি সদস্যরাষ্ট্র, যার মধ্যে চীনও রয়েছে, এটি গ্রহণ করেছে। এসব সম্মেলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ফল হলো এআই নিরাপত্তা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা, যা প্রথমে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে ওঠে এবং ২০২৪ সালে এর আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক কার্যকর হয়। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর লক্ষ্য ছিল উন্নত এআই-ব্যবস্থার ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং অভিন্ন নিরাপত্তা মানদণ্ড তৈরি করা।
তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্ব এখন নিরাপত্তার চেয়ে জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত প্রতিযোগিতার দিকে সরে গেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের মতে, নিয়ন্ত্রণ উদ্ভাবনকে বাধাগ্রস্ত করবে এবং চীনের সঙ্গে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রকে পিছিয়ে দেবে।
কিছু ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র এখনো এগিয়ে। ২০২৬ সালের স্ট্যানফোর্ড এআই সূচক অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এআইয়ে বেসরকারি বিনিয়োগ ছিল ২৮৬ বিলিয়ন ডলার, বিপরীতে চীনে ছিল ১২ বিলিয়ন ডলার। যুক্তরাষ্ট্র ৫৯টি উল্লেখযোগ্য এআই মডেল তৈরি করেছে এবং চীন করেছে ৩৫টি। তবে ডিপসিক ও কিমি কে-থ্রির মতো চীনা মডেলগুলো যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত মডেলগুলোর কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে এবং অনেক কম খরচে তৈরি হচ্ছে। চীন উন্মুক্ত মডেলের ওপর জোর দেওয়ায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এআই ব্যবহার সহজ হচ্ছে এবং তারা গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
এই প্রতিযোগিতা কেবল বাজারের নয়, বরং ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবের। ওয়াইকোর মাধ্যমে চীন বিশ্বব্যাপী এআইয়ের নিয়ম তৈরিতে নেতৃত্ব দিতে চায়। ২০১৩ সাল থেকে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) মাধ্যমে চীন অংশীদার দেশগুলোতে নির্মাণ চুক্তি ও বিনিয়োগে প্রায় ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। ওয়াইকোর প্রতিষ্ঠাতা সদস্যরা সবাই এই উদ্যোগের অংশীদার এবং ওয়াইকো অবকাঠামো বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি হস্তান্তর করবে। এছাড়া চীন এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক প্রতিষ্ঠাতেও নেতৃত্ব দিয়েছে, যা প্রতিষ্ঠান গড়ার ক্ষেত্রে তাদের সক্ষমতার প্রমাণ।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান থেকে দূরত্ব তৈরি করছে। ইউনেসকো, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সম্মেলন এবং মানবাধিকার পরিষদ থেকে তারা সরে গেছে। এছাড়া ইউএসএআইডি বিলুপ্ত করা হয়েছে এবং প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে তারা বেরিয়ে গেছে। ফলে জাতীয় প্রতিযোগিতাকে বহুপক্ষীয় কাঠামোর ওপরে রাখার নীতি বৈশ্বিক এআই শাসনের বিভাজন আরও বাড়িয়েছে।
ওয়াইকো এই বিভাজনকে চীন নেতৃত্বাধীন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর তাদের মিত্রদের এআই প্রতিযোগিতায় পক্ষ বেছে নিতে চাপ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যার মধ্যে ২০২৫ সালের প্যাক্স সিলিকা এবং ২০২৬ সালের এআই অপরচুনিটি স্টেটমেন্ট অন্তর্ভুক্ত।
তবে এই প্রতিযোগিতার ভিড়ে মানুষের প্রকৃত উদ্বেগগুলো উপেক্ষিত। এআই শিশু ও তরুণদের আসক্ত করা, বৈষম্যমূলক অ্যালগরিদমের মাধ্যমে অসমতা বাড়ানো এবং মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার অস্তিত্বগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এছাড়া জাতীয় নিরাপত্তা, সাইবার নিরাপত্তা এবং শ্রমবাজারে ব্যাপক পরিবর্তনের আশঙ্কা রয়েছে, যা এখনো যথাযথভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হয়নি।
এই ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সবচেয়ে সক্রিয়। এআই আইনের মাধ্যমে তারা প্রযুক্তির উন্নয়ন ও ব্যবহারে বাধ্যতামূলক নিয়ম করেছে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোকে মানবাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এআই কাঠামো তৈরিতে সহায়তা করছে। সঠিক শাসনব্যবস্থা থাকলে এআই বিশ্বের বড় সমস্যাগুলো সমাধানে সহায়তা করতে পারে। তবে এর জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে তাদের বর্তমান অগ্রাধিকার বদলে জনকল্যাণের লক্ষ্যে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
— লেখক গ্যাব্রিয়েলা রামোস ইউনেসকোর সামাজিক ও মানববিজ্ঞানবিষয়ক সাবেক সহকারী মহাপরিচালক।