মামলাজট হ্রাস এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে দ্রুত ও সাশ্রয়ী আইনি সেবা পৌঁছে দিতে খুলনার পাইকগাছায় দেশের প্রথম অনলাইন ডিসপিউট রেজল্যুশন (ওডিআর) সেন্টার চালু হয়েছে। এই প্রযুক্তিনির্ভর সেবার মাধ্যমে উপযুক্ত বিরোধের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো জেলা শহরে না গিয়েই ভার্চুয়াল মধ্যস্থতায় অংশ নিতে পারবেন।
শুক্রবার (২১ আগস্ট) পাইকগাছা চৌকি আদালতে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ফ্রেন্ডশিপের উদ্যোগে এই সেন্টারের উদ্বোধন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে খুলনার সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ চাঁদ মোহাম্মদ আব্দুল আলিম আল রাজী বলেন, "দেশে বর্তমানে প্রায় ৪০ লাখ মামলা বিচারাধীন। সীমিতসংখ্যক বিচারক দিয়ে প্রচলিত পদ্ধতিতে এত বিপুলসংখ্যক মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা প্রায় অসম্ভব। তাই মামলাজট কমাতে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা এডিআরের কোনো বিকল্প নেই।"
তিনি আরও জানান, সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী দেশে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ, যেখানে জেলা আদালতে বিচারকের সংখ্যা ১ হাজার ৯৬৪ জন। এর মধ্যে প্রায় ২০০ জন বিভিন্ন ডেপুটেশন পদে থাকায় সরাসরি বিচারকাজে নিয়োজিত বিচারকের সংখ্যা আরও কম। ফলে প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ায় এত বিপুল মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা কঠিন।
সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ বলেন, "মামলা দায়েরের আগে ও পরে মধ্যস্থতা, এডিআর বা আপসের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ রয়েছে। দেওয়ানি কার্যবিধি, অর্থঋণ আদালত, পারিবারিক আদালত, শ্রম আদালত ও আইনগত সহায়তা প্রদান আইনসহ বিভিন্ন আইনে এডিআরের বিধান রাখা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এ ধরনের বিরোধ নিষ্পত্তি বাধ্যতামূলকও করা হয়েছে।"
তিনি আরও উল্লেখ করেন, "আদালতের মাধ্যমে কোনো বিরোধ নিষ্পত্তি হলে সাধারণত এক পক্ষ জয়ী এবং অন্য পক্ষ পরাজিত হয়। কিন্তু মধ্যস্থতার মাধ্যমে উভয় পক্ষ কিছুটা ছাড় দিয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে। এতে বিরোধ স্থায়ীভাবে নিষ্পত্তির পাশাপাশি প্রতিবেশী, পারিবারিক ও ব্যবসায়িক সম্পর্কও অক্ষুণ্ন রাখার সুযোগ থাকে।"
আদালতের দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, "আদালতে মামলা হলে নিম্ন আদালতের পর আপিল, হাইকোর্ট, আপিল বিভাগ ও রিভিশনসহ বিভিন্ন আইনি প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সময় লেগে যায়। ছোটখাটো ও আপসযোগ্য বিরোধ মামলা দায়েরের আগে বা পরে মধ্যস্থতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা গেলে মামলাজট কমার পাশাপাশি বিচারপ্রার্থীদের সময়, অর্থ ও ভোগান্তিও কমবে।"
পাইকগাছার ভৌগোলিক অবস্থানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, "খুলনা শহর থেকে পাইকগাছায় সড়কপথে আসতে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগে। কয়রাসহ আরও দুর্গম এলাকার মানুষের জেলা শহরে এসে আইনি সেবা নেওয়া আরও কষ্টসাধ্য। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে এসব এলাকার মানুষের কাছে আইনি সেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।"
ফ্রেন্ডশিপের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে তিনি পাইকগাছার পাশাপাশি কয়রাসহ খুলনার অন্যান্য দুর্গম এলাকাতেও এই কার্যক্রম সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। এতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী নিজ এলাকা থেকেই আইনি সহায়তা ও বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ পাবেন।
অনলাইনে যুক্ত হয়ে বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মঞ্জুরুল হোসেন বলেন, "প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকার মানুষের ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার আরও সহজ, দ্রুত ও সাশ্রয়ী করতে ওডিআর গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তবে এটি বিচারব্যবস্থার বিকল্প নয়, বিদ্যমান আইনগত সহায়তা ও মধ্যস্থতা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার একটি সহায়ক মাধ্যম।"
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ফ্রেন্ডশিপের সিনিয়র ডিরেক্টর ও ইনক্লুসিভ সিটিজেনশিপের প্রধান আয়েশা তাসিন খান। তিনি বলেন, "ভৌগোলিক দূরত্ব, যাতায়াত ব্যয় ও আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে পাইকগাছার মতো প্রান্তিক অঞ্চলের অনেক মানুষ প্রয়োজনীয় আইনগত সহায়তা ও বিরোধ নিষ্পত্তি সেবা থেকে বঞ্চিত হন। প্রযুক্তির মাধ্যমে এসব বাধা কমিয়ে জনগণের দোরগোড়ায় ন্যায়বিচারের সুযোগ পৌঁছে দেওয়াই ফ্রেন্ডশিপের ওডিআর সেন্টারের প্রধান লক্ষ্য।"
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খুলনা জেলা আইনগত সহায়তা কর্মকর্তা ম. রোমানা আফরোজ। ফ্রেন্ডশিপের ইনক্লুসিভ সিটিজেনশিপের সহকারী মহাব্যবস্থাপক-আইন অ্যাডভোকেট আশিকুজ্জামান সেন্টারের কার্যক্রম তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন পাইকগাছা চৌকি আদালতের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাসুম বিল্লাহ, সিভিল জজ হযরত আলী, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরী এবং পাইকগাছা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জি এম আব্দুস সাত্তারসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের সহযোগিতায় এবং ফ্রেন্ডশিপের ইনক্লুসিভ সিটিজেনশিপের উদ্যোগে এই সেন্টারটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর মাধ্যমে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ভার্চুয়াল মধ্যস্থতার সুযোগ পাওয়ায় প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের সময়, অর্থ ও শ্রম সাশ্রয় হবে এবং জেলা শহরে যাতায়াতের ভোগান্তি কমবে।