ভারতে ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া নিয়ে বিতর্ক নতুন করে ঘনীভূত হয়েছে। কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে দলীয় কর্মসূচি ও অনুষ্ঠানে ‘বন্দে মাতরম’র প্রথম দুই স্তবক গাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর বিজেপি ও নরেন্দ্র মোদি সরকারকে কেন্দ্র করে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের ধারাও বাড়ে।

কংগ্রেসের বক্তব্য, ১৯৩৭ সালে কলকাতায় কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে পরামর্শের পর মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, সুভাষচন্দ্র বসু, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলসহ শীর্ষ নেতারা বন্দে মাতরমের প্রথম দুটি স্তবক গাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এরপর স্বাধীনতার পর ১৯৫০ সালের ২৪ জানুয়ারি সংবিধান পরিষদের শেষ বৈঠকে বন্দে মাতরমকে ‘জাতীয় গান বা রাষ্ট্রীয় গানের’ মর্যাদা দেওয়া হয় এবং বলা হয়, তা জাতীয় সংগীত ‘জনগণমন’–এর সমান সম্মান পাবে।

এই প্রেক্ষাপট তুলে ধরে কংগ্রেসের মুখপাত্র জয়রাম রমেশ বলেন, ওই দুই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দল ঠিক করেছে, দলীয় কর্মসূচি ও অনুষ্ঠানে প্রথম দুই স্তবকই গাওয়া হবে। কংগ্রেস নেতাদের দাবি, জাতীয় সংগীত ও রাষ্ট্রীয় গান কংগ্রেসের কাছে এক আবেগ, বিজেপি দলীয় স্বার্থে তা নিয়ে রাজনীতি করছে।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বন্দে মাতরম রচনা করেছিলেন ১৮৭৫ সালের ৭ নভেম্বর। ২০২৫ সালের ৭ নভেম্বর ওই গানের দেড় শ বছর পূর্তি উপলক্ষে এক বছর ধরে দেশজুড়ে বিজেপি নানা কর্মসূচি নিচ্ছে। চলতি বছর সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনে এই উপলক্ষে মোদি সরকার জাতীয় সম্মানের অবমাননা প্রতিরোধ (সংশোধনী) বিল পাস করায়। ওই বিলে জাতীয় সংগীতের সমতুল্য আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয় জাতীয় গানকে। নতুন এই সংশোধনী অনুযায়ী গানটি গাইতে ইচ্ছাকৃতভাবে বাধা দেওয়া হলে বা অমর্যাদা করা হলে তিন বছর পর্যন্ত কারাবাসের বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে বলা হয়েছে, সরকারি অনুষ্ঠানে গানটি পুরো গাইতে হবে। বঙ্কিমচন্দ্রের লেখা এই গানটির মোট স্তবকের সংখ্যা ছয়; নতুন আইনে ছয়টি স্তবকই গাওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

বন্দে মাতরম গানে দেশকে মায়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। প্রথম দুই স্তবকে মাতৃভূমির প্রাকৃতিক রূপের বর্ণনা রয়েছে, তবে পরবর্তী স্তবকগুলোয় দুর্গা, লক্ষ্মী ও সরস্বতীর মতো হিন্দু দেবদেবীর উল্লেখ থাকায় মুসলিম লিগ আপত্তি জানায়। সেই আপত্তি আমলে নিয়েই সুভাষচন্দ্র বসু চিঠি লেখেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। রবীন্দ্রনাথই পরামর্শ দেন প্রথম দুটি স্তবক গাওয়ার বিষয়ে, যেহেতু ওই দুই স্তবক দেশাত্মবোধক ও সর্বজনগ্রাহ্য এবং পরবর্তী স্তবকগুলোয় ধর্মীয় অনুষঙ্গ রয়েছে।

গত শনিবার স্বাধীনতা দিবসের দিন কংগ্রেস সদর দপ্তরে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের পর বন্দে মাতরম পুরো গাওয়া হয়। তবে কিছু ভিডিওতে দেখা যায়, পরবর্তী স্তবকগুলো গাওয়ার সময় সোনিয়া গান্ধী দলীয় কর্মীদের কিছু বলছেন; সোনিয়ার পাশে ছিলেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে। রাহুল গান্ধীও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিজেপি প্রশ্ন তোলে—সোনিয়া কেন উসখুস করছিলেন, খাড়গে কেন কথা বলছিলেন, জাতীয় গানকে মর্যাদা দেওয়া হয়নি কি না ইত্যাদি।

বিতর্কের ধারাবাহিকতায় গত সোমবার গোয়ায় কংগ্রেসের এক অনুষ্ঠানেও মল্লিকার্জুন খাড়গের উপস্থিতিতে বন্দে মাতরমের প্রথম দুটি স্তবকই গাওয়া হয়। ওই অনুষ্ঠানে খাড়গে ব্যাখ্যা দেন, কেন দলীয় অনুষ্ঠানে তাঁরা প্রথম দুই স্তবকই গাইবেন।

