যুক্তরাজ্যে ফেরার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় প্রিন্স হ্যারি ও মেগান মার্কেলকে ঘিরে যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যমগুলোতে নানা আলোচনা চলছে। কিন্তু ক্যালিফোর্নিয়ার অভিজাত এলাকা মন্টেসিটোয় তাঁদের বিদায়ের খবর নিয়ে স্থানীয়ভাবে তেমন সাড়া দেখা যায়নি।

মন্টেসিটোয় থাকেন হ্যারি ও মেগান। রোদঝলমলে এ শহরে বিশ্বখ্যাত তারকা ও ধনকুবেরদের বসবাস থাকলেও স্থানীয় বাসিন্দাদের বড় অংশের কাছে এখন পর্যন্ত বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই ধরা পড়ছে—কেউ কেউ তো শুরুতেই জানতেনই না।

ওই এলাকার বাসিন্দা লেখক ও সাংবাদিক অ্যান লুইস বারডাখ স্থানীয় কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইট ঘেঁটে দেখেছেন। সেখানে ব্যাংক ডাকাত খোঁজার খবর থেকে শুরু করে কাছের একটি চিড়িয়াখানায় ক্যাপিবারা নামের একটি প্রাণীকে মেরে ফেলার খবর—সবই ছিল। কিন্তু হ্যারি–মেগানের চলে যাওয়ার খবর ছিল না।

বারডাখ বলেন, ‘আমি বলছি না যে খবরটি বড় নয়। তবে এখানকার বাসিন্দাদের কথাও একবার ভাবুন—অপরাহ উইনফ্রের মতো তারকারা এখানে থাকেন।’

২০২০ সালে রাজপরিবারের দায়িত্ব ছেড়ে হ্যারি ও মেগান যুক্তরাষ্ট্রে যান। এরপর ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার উত্তর–পশ্চিমে মন্টেসিটোয় বসবাস শুরু করেন। মন্টেসিটোতে ৯ হাজারের কম মানুষের বাস। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর বিলাসবহুল বাড়ির জন্য পরিচিত হলেও এখানকার দৈনন্দিন চর্চায় তারকাদের উপস্থিতি নতুন কোনো বিষয় নয়।

এলাকাটির বাসিন্দাদের কেউ কেউ মনে করেন, মন্টেসিটোয় এত এত তারকাখ্যাত মানুষের ভিড়ে হ্যারি–মেগান হয়তো কিছুটা আড়ালে থাকার সুযোগ পেয়েছিলেন। তবে তাঁদের সন্তান আর্চি ও লিলিবেটকে সেপ্টেম্বরে যুক্তরাজ্যের স্কুলে ভর্তি করানোর জন্য তাঁরা সেখান থেকে চলে যাচ্ছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মন্টেসিটো ও কাছের সান্তা বারবারার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেছে নিউইয়র্ক টাইমস। হ্যারি–মেগানের চলে যাওয়ার খবরে তাঁদের বেশির ভাগের প্রতিক্রিয়া ছিল অনেকটাই স্বাভাবিক, যেন পাশের বাড়ির কোনো বাসিন্দা বাসা বদলাচ্ছেন।

মন্টেসিটোর বাসিন্দা ও ওয়েক ফরেস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ২১ বছর বয়সী রায়ান সুজা বলেন, ‘তাঁরা যেখানে থাকতে চান, থাকুন। এটা তাঁদের ব্যাপার।’

৭৬ বছর বয়সী বুজ বনসাল হাইস্কুলে পড়ার সময় থেকে মন্টেসিটোয় বসবাস করছেন। হ্যারি–মেগান সম্পর্কে তিনি জানেন এবং দূর থেকে তাঁদের দেখেছেন। তাঁদের চলে যাওয়ার বিষয়ে তাঁর প্রতিক্রিয়া ছিল এক শব্দে, ‘কিছুই না।’ তিনি বলেন, ‘তাঁরা যেখানে যেতে চান, যেতে পারেন।’

মন্টেসিটোর রিভেন রক এলাকায় হ্যারি–মেগানের বাড়ির কাছেই থাকেন ৭২ বছর বয়সী জিনা পেনিনো। হাঁটতে বের হলে তিনি প্রায়ই হ্যারি–মেগান ও তাঁদের সন্তানদের দেখতেন। কিন্তু তাঁরা যুক্তরাজ্যে ফিরে যাচ্ছেন, এ কথা তিনি জানতেন না।

জিনা পেনিনো বলেন, ‘আসলে তাঁদের সঙ্গে আমাদের তেমন পরিচয় নেই। দেখা হলে তাঁরা হাত নাড়েন, গাড়ি নিয়ে চলে যান, তারপর বাড়ির দরজা বন্ধ করে দেন।’

দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় ছয় বছর ধরে হ্যারি–মেগানের জীবনটা অনেকটা এমনই ছিল—বিশ্বজুড়ে তাঁদের পরিচিতি থাকলেও স্থানীয় মানুষের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ ছিল খুবই কম। তাঁদের কয়েক কোটি ডলারের বাড়িটি উঁচু দেয়াল দিয়ে ঘেরা এবং কড়া নিরাপত্তাবেষ্টিত ফটক রয়েছে। আশপাশে থাকেন জেফ ব্রিজেস, রব লো, গিনেথ প্যালট্রো, অরল্যান্ডো ব্লুম, ক্যাটি পেরি, অপরাহ উইনফ্রেসহ আরও অনেক হলিউড তারকা।

