বগুড়ার শেরপুর উপজেলার কুসুম্বী খুরতা গ্রামের ‘মানব উন্নয়ন কেন্দ্র এতিমখানা লিল্লাহ বোর্ডিং’ দীর্ঘদিন ধরে কার্যত বন্ধ অবস্থায় রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে কোনো শিক্ষার্থী বা শিক্ষক নেই এবং ভবনটি তালাবদ্ধ। অথচ গত দুই অর্থবছরে সমাজসেবা কার্যালয়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির নামে সরকারি বিশেষ আর্থিক অনুদান হিসেবে মোট ৪ লাখ ৮ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। অনুদান আসার খবরে প্রতিষ্ঠানটি সাময়িকভাবে খোলা হলেও টাকা হাতে পাওয়ার পর তা ফের বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে অনিয়মের অভিযোগ তুলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন এলাকাবাসী। অভিযোগের প্রেক্ষিতে উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করেছে এবং ইউএনও-র নির্দেশে বিষয়টি তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটির সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল মমিন গত ২৭ জুলাই ইউএনও-র কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। এতে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি মো. জুলফিকার আলী ও সহসভাপতি আবু রায়হান স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় তারা প্রতিষ্ঠানটির নামে সরকারি অর্থ অনিয়মের মাধ্যমে উত্তোলন করছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, শেরপুরে সরকারি বিশেষ আর্থিক অনুদান পাওয়া প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১০টি। এর মধ্যে মানব উন্নয়ন কেন্দ্র এতিমখানা লিল্লাহ বোর্ডিং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ লাখ ৬৮ হাজার টাকা এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা অনুদান পেয়েছে। দুই অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির নামে মোট ৪ লাখ ৮ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।
খুরতা গ্রামের এক বাসিন্দা জানান, অনুদানের টাকা আসার আগে কিছুদিনের জন্য প্রতিষ্ঠানটি খোলা হতো। তখন শিক্ষার্থী ও শিক্ষক দেখানো হতো। টাকা উত্তোলনের পর আবার প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে দেওয়া হতো। অনুদানের অর্থ কীভাবে ব্যয় করা হয়েছে, তার কোনো হিসাবও স্থানীয়দের জানানো হয়নি বলে তারা দাবি করেন।
প্রতিষ্ঠানটির সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল মমিন বলেন, "আগে এখানে বেশ কিছু শিক্ষার্থী ছিল। ২০২৪ সালের পর থেকে শিক্ষার্থী কমতে থাকে। এরপর থেকেই অনিয়ম শুরু হয়। অনুদান আসার আগে ও পরে শিক্ষক-শিক্ষার্থী দেখানো হতো, পরে আবার প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হতো। আমরা চাই প্রতিষ্ঠানটি আবার চালু হোক। এ জন্য নতুন কমিটি গঠন করা দরকার।"
প্রতিষ্ঠানটির সহসভাপতি ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আবু রায়হান বলেন, "এ বিষয়টি সভাপতি জানেন। আমি কিছু বলতে পারব না।"
অভিযোগ অস্বীকার করে প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি মো. জুলফিকার আলী বলেন, "তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সঠিক নয়। প্রতিষ্ঠানটি নিয়ম মেনেই পরিচালিত হয়েছে। অনুদানের টাকা প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে রয়েছে।"
তবে তার দেওয়া ব্যাংক বিবরণীতে অনুদানের টাকা হিসাবে থাকার দাবির সঙ্গে অসংগতি পাওয়া গেছে। শেরপুরের সাবেক উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ও বর্তমানে শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কর্মরত ওবায়দুল হক জানান, তিনি খোঁজখবর নিয়ে ওই প্রতিষ্ঠানের অনুদানের জন্য সুপারিশ করেছিলেন।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা নাইম হোসেন বলেন, "তার পূর্ববর্তী কর্মকর্তা প্রতিষ্ঠানটির বিষয়ে প্রতিবেদন প্রদান করেছিলেন। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই অনুদান দেওয়া হয়েছে। আমি দায়িত্ব গ্রহণ করার পর অভিযোগ পেয়ে প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করেছি। তখন মাদ্রাসাটি তালাবদ্ধ ছিল এবং সেখানে কোনো কার্যক্রম চলতে দেখা যায়নি। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি যাতে ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন করতে না পারে, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।"
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইদুজ্জামান হিমু বলেন, "অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। অনুদানের টাকা যেন উত্তোলন করতে না পারে, এজন্য ব্যাংক অ্যাকাউন্টের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। ইতিমধ্যে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"