বিজেপি নেতাদের দাবি, কংগ্রেসের কাছে জাতীয়তাবোধের চেয়ে মুসলিমদের আপত্তি দীর্ঘদিন প্রাধান্য পেয়ে আসছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেন, কংগ্রেসের এই সিদ্ধান্ত আশ্চর্যজনক ও দেশবিরোধী; তাদের মুসলিম তোষণনীতিই দেশভাগের কারণ এবং এখনো তারা সেই তোষণের রাজনীতি চালিয়ে যাচ্ছে। শাহের বক্তব্যে, নরেন্দ্র মোদি ঐতিহাসিক ভুল শুধরে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন। শাহ আরও বলেন, কংগ্রেস শুধু বঙ্কিমচন্দ্রকেই অসম্মান করছে না; বন্দে মাতরম গাইতে গাইতে যাঁরা মৃত্যুবরণ করেছেন, জেলে থেকেছেন, তাঁদেরও অপমান করছে।

বিজেপি পাশাপাশি কংগ্রেস নেতাদের ক্ষমা চাওয়ার দাবিও তোলে এবং কেউ কেউ কংগ্রেস নেতাদের বিরুদ্ধে নতুন আইনে অভিযোগও দাখিল করেছে। এই ইস্যু ঘিরে বিতর্ক চলছেই।

বন্দে মাতরম বিতর্কে বিজেপির লোকসভার সদস্য কঙ্গনা রনৌতও সরব হয়েছেন। রাজনীতিতে প্রবেশের আগে থেকেই বিজেপির পক্ষে, বিশেষ করে নরেন্দ্র মোদির সমর্থনে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা মন্তব্য করে বিতর্কিত হয়ে ওঠেন। ২০২৪ সালে বিজেপি কঙ্গনাকে হিমাচল প্রদেশের মান্ডি থেকে লোকসভা ভোটে প্রার্থী করে এবং তিনি জয়ী হন। এই বিতর্কে কঙ্গনা বর্ষীয়ান অভিনেত্রী শর্মিলা ঠাকুরের বক্তব্যেরও সমালোচনা করেন।

বন্দে মাতরম বিতর্ক নিয়ে এক গণমাধ্যম সম্প্রতি শর্মিলা ঠাকুরের মতামত জানতে চেয়েছিল। সেখানে তিনি বলেন, প্রথম দুটি স্তবকে মাতৃভূমির বন্দনা আছে। সবার কাছে তা গ্রহণযোগ্য। পরবর্তী স্তবকগুলোয় দুর্গা, কালী, লক্ষ্মী ও সরস্বতীর মতো হিন্দু দেবীর রূপক থাকায় একেশ্বরবাদী বিশ্বাসীদের পক্ষে তা পাঠ করা বা গ্রহণ করা কঠিন হতে পারে। শর্মিলা মনে করেন, সব ধর্মাবলম্বী মানুষকে একসূত্রে বাঁধতে প্রথম দুই স্তবকই যথেষ্ট।

শর্মিলা ঠাকুরের এই মতামত কঙ্গনা নিজের ইনস্টাগ্রামে শেয়ার করে প্রতিবাদী হন। তিনি লিখেছেন, ‘একজন শিল্পী হিসেবে শিল্প ও কবিতা সম্পর্কে শর্মিলা ঠাকুরের দৃষ্টিভঙ্গি কীভাবে এত সীমাবদ্ধ ও কৃত্রিম হতে পারে, তা ভেবে আমি অবাক হচ্ছি। কবিতা ও গানে অনেক সময় অনেক কিছু রূপক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। শিল্পীরা কাঙ্ক্ষিত আবেগ ও প্রভাব তৈরি করতে কল্পনা ও তুলনার আশ্রয় নেন। শুধু ধর্মীয় আচার হিসেবে তা বিবেচনা করলে ঐতিহাসিক ও শৈল্পিক তাৎপর্যকে খাটো করা হয়।’

দীর্ঘ পোস্টে কঙ্গনা স্বামী বিবেকানন্দকেও টেনে আনেন। তিনি বলেছেন, স্বামীজি এমন যুবসমাজ চেয়েছিলেন, যাদের শরীর লোহার মতো শক্ত, হাড় ইস্পাতের মতো দৃঢ় এবং শিরায় শিরায় বজ্রের মতো শক্তি প্রবাহিত; স্বামীজি কিন্তু আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেননি। তা ছিল শক্তির প্রতীক। এরপর শর্মিলার ঠাকুরের উদ্দেশে কঙ্গনা লিখেছেন, ‘হিন্দু–মুসলিম মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসুন। একে অপরকে আপনজনের মতো আলিঙ্গন করি।’