২০২২ সালে মুক্তি পাওয়া ‘হ্যারি অ্যান্ড মেগান’ তথ্যচিত্রের কিছু অংশও কাছের একটি বাড়িতে ধারণ করা হয়েছিল। নেটফিলিক্সের তথ্য অনুযায়ী, তথ্যচিত্রটি ২ কোটি ৮০ লাখের বেশি পরিবার দেখেছিল।

তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে হ্যারি–মেগান তাঁদের সামাজিক কর্মকাণ্ডের চেয়ে বেশি পরিচিত ছিলেন নিরাপত্তাব্যবস্থার কারণে। প্রতিবেশীরা এই দম্পতির সঙ্গে খুব একটা কথা না বললেও তাঁদের নিরাপত্তাকর্মী, কুকুর হাঁটাতে নিয়ে যাওয়া ব্যক্তি, সন্তানদের দেখাশোনার কর্মী ও সহকারীদের অনেকেই চিনতেন।

কখনো এই দম্পতির বাড়ির ফটক খোলার সময় ভুল করে প্রতিবেশীর কুকুর ভেতরে ঢুকে পড়েছে। আবার কখনো সন্তানদের জন্মদিনের নিমন্ত্রণ দিতে গিয়ে বন্ধুরা ভুল করে নিরাপত্তাব্যবস্থার অ্যালার্ম বাজিয়ে দিয়েছেন।

হ্যারি–মেগান প্রায়ই বলতেন, তাঁদের জন্য বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা জরুরি ছিল। ক্যালিফোর্নিয়ায় যাওয়ার পর তাঁদের পিছু নিতে শুরু করেছিলেন আলোকচিত্রী ও সংবাদকর্মীরা। ২০২০ সালে হ্যারি–মেগান অভিযোগ করেছিলেন, অজ্ঞাত ব্যক্তিরা ড্রোন ও দূরপাল্লার ক্যামেরা ব্যবহার করে তাঁদের ছেলে আর্চির ছবি তুলছেন। এ নিয়ে তাঁরা মামলা করেছিলেন। ২০২১ সালে অপরাহ উইনফ্রেকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মেগান ব্রিটিশ ট্যাবলয়েডগুলোর বর্ণবাদী আচরণের কারণে তাঁর মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর চাপ তৈরি হয়েছিল বলেও জানিয়েছিলেন।

মন্টেসিটোর একটি সাইকেলের দোকানের মালিক জেনিফার ব্লেভিনসের সঙ্গে হ্যারি–মেগানের একবার যোগাযোগ হয়েছিল। ২০২৩ সালে আর্চির চতুর্থ জন্মদিনে তাঁরা তাকে একটি সাইকেল উপহার দেন। সেই খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্লেভিনস ও তাঁর প্রেমিকা সমালোচনার মুখে পড়েন।

ব্লেভিনস বলেন, ‘মেগানকে এত মানুষ অপছন্দ করেন, সেটা আমরা বুঝতে পারিনি।’ তবে তাঁর কাছে মেগান ছিলেন ‘খুবই ভালো মানুষ’। পরিবারটি যেখানেই থাকুক, ভালো থাকুক—এটাই তাঁর আশা।

রাজপরিবার নিয়ে লেখালেখি করা লস অ্যাঞ্জেলেসের সাংবাদিক এলিজাবেথ হোমস মনে করেন, এখন হ্যারি–মেগানের যুক্তরাজ্যে ফেরার সিদ্ধান্ত নেওয়া অস্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে রাজা তৃতীয় চার্লসের শারীরিক অবস্থার বিষয়টি এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

তবে যুক্তরাজ্যে ফেরার পর হ্যারি–মেগানকে নতুন কিছু চ্যালেঞ্জের মুখেও পড়তে হতে পারে। রাজপরিবারের সদস্য না হয়েও তাঁরা কতটা সংবাদমাধ্যমের নজরে থাকবেন, তা এখন দেখার বিষয়। সন্তানদের গণমাধ্যমের কাছ থেকে এত দিন আগলে রেখেছেন। সেটি ধরে রাখতে পারবেন কি না, এটিও বড় প্রশ্ন।

দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার সংস্কৃতি ও ইতিহাস নিয়ে কাজ করা লেখক ডিজে ওয়াল্ডি বলেন, হ্যারি–মেগানের চলে যাওয়া তাঁর কাছে অপ্রত্যাশিত নয়। তাঁর মতে, এই অঞ্চলের সঙ্গে তারকাদের সম্পর্ক বরাবরই অস্থায়ী। তিনি বলেন, ‘তারকারা দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার অনেক কিছু ভালোবাসেন। কিন্তু হঠাৎ একসময় আর ভালো লাগে না। তখন তাঁরা নিজেদের জায়গায় ফিরে যান।’

মন্টেসিটোর তরুণ বাসিন্দা রায়ান সুজার অবশ্য হ্যারি–মেগানের মতো এই সিদ্ধান্তের পক্ষে নন। তিনি বলেন, ‘আমি হলে এখানেই থাকতাম। এর চেয়ে ভালো আবহাওয়া আর কোথায় পাবেন